"যারা দশ-পনের দিনের জন্য সুন্দরবনে যায়, তাদের এককালীন তিন মাসের জন্য পাঁচ টাকার নোটের কার্ড নিতে হইসে ৭০ হাজার টাকায়। অন্য এক বাহিনী নিচ্ছে এক লাখ দুই হাজার টাকা। তারা দিচ্ছে দশ টাকার নোটের কার্ড। বাহিনীগুলো সুন্দরবনের এলাকা ভাগ করে নিছে"। কথাগুলো বলছিলেন সুন্দরবনে প্রায় ৩০ বছর ধরে মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত কামরুল ইসলাম। তিনিসহ জীবন-জীবিকার জন্য সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষদের অভিযোগ, বনে ঢুকতে সরকারি অনুমতির বাইরেও এখন দস্যুদের বিপুল অঙ্কের টাকা দিয়ে পাশ নিতে হচ্ছে।

এই বনে একাধিক দস্যু বাহিনী সক্রিয় তৎপরতা চালাচ্ছে এবং জঙ্গলে কার্যত তাদেরই দখল প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় গিয়ে বনজীবীদের সঙ্গে কথা হয়। তারা বলছেন, অস্ত্রধারী দস্যুদের অত্যাচার, অপহরণ ও চাঁদাবাজির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ, আতঙ্ক ও জীবিকার অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দস্যুদের তৎপরতা বৃদ্ধির কারণে বনে না যেতে পেরে অনেকেই আর্থিক অভাব-অনটনের মধ্যে পড়েছেন বলেও দাবি করেন। দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের জেলা সাতক্ষীরায় বনজীবীরা জীবন-জীবিকা এবং নিরাপত্তার উদ্বেগ থেকে সম্প্রতি সপ্তাহব্যাপী লাগাতার নানা কর্মসূচি পালন করেছেন।

'বনদস্যু নির্মূল কমিটির' ব্যানারে শ্যামনগরে বিক্ষোভ মিছিল, ইউএনও এবং জেলা প্রশাসকের কাছে বনদস্যু দমনের দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। এলাকায় বিক্ষোভ-মানববন্ধন কর্মসূচি করার কারণে বনদস্যুরা ফোন করে হুমকি দিচ্ছে বলেও জানান স্থানীয়রা। বর্তমান পরিস্থিতিকে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগের উল্লেখ করে সাতক্ষীরা অঞ্চলের বনজীবীরা প্রশ্ন তুলেছেন যে, সুন্দরবনের নিয়ন্ত্রণ কি বনদস্যুদের হাতে? কারণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বন বিভাগ এবং নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ড কেউই তাদের দস্যুদের হাত থেকে নিরাপদ রাখতে পারছে না। অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসে গুগল প্লে থেকে বিবিসি অ্যাপ ডাউনলোড করতে এখানে ক্লিক করুন।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নটি একেবারে সুন্দরবনের কাছে। স্থানীয়দের বেশিরভাগই সুন্দরবনে ভেতরে এবং আশপাশে মাছ ও কাঁকড়া শিকার করে এবং মধু আহরণসহ নানাভাবে জীবিকা নির্বাহ করেন। শ্যামনগরের পাঁচটি ইউনিয়নে প্রায় ৩৫ হাজার বনজীবী রয়েছেন, যাদের একটা বড় অংশের বাস গাবুরা এলাকায়। বুড়িগোয়ালিনি থেকে নদী পার হয়ে গাবুরা যেতেই ঘাটেই একদল মানুষ সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ঘিরে ধরে বনদস্যুদের কারণে সমস্যার বিষয়টি তুলে ধরেন। সেখানেই কথা হয় কাঁকড়া শিকারি আব্দুল করিমের সঙ্গে। তার দাবি, গত মাসে চারটি নৌকার জন্য চার লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে বনে গিয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু সেখানে তার নৌকা আটকে আরো চার লাখ টাকা আদায় করে দস্যুরা। ভয়ে তিনি দুই গোনে (মাছ-কাকড়া ধরার মৌসুম) সুন্দরবনে যাননি। স্থানীয় বাসিন্দা পারুল আক্তার বলেন, তার পরিবারের দুজন সদস্য সুন্দরবনে যান। তার স্বামীকে আটকে রেখে ফোন করে টাকা আদায় করা হয়েছে। "গ্রামে খুব অভাব যাচ্ছে মানুষির। পনেরদিন একম মাস কেউ জঙ্গলে যাতি পারছে না। আমার স্বামীরে চার দিন আটকে রাখছিল বনের মধ্যে। ৫০ হাজার টাকা দিয়ে ছাড়ায় আনতি হয়েছে।" আইফোন এবং আইপ্যাড থেকে বিবিসি অ্যাপ ডাউনলোড করতে এখানে ক্লিক করুন।

