মজুরি বাড়ানোর দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের চলমান বিক্ষোভ সহিংস হয়ে উঠছে উল্লেখ করে কর্তৃপক্ষকে শ্রমিকদের ওপর নিপীড়ন বন্ধ করতে বলেছে এইচআরডাব্লিউ৷ এক প্রতিবেদনে তারা আরো বলেছে, মজুরির বিষয়ে যৌক্তিক দাবি পূরণ করার পরিবর্তে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভ উসকে দিতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দায়ী করছে৷ গতকাল নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনের শুরুতেই পোশাক শ্রমিকদের চলমান আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকার বিষয়টি তুলে ধরেছে৷ সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মজুরি বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলনরত পোশাক শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠি ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে৷

এছাড়া কারখানার মালিক ও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ ওঠা দুর্বৃত্তদের সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ, কারখানায় ভাঙচুর এবং পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে৷ পুলিশ যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী এবং আনুপাতিক হারে বলপ্রয়োগ করে আর যারা সহিংসতার জন্য দায়ী, তাদের যেন জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয় - বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের উচিত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তা নিশ্চিত করা৷ গত ৩ নভেম্বর তৌফিক হোসেন নামের এক পোশাক শ্রমিকের মৃত্যুর বিষয়টিও উল্লেখ করা হয় এইচআরডাব্লিউর প্রতিবেদনে৷

ওই সময় তৌফিকের সঙ্গে ছিলেন তার এক সহকর্মী৷ হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে তিনি বলেছেন, ‘‘আমরা (দুপুরের খাবার খাওয়ার পর) কারখানায় ফিরে যাচ্ছিলাম৷ তখন তৌফিক আন্দোলনরত শ্রমিক এবং অন্য একটি পোশাক কারখানার পক্ষ থেকে বিক্ষোভ দমনের জন্য ভাড়া করে আনা ব্যক্তিদের মাঝে আটকা পড়ে যায়৷ আমি পেছনে তাকিয়ে দেখি তৌফিক মাটিতে পড়ে আছে৷ ভাড়াটে লোকজন তাকে নির্মমভাবে পিটিয়েছিল৷'' আন্দোলনরত শ্রমিকরা মাসে ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা (২৪১ মার্কিন ডলার) মজুরির দাবি জানাচ্ছেন৷

সর্বশেষ ২০২৩ সালে তাদের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল৷ সরকার গত ১ নভেম্বর একটি মজুরি বোর্ড গঠন করেছে৷ সেই বোর্ড জানিয়েছে, নতুন বেতন কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার পর তা ডিসেম্বর মাস থেকে কার্যকর হবে৷ এসব তথ্যেরও উল্লেখ রয়েছে এইচআরডাব্লিউর প্রতিবেদনে৷ প্রতিবেদনে জানানো হয়, ৩১ বছর বয়সি এক সেলাই মেশিন অপারেটর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাটিকে বলেছেন, ‘‘আমার বাসা ভাড়া ৬,০০০ টাকা (৪৮ ডলার)৷ রান্নার গ্যাসের খরচ এখন ২,৩০০ টাকা (১৮.৫০ ডলার)৷

অন্যদিকে আমার মাসিক আয় ১৩ হাজার ৫০০ টাকা (১০৮ ডলার)৷ এ বছর আমি সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে পারছি না৷ আপনারাই বলুন, তাহলে খাবার কেনার জন্য কী অবশিষ্ট থাকে?'' এইচআরডাব্লিউর পর্যবেক্ষণ, জীবনধারণের উপযোগী মজুরির যৌক্তিক দাবিগুলো পূরণ করার পরিবর্তে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ এখন বিক্ষোভ উসকে দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দায়ী করছে৷ প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৩ নভেম্বর ঢাকা পুলিশ জানায়, তারা অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সাবেক ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ৩৩ জন সমর্থককে গ্রেপ্তার করেছে৷

অন্যদিকে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি)-র যুব শাখার সদস্যরা আন্দোলনরত শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মিছিল করেছে – এমন অভিযোগও উঠেছে৷ গত ৩রা নভেম্বর আশুলিয়ায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে তিন শ্রমিক নেতাকে আটক করার বিষয়টিও উঠে এসেছে এইচআরডাব্লিউর প্রতিবেদনে৷ আরো উঠে এসেছে কয়েক হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে পুলিশের সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করার কথা৷ আটক হওয়া এক ব্যক্তির ২৮ বছর বয়সি স্ত্রী এইচআরডাব্লিউকে বলেছেন, ‘‘তারা আমার স্বামীকে নিয়ে গেছে।

সে অল্প সময়ের জন্য বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল। সে কোনো ধরনের সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ছিল না।'' এইচআরডাব্লিউর প্রতিবেদনের শেষে পোশাক শ্রমিকদের মজুরির বিষয়ে বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সাম্প্রতিকতম প্রতিশ্রুতির বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়৷ বলা হয়, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে বিএনপি সরকার মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি নির্ধারণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল৷ তারপর গত এপ্রিলে শ্রম আইনে আনা এক সংশোধনী অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর অন্তর মজুরি পর্যালোচনা করার বিধান রাখা হয় এবং নিয়োগকর্তাদের জন্য ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠকদের কালো তালিকাভুক্ত করা নিষিদ্ধ করা হয়৷

এইচআরডাব্লিউ মনে করে, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের মজুরি বিষয়ক আলোচনাকে কেন্দ্র করে চলমান সহিংসতা ও দায়মুক্তির এই চক্রের অবসান ঘটানো উচিত৷ বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোরও যে এক্ষেত্রে ভূমিকা রয়েছে – তা স্মরণ করিয়ে এইচআরডাব্লিউ বলেছে, সরবরাহকারীদের সঙ্গে তাদের চুক্তির শর্তাবলি যেন কর্মক্ষেত্রে কোনো ধরনের অপব্যবহারকে উৎসাহিত না করে, অথবা শ্রমিকদের জন্য জীবনধারণ উপযোগী মজুরি পাওয়াকে অসম্ভব করে না তোলে – বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোকে তা নিশ্চিত করতে হবে৷ এসিবি/ জেডএইচ (এইচআরডাব্লিউর প্রতিবেদন)