ন্যুনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পঞ্চম দিনের মতো বিক্ষোভ করেছেন পোশাক শ্রমিকরা। এদিকে, চলমান শ্রমিক অসন্তোষের মাঝে নবগঠিত মজুরি বোর্ড বুধবার জানিয়েছে, পোশাক শ্রমিকদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো আগামী ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে। বুধবার বোর্ডের প্রথম সভা শেষে সদস্য বাবুল আখতার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, শ্রমিক ও মালিক পক্ষের প্রতিনিধিরা সম্মত হয়েছেন যে নতুন মজুরি যত টাকাই নির্ধারণ করা হোক না কেন, তা কার্যকর হবে চলতি বছরের পহেলা ডিসেম্বর থেকেই, পাবে জানুয়ারিতে।
আজ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এই সভা শুরু হয়। যদিও এটি হওয়ার কথা ছিল আজ বিকেলে। এদিকে, আজ সকাল থেকে শ্রমিকদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কোথাও কোথাও পুলিশকে সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করতে হয়। বিশেষ করে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুরের পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত ছিল। এসব স্থানের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের লক্ষ্যে পুলিশের পাশাপাশি অতিরিক্তি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), স্পেশাল রিজার্ভ ব্যাটালিয়ন বা এসআরবি (পূর্বের র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাব) ও আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়ে।
এগুলোর পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার পল্লবীতেও বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। মজুরি বাড়ানোর দাবিতে গাজীপুরের একাধিক স্থানে শ্রমিক-পুলিশের সংঘর্ষ হয় আজ। গতকাল গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় আন্দোলনের ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন এক পোশাকশ্রমিক। এরপর তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তার মৃত্যুর ঘটনায় আগে থেকেই ওই অঞ্চলে উত্তেজনা বিরাজ করছিলো। স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ওই শ্রমিক মারা যাওয়ার পর বাংলাবাজারের অনেক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল।
কিন্তু যেসব কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিলো, সেগুলোর শ্রমিকরাও আজকের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে। জানা যায়, এদিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বাংলাবাজারসহ আশেপাশের এলাকায় কয়েক হাজার শ্রমিক গাজীপুরের ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নেয়। গাজীপুরের স্থানীয় সাংবাদিক আরিফ খান আবির এ দিন একাধিক স্থানে ছিলেন। তিনি আজকের ঘটনাপ্রবাহ উল্লেখ করে জানান, খবর পেয়ে শিল্প পুলিশ, ডিএমপি ও বিজিবি ঘটনাস্থলে চলে আসে। তখন তাদের ওপর বিক্ষোভকারীরা ইট-পাটকেল ছুঁড়ে মারে। তারপর তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে নিরাপত্তা বাহিনী।
পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে নিরাপত্তা বাহিনী ওই এলাকা থেকে সরে যায় এবং এর মাঝেই ফের সেখানে শ্রমিকরা জড়ো হয়। তখন পুলিশের সাথে তাদের দ্বিতীয় দফায় সংঘর্ষ হয়। এ সময় বেশ কিছু শ্রমিক আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন এই স্থানীয় সাংবাদিকরা। পাশাপাশি, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বাধা পাওয়ার পর বিক্ষোভকারীরা গাজীপুর চৌরাস্তা এলাকায় সড়ক অবরোধের চেষ্টা করে এবং সেখানেও পুলিশের সাথে সংঘর্ষ হয়। এর বাইরে গাজীপুরের নলজানিসহ আর কিছু স্থানে বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন ।
একই পরিস্থিতি ঢাকার সাভারেও। অনেক বেলা অবধি সেখানকার পরিস্থিতি থমথমে ছিল। ওই এলাকার কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা আজ সকাল ৯টার দিকে বিক্ষোভে নামে। সাভারের স্থানীয় সাংবাদিকরা জানান, শুরুটা হয় হেমায়েতপুরের পদ্মার মোড় এলাকা থেকে। ওই এলাকার শ্রমিকরা সকাল ৮টার দিকে কারখানায় প্রবেশ করে হাজিরা দেন। এরপর পৌনে ৯টার দিকে তারা যার যার মতন করে বেরিয়ে এসে বিক্ষোভ শুরু করেন। এক পর্যায়ে তারা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করে এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। তখন পুলিশও তাদের ওপর পাল্টা টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে।