সেখানকার জেলেদের জঙ্গলে যেতে অগ্রিম পাস নিতে হয়। ব্যাংক নোটের নম্বরই হলো বনদস্যুদের কার্ড। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে নোট পরিবর্তন করে দস্যুরা কার্ড নির্ধারণ করে। কখনো দুই টাকা, পাঁচ টাকা বা ১০ টাকার নোট হয় এই কার্ড। ব্যাংক নোটের নম্বর মিলিয়ে তারা বনজীবীদের দাবি জঙ্গলে ঢুকতে দেয়। সুন্দরবনের দস্যুরা কীভাবে পাশ দেন, সেটা এই ৫/১০ টাকার নোট দেখিয়ে বলছিলেন বনের কাঁকড়া শিকারি রেজাউল করিম আর শাহাদাত হোসেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এক নৌকার জন্য একটি ১০ টাকার নোট পেতে ২০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।

১০ টাকা আর পাঁচ টাকার নোটের কার্ডে যারা প্রতিদিন বনে যায় প্রতিদিন আসে, তাদের জন্য চাঁদা ২০ হাজার। তাদের ভাষায়, গোন- অর্থাৎ মাছ ধরার সময়সীমা ভেদে নোট এবং টাকার পরিমাণ ভিন্ন হয়। দস্যুদের লোকজন উপকূলেও আছে যারা টাকা নিয়ে কার্ড দেয়। আর এই কার্ড না দেখাতে পারলে জঙ্গলে আটকে মুক্তিপণ আদায়, নির্যাতন করা হয় বনজীবীদের। আবার সাতক্ষিরা পশ্চিমাংশে গেলে ৭০ হাজার দিতে হয়, আবার খুলনা এলাকা পূর্বাংশে গেলে দুই বাহিনীকে চাঁদা দিয়ে কার্ড নিতে হয়, বলছিলেন জেলেরা।

গাবুরার জেলে বাবলুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন গত দুই বছরে তিনবার বনদস্যুদের হাতে জিম্মি হয়ে টাকা দিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। "একবার দিছি ৬৫ হাজার, একবার দিছি এক লাখ ৯৬ হাজার, আর একবার দিছি ৮০ হাজার। আরো ৮০ হাজার ফোন করে চাচ্ছে। তাদের ভয়ে জঙ্গলে যেতে পারছি না। এখানে অধিকাংশ মানুষ গরিব। আমরা সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল। আমরা যদি সুন্দরবনে যাতি না পারি তো খাবো কী?" গাবুরা এলাকায় বনজীবীরা জানান, পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে তারা অনেকেই জঙ্গলে কাজে যেতে ভয় আর আতঙ্কের মধ্যে আছেন।

অনেকের পরিবারে অর্থ সংকট চরম আকার নিয়েছে। বনজীবীদের যাদের সঙ্গে কথা হয়েছে সবাই অভিযোগ করেছেন, ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্টের পটপরিবর্তনের পর থেকে সুন্দরবনে বনদস্যুদের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের কথায়, বর্তমানে পরিস্থিতি অসহনীয়। কারণ বনে ৭/৮টি বাহিনীর তৎপরতা রয়েছে। এক গ্রুপকে টাকা দিলেও অনেক সময় আরেক গ্রুপ ধরে মুক্তিপণ আদায় করে। কামরুল বলেন, অতীতে র‍্যাব (বর্তমান এসআরবি) ব্যাপক অভিযান চালিয়ে জঙ্গল থেকে বনদস্যু নির্মুল করেছিল। কিন্তু পাঁচই আগস্টের পর দশটা প্রশাসনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে একে একে দশটার মতো বাহিনী নামে। এর মধ্যে ৫টা আত্মসমর্পন করেছে।

তবে বর্তমানে সবমিলিয়ে ৭/৮টি বাহিনী তৎপর রয়েছে সুন্দরবনে। স্থানীয় জেলেরা বলছেন, অতীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করলে দস্যুরা অনেকে আত্মসমর্পণ করেছিল। এরকম একজন আত্মসমর্পণকারী আল আমিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, ৫ই অগাস্টের পর আত্মসমর্পণ করা বেশ কয়েকজন আবার দস্যুতায় লিপ্ত হয়েছে। "আমি ২০১৮ সালে আত্মসমর্পণ করেছিলাম। সেসময় ৩৯৬ জন আত্মসমর্পণ করে। পাঁচই অগাস্টের পর সরকারি সহায়তায় তৈরি অনেকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হইছে। হওয়ার পরে তারা সুন্দরবনে গেছে। এখন জলদস্যুর যে এত চাপ এটা তার একটা কারণ।"

সুন্দরবনে তিন বছর একটি দস্যু দলের কমান্ডার ছিলেন বলে জানান আল আমিন। তার কথায়, সমতল থেকেই দস্যুরা অর্থ খাবার রসদ সবকিছুর যোগান এবং শেল্টার পাচ্ছে। আল আমিন আত্মসমর্পণের পর জেলে হিসেবে সুন্দরবনে গিয়ে মাছ ধরেন, কিন্তু তিনি নিজেও এখন আতঙ্কে সুন্দরবনে যেতে পারছেন না বলে বিবিসি বাংলাকে জানান। তার আশঙ্কা, বনে গেলে তাকে আটক করে আবারো দস্যুতা করতে বাধ্য করতে পারে কোনো বাহিনী। সবমিলিয়ে সুন্দরবনে বনদস্যু আতঙ্ক গাবুরা ইউনিয়নের পুরো জীবন যাত্রায় মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।

