যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জয়ী প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদের একটা ভারতীয় যোগ রয়েছে। তার স্ত্রী ডা. সারা জুকাকু ভারতীয় বংশোদ্ভূত। দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকের উপকূলীয় অঞ্চলের সঙ্গে ডা. সারা জুকাকুর পরিবারের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তার দাদু জুকাকু শামসুদ্দিন ছিলেন উত্তর কন্নড় জেলার বাসিন্দা। তিনিই সেই ব্যক্তি যার হাত ধরে ভাটকালে বিদ্যুৎ সরবরাহ এসে পৌঁছেছিল। ওই অঞ্চলের প্রথম আইনজীবী ছিলেন তিনি।
পরে মুখ্যমন্ত্রী বিডি জট্টি (১৯৫৮-১৯৬২ সাল) সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন উপমন্ত্রীর দায়িত্বও সামলান জুকাকু শামসুদ্দিন। ডা. সারা জুকাকুর আরেক আত্মীয় এসএম ইয়াহিয়াও একজন আইনজীবী ছিলেন। পরে তিনি মুখ্যমন্ত্রী দেবরাজ অরসের (১৯৭২- ১৯৭৭ এবং ১৯৭৮- ১৯৮০ সাল) নেতৃত্বাধীন সরকারে মন্ত্রিত্ব সামলান। শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এসএম ইয়াহিয়া। ফিরে আসা যাক আবদুল এল-সাইয়েদের প্রসঙ্গে যিনি পেশায় একজন চিকিৎসক এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সেনেটর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ৫০ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, তার প্রতিদ্বন্দ্বী এবং রিপাবলিকান পার্টির মাইক রজার্স প্রায় ৪৫ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। প্রসঙ্গত, ডা. আল-সাইয়েদ এর আগে কখনো কোনো রাজনৈতিক পদে ছিলেন না। এই নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি বড় ধরনের পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন সংসদের উচ্চকক্ষ সেনেটে এখন ৫৪ জন ডেমোক্র্যাট এবং ৪৪ জন রিপাবলিকান সদস্য রয়েছেন। মার্কিন সংসদের নিম্নকক্ষ অর্থাৎ 'হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ' বা প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪০ এবং রিপাবলিকান পার্টির সদস্য সংখ্যা ১৪৭। এই কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ২১৮টা আসন প্রয়োজন। এর অর্থ হলো, ডেমোক্র্যাটিক পার্টি দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। সেনেটের দুটি ও প্রতিনিধি পরিষদের ৪৮টি আসনের ফল ঘোষণা এখনো বাকি আছে।
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন নির্বাচনী প্রচার চলাকালীন আবদুল এল-সাইয়েদ নিজের সম্পর্কে বলেছিলেন, "শুনুন, আমার বিয়ে হয়েছে এক দক্ষিণ ভারতীয় পরিবারে। ২০ বছর ধরে এই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ আমরা।" "এখন আমি পুরোপুরি এই পরিবারের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছি। হয়তো আপনারা জানেন না যে আমি একজন আরবের চেয়ে বেশি একজন ভারতীয় হয়ে গিয়েছি।" আবদুল এল-সাইয়েদের এই জয়ে আপ্লুত পরিবারের সকলে। ডা. সারা জুকাকুর ফুপু ডা. আলিয়া নাজনীন জুকাকু একজন পেডিয়াট্রিশিয়ান (শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ)। এল-সাইয়েদের জয়ের প্রসঙ্গে ভাটকলের এই বাসিন্দা বিবিসি নিউজ হিন্দিকে বলেছেন, "আমরা খুব খুশি এবং গর্ব বোধ করছি। সাইয়েদ কয়েক বছর আগে ভাটকল এবং ব্যাঙ্গালোর সফরে এসেছিলেন।" "উনি খুবই হাসিখুশি এবং মিশুক মানুষ। সবাইকে সবসময় সাহায্য করেন।
ওর সঙ্গে সময় কাটিয়ে বেশ ভালো লেগেছে। আমরা ভাটকলে যে ভাষায় কথা বলি তার কয়েকটা শব্দও বলতে পারেন উনি। ডা. সারার পরিবার ইংরেজিতে কথা বলে।" আলিয়া নাজনীন জুকাকুর বড় ভাই ডা. তৈয়ব জুকাকু সারা জুকাকুর বাবা। ডাক্তারি পড়াশোনা শেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান তৈয়ব জুকাকু। ১৯৬৪ সালে মৃত্যু হয় তাদের বাবা জুকাকু শামসুদ্দিনের, সে সময় তার বয়স ছিল ৫১ বছর। সারা জুকাকুর জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে এবং সেখানেই তার বড় হয়ে ওঠা এবং পঠন-পাঠন। আবদুল এল-সাইয়েদ এবং সারা জুকাকুর দেখা হয়েছিল ছাত্রাবস্থায়। সেই সময় তারা মিশিগান ইউনিভার্সিটিতে পড়ছিলেন এবং দু'জনেই রোডস স্কলার ছিলেন। এল-সাইয়েদ মিশিগান ইউনিভার্সিটি এবং কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে চিকিৎসাবিদ্যা নিয়ে লেখাপড়া করেন। পরে মহামারীবিদ্যায় বিশেষজ্ঞতা অর্জন করেন। ২০১৫ সালে ডেট্রয়েট স্বাস্থ্য বিভাগের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি।