স্থানীয় সাংবাদিক সেলিম আহমেদ বিবিসি বাংলাকে জানান, "আমি নিজে বিক্ষোভে কিছু মুখোশধারী লোক দেখেছি। তাদের কারও মাথায় হেলমেট ছিল, কারও মুখোশ ছিল, কারও কারও মাথা কাপড় দিয়ে বাধা ছিল। তারা লাঠি নিয়ে শ্রমিক ও পুলিশদের ওপর আক্রমণ করে।" "তখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে গেছে। তখন শ্রমিকরা একযোগে সাভার থানার ওসি সাইফুল আলমকে আক্রমণ করে। পুলিশের ভ্যান আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়।" দুপুর দুইটায় যখন সেখানকার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা হয়, তখন ওই এলাকায় পরিস্থিতি থমথমে ছিল।
জানা যায়, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার এক পর্যায়ে শ্রমিকরা হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ডে জড়ো হয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক বন্ধ করে। তখন প্রায় দেড় ঘণ্টা রাস্তা বন্ধ ছিল। ওইসময় সাংবাদিকরা ছবি তুলতে পারছিলেন না। বিক্ষোভকারীরা ক্যামেরা দেখলেই ভেঙ্গে ফেলছিলেন। আর পুলিশ ও সাংবাদিকরা ঘটনাস্থল থেকে অনেকটাই দূরে আশ্রয় নিয়েছিলো। পরিস্থিতি সামলাতে শেষ-মেষ সাভার ও আশুলিয়ায় দুই প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। এর বাইরেও আরও কিছু এলাকায় সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জে আজ তৃতীয় দিনের মতো সড়কে নেমেছেন পোশাক শ্রমিকেরা। এদিন সকালে তারা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মহাসড়কের পাশে জড়ো হয়ে অবরোধের চেষ্টা করেন।
কিন্তু সেখানেও তাদের সাথে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয় এবং তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। আজ বুধবার সকালে সদর উপজেলার কাঠেরপুল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ সময় শ্রমিকরা হাজীগঞ্জ পোস্ট অফিস সড়কে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। পরে পুলিশ তাদের ওপর টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এদিকে, স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বৃদ্ধির দাবিতে গাজীপুরের কাশিমপুর থানায়ও ইট-পাটকেল ছুড়ে ঘেরাওয়ের চেষ্টা করেছিলেন আন্দোলনকারীরা। এসময় তাদের সাথে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদুনে গ্যাস ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ।
দিনভর বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও সড়ক অবরোধের পর সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ। শিল্প পুলিশ-১'র একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে জানান, সাভার, আশুলিয়া, ধামরাই এলাকায় প্রায় ৮০০টি পোশাক কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় দু'শোটি দুপুরের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেলেও বাকিগুলোতে কার্যক্রম চলেছে। সেগুলো যথারীতি বিকেলে বন্ধ হবে। তিনি জানান, আজ বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকরা সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ তাদেরকে সরিয়ে দেয়। শ্রমিকদের বিক্ষোভের কারণে সাভারে দীর্ঘ সময় সড়ক বন্ধ ছিল।
পরে জেলা পুলিশ, থানা পুলিশ ও শিল্প পুলিশের সদস্যরা মিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। বিক্ষোভের মধ্যে সাভার থানার ওসির গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এই শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে চার শতাধিক শিল্প পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছে। বৃহস্পতিবার কারখানাগুলো খোলা রাখার বিষয়ে নতুন কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। তবে নতুন নির্দেশনা না এলে স্বাভাবিক নিয়মেই কার্যক্রম চলবে বলে আশা করছেন তিনি। অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিল্প পুলিশ-৪'র (নারায়ণগঞ্জ) পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ।