এলাকার নারী-পুরুষ অনেকেই বলছেন বনদস্যুদের কারণে জঙ্গলে না যেতে পারায় কেউ কেউ খাদ্য সংকটেও পড়েছেন। সুন্দরবনের বনবিভাগের কর্মকর্তারাও দস্যুতার বিষয়টি স্বীকার করছেন। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার একক সক্ষমতা নেই এটাও বলছেন সুন্দরবন পশ্চিমাঞ্চলের রেঞ্জ কর্মকর্তা শাহিনুর ইসলাম। তিনি জানান, গত দুই অর্থবছর ধারাবাহিক রাজস্বও কমেছে। এমনও ঘটনা আছে যে জেলেরা বৈধ কার্ড নিয়ে সেটি আবার বন বিভাগকে ফেরত দিচ্ছেন বনদস্যুর ভয়ে। সাতক্ষীরা রেঞ্জ সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক এবং রেঞ্জ কর্মকর্তা শাহিনুর ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, দস্যুদের সবার কাছে অস্ত্র রয়েছে যেটি তাদের বনরক্ষীদের পক্ষ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

"একটা ডাকাত গ্রুপে মিনিমাম ২০/২৫ জন করে থাকে। তাদের সবার কাছে প্রাণঘাতি অস্ত্র থাকে। আমাদের টিম যখন টহলে যায় যেখানে ১০ জন থাকলে হয়তো অস্ত্র থাকে চারটা বা পাঁচটা। সেক্ষেত্রে তাদের সাথে ফাইট দেওয়া, জেলেদের রক্ষা করা একটু ডিফিকাল্ট হয়ে যায়।" সুন্দবনের নিরাপত্তা এবং দস্যু দমনে কাজ করছে কোস্ট গার্ড। সংস্থাটি জানায় গত জানুয়ারি থেকে তাদের দুটি অভিযানে ৫৯টি অস্ত্র এবং ৪১ জন দস্যু বা ডাকাত বন্দি হয়েছে।

কয়েকটি দল আত্মসমর্পণ করেছে, কিন্তু পরিস্থিতি কেন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না জানতে চাইলে শ্যামনগরের কৈখালী স্টেশন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট মোল্লা মাহমুদ আল হোসাইন বলেন, কোস্টগার্ড কঠোর অবস্থানে আছে এবং জেলেরা যদি সুনির্দিষ্ট তথ্য দেয় তাহলে দ্রুত তাদের দমন করা সম্ভব। "বর্তমানে তারা পাস নিচ্ছে, ভয়ে থাকতেছে এবং যাকে পাস দিচ্ছে বা টাকা যার কাছে দিচ্ছে তাদের কোনো তথ্য তারা আমাদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভয় পাচ্ছে। কারণ তারা মনে করছে ডাকাতরা তাদের ক্ষতি করবে বা বনদস্যুরা তাদের জানমালের কোনো ক্ষয়ক্ষতি করবে।

এই ভয় থেকে কাটিয়ে উঠে তারা যদি নির্ভয়ে আমাদের রিচ করে বা আমরা তাদের কাছে রিচ করলে যদি আমাদেরকে বলে যে আমরা এইখানে টাকা দিয়েছি, তাহলে আমরা অতি দ্রুত এই সমস্যা সমাধান করতে পারি," বলেন স্টেশন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট মোল্লা মাহমুদ আল হোসাইন। সুন্দরবনে বনদস্যুদের সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে ভয় আতঙ্কে থাকার কথা শিকার করেন উপকূলীয় বনজীবীরা। তাদের মতে, কোস্টগার্ডসহ বিভিন্ন বাহিনী তৎপরতা বনজীবীদের সমাধান দিচ্ছে না। পরিস্থিতি এতটাই অবনতি হয়েছে যে বনে যাওয়া বন্ধ রেখে রীতিমত আন্দোলন শুরু করেছেন উপকূলের বনজীবীরা।

বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচিও হয়েছে। উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাওসার আজিজ জানান, পরিস্থিতি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা কমিটিতে আলোচনা হয়েছে এবং সমস্যা সমাধানে একটি সম্মিলিত যৌথ অভিযানের প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর স্বদিচ্ছাও গুরুত্বপূর্ণ। "আমরা মনে করি শুধু এককভাবে শুধু সাতক্ষীরা জেলায় যদি আমরা অভিযান করি সেটায় তেমন সুফল আমরা পাবো না। কিন্তু বিভাগীয় পর্যায় থেকে যদি আমরা একটা অভিযান পরিচালনা করতে পারি সমন্বিতভাবে, তাহলে নিশ্চই এর সুফল পাওয়া যাবে।"