তার এই নিয়োগের খবর জাতীয় সংবাদ মাধ্যমে শিরোনামে জায়গা করে নিয়েছিল। ডা. সারা জুকাকুর এক ফুপাতো ভাই বলেন, "আমার মামা ডা. তৈয়ব প্রায় প্রতি বছরই পরিবারের সবাইকে নিয়ে পুনর্মিলন অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। সাইয়েদের ভারতের আসার কারণ সেটাই ছিল।" নিজের নাম প্রকাশ করছে চাননি ডা. সারা জুকাকুর এই ভাই। জয়ী ডেমোক্র্যাট সম্পর্কে আলিয়া নাজনীন জুকাকু বলেছেন, "সাইয়েদ একজন অত্যন্ত প্রতিভাবান ব্যক্তি এবং তিনি সকলের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের কাজে নিজেকে নিবেদন করেছেন। উনি এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়-সহ সবার অধিকারের জন্য লড়াই করছেন। মূলত, তিনি মানবতার জন্যই কাজ করছেন।" তিনি আরও বলেন, "আমার বাবা (জুকাকু শামসুদ্দিন) ভাটকলের নাম করা ব্যক্তিত্ব ছিলেন। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব বোধ করি। আশা করছি, উনি (সাইয়েদ) আমার বাবার ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।"
বাবার কথা বলতে গিয়ে স্মৃতির পাতা উল্টেছেন ডা. আলিয়া নাজনীন জুকাকু। তিনি জানিয়েছেন অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তার বাবা। তিনি বললেন, "উনি গোটা দিনে মাত্র একবেলা খেয়ে কাটিয়ে দিতেন এবং পরিবারের ভরণপোষণের জন্য একটা হোটেলে ওয়েটার হিসেবে কাজ করতেন। আমার দাদু (মাতামহ) এমএম সিদ্দিকী তাকে আইন নিয়ে পড়াশোনা শেষ করতে সাহায্য করেন এবং তার বিয়ে দিয়ে দেন।" "মুখ্যমন্ত্রী জট্টির সরকারে পাঁচ বছর উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর যখন তার মৃত্যু হয়, তখন আমার মা আমাদের বলেছিলেন যে উনি ২৫ টাকাও রেখে যাননি। ১০টি সন্তানকে বড় করতে আমার মাকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে।" সারা জুকাকুর এক ফুপাতো ভাই বলেছেন, "আমার দাদু এবং এল-সায়েদের ব্যক্তিত্বে মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। উনিও সৎ, স্পষ্টভাষী এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আমার আরেক মামা, এসএম ইয়াহিয়াও এরকমই ছিলেন, যিনি দেবরাজ অরস সরকারের আমলে কর্ণাটকের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।" এসএম ইয়াহিয়া একজন সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত মন্ত্রী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। জুকাকু শামসুদ্দিনের পরিবার ভাটকল, বেঙ্গালুরু এবং যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যই হয় ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার। আলিয়া নাজনীন জুকাকুর স্বামীও চিকিৎসক। তার কথায়, "আমি এবং আমার স্বামী- দু'জনেই পেডিয়াট্রিশিয়ান (শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ)। আমরা বিদেশে কাজ করেছি। তবে আমরা নিজেদের শিকড়ের টানে ফিরে এসেছি। ভাটকলে ডাক্তারের সংখ্যা কম, অন্য জায়গায় সহজেই চিকিৎসক পাওয়া যায়।" ডা. সারা জুকাকুর দাদু (মাতামহ) এমএম সিদ্দিকী ভাটকালে আঞ্জুমান হামি-ই-মুসলিমিন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই সংস্থা নার্সারি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে। জুকাকু শামসুদ্দিন সমাজের সব শ্রেণির মানুষের প্রতি সমান গুরুত্ব দিয়ে এই প্রতিষ্ঠানের আরো সম্প্রসারণ করেন।
ব্যাঙ্গালোর সারা জুকাকুর নামে একটা সম্পত্তি রয়েছে। এই বিষয়ে আবদুল এল-সাইয়েদ তার আর্থিক বিষয়ের বিবরণ দেওয়ার সময় উল্লেখ করে জানিয়েছেন তার স্ত্রীর নামে ব্যাঙ্গালোরে সম্পত্তি রয়েছে, তবে তা ভাড়া দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারের শেষের দিকে পরিস্থিতি ক্রমশো আরো উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির হ্যালি স্টিভেন্স রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের প্রতি নিজের সমর্থনের কথা ঘোষণা করে বসেন।
দলের মনোনয়নের দৌড়ে হ্যালি স্টিভেন্স ডা. আবদুল এল-সাইয়েদের কাছে স্বল্প ব্যবধানে পরাজিত হন। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা-সহ বেশ কয়েকজন উদারপন্থি ডেমোক্র্যাট নেতা অবশ্য এল-সাইয়েদকে সমর্থন করেন। ৪২ বছর বয়সী এই নেতা একটা বামপন্থি প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রচার চালিয়েছিলেন। যে বিষয়গুলোকে তিনি প্রচারের সময় মূলত তুলে ধরেছিলেন তার মধ্যে ছিল ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তার সমালোচনা এবং সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার অর্থায়নের জন্য ধনকুবেরদের ওপর কর আরোপ।


পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য সরাসরি প্রকাশিত হবে। অনুপযুক্ত মন্তব্য প্রশাসক সরিয়ে দিতে পারেন। ব্যক্তিগত বা গোপন তথ্য লিখবেন না।
এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মন্তব্যটি লিখুন।
মন্তব্য লিখুন