তিনি বিবিসি বাংলাকে জানান, সকালে মাইক্রোফাইবার নামের একটি কারখানার তিন থেকে চার হাজার শ্রমিক বেরিয়ে এসে আশপাশের অন্য কারখানার শ্রমিকদেরও আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য চাপ দেন। কিন্তু অন্য কারখানার শ্রমিকরা বের হতে রাজি হয় না। একপর্যায়ে পুলিশ বল প্রয়োগ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, এই শিবু মার্কেট এলাকার আশপাশে ১০ থেকে ১২টি বড় কারখানায় প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। তবে অন্য কারখানাগুলোতে একই ধরনের বিক্ষোভ দেখা যায়নি। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার পর শ্রমিকরা নিজ নিজ কাজে ফিরে গেছেন।
নারায়ণগঞ্জে শিল্প পুলিশ, বিজিবি, জেলা পুলিশ যৌথভাবে কাজ করছে এবং নিরাপত্তার স্বার্থে পুরো নারায়ণগঞ্জে অতিরিক্ত নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। চলতি বছরের পহেলা ডিসেম্বর থেকে শ্রমিকদের জন্য নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন মজুরি বোর্ডের সদস্যরা। জানুয়ারি মাস থেকে শ্রমিকরা নতুন হারে বেতন পাবেন বলে জানানো হয়েছে। বুধবার সেগুনবাগিচায় নিম্নতম মজুরি বোর্ডের কার্যালয়ে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য গঠিত নিম্নতম মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা শেষে শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি ও বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার বলেন, "নতুন মজুরি পয়লা ডিসেম্বর থেকে কার্যকর এবং জানুয়ারিতে ডিসেম্বর মাসের বেতনের সঙ্গে শ্রমিকদের তা পরিশোধের বিষয়ে মালিকপক্ষের প্রতিনিধির সঙ্গে তাদের ঐকমত্য হয়েছে।
এ বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য নেই।" পরবর্তী সভায় শ্রমিকপক্ষের লিখিত প্রস্তাব জমা দেওয়া হবে। এজন্য সব শ্রমিক সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধভাবে একটি যৌক্তিক মজুরি প্রস্তাব তৈরি করে বোর্ডে জমা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি ও বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক এ বি এম সামছুদ্দিনও ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি নির্ধারণের কার্যক্রম সম্পন্ন করার বিষয়ে ঐকমত্যের কথা জানান।
সভায় সভাপতিত্ব করেন নিম্নতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আজাদ সুবহানী। তিনি বলেন, সাধারণত শিল্প খাতের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য ছয় মাসের একটি সময়সীমা থাকে। তবে বর্তমান সরকার দ্রুততম সময়ে বোর্ড গঠন করেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকারের কাছে সুপারিশ প্রণয়ন ও তা জমা দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। সভায় শ্রমিক প্রতিনিধিগণ মজুরি ছাড়াও শ্রমিকদের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন। এর মধ্যে শ্রম আইন বাস্তবায়ন, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার, ছুটি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয় রয়েছে।
এসব সমস্যা পর্যায়ক্রমে সমাধানে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তারা। শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া, গ্রেফতার হওয়া শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের মুক্তি এবং তাদের প্রতি কোনো ধরনের নির্যাতন না করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান শ্রমিক নেতা বাবুল আকতার। তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে গত পয়লা নভেম্বর ছয় সদস্যের বোর্ড গঠন করে সরকার। শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অসন্তোষের পরিপ্রেক্ষিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়।


পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য সরাসরি প্রকাশিত হবে। অনুপযুক্ত মন্তব্য প্রশাসক সরিয়ে দিতে পারেন। ব্যক্তিগত বা গোপন তথ্য লিখবেন না।
এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মন্তব্যটি লিখুন।
মন্তব্য লিখুন