সন্দেহ, অবিশ্বাস এবং অনেক প্রশ্ন ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা নিয়ে। যদিও ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী বার বার একই অবস্থান তুলে ধরছেন যে, তিনি ডিসেম্বরেই দেশে ফিরবেন। কিন্তু প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এবং মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়ে তিনি আসলে দেশে ফিরবেন কি না, এমন সন্দেহ প্রকাশ করছেন তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা। শেখ হাসিনার ফেরার ক্ষেত্রে একটা বড় বিষয় বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা।

আর সেই বিবেচনায় তার ফেরার প্রক্রিয়া বেশ জটিল হবে বলে মনে করছেন রাজনীতিকদেরই অনেকে। কারণ, দেশে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা তার দল আওয়ামী লীগকে হঠাৎ ঝটিকা মিছিল করে তাদের অস্তিত্বের জানান দেওয়ার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে; এর বাইরে তারা সেভাবে প্রকাশ্যে বড় কোনো সাংগঠনিক শক্তি দেখাতে পারেনি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের শাসনের পতনের প্রেক্ষাপট নিয়ে তারা এখনও 'ষড়যন্ত্র তত্ত্বেই' আটকে আছে; অনুশোচনার পথেও নেই তারা।

এই বিষয়টিকে বড় রাজনৈতিক 'অস্ত্র' হিসেবে ব্যবহার করছে তাদের বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ। চব্বিশের পাঁচই অগাস্টের পর থেকেই আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে তাদের বিরোধী দলগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে দেশের রাজনীতির মাঠ। রাজনীতির বাইরে আইনগত দিক থেকেও জটিলতার প্রশ্ন উঠছে। বিএনপি সরকার ভারতের সাথে অভিযুক্ত, ফেরার আসামী বা বন্দি বিনিময়ের প্রত্যার্পণ চুক্তির মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে ফেরত আনতে চায়। তবে বিএনপি সরকারেরই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কেউ কেউ মনে করেন, ওই চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ফেরানো যাবে, সেই সম্ভবনা কার্যত নেই। ভারত সে পথে যাবে না বলে তাদের ধারণা। আইনের এই প্রক্রিয়ায় না গেলে শেখ হাসিনার নিজের ঘোষণা অনুযায়ী তার ফেরার জন্য প্রয়োজন হবে বাংলাদেশ সরকারের পাসপোর্ট বা ট্রাভেল পাস। সেটি নির্ভর করবে বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।

আর এমন প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনা কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় ফিরতে চান, বিষয়টিতে তার নিজের নিয়ন্ত্রণ কতটা থাকছে, এটি ভারতসহ ভূ-রাজনীতিরও কোনো বিষয় হচ্ছে কি না- এ ধরনের অনেক প্রশ্ন রয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। তিনি ট্রাভেল পাস বা পাসপোর্ট, কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে তার সমর্থকদের নিয়ে স্থল সীমান্তের কোনো পয়েন্টে চলে আসতে পারেন কি না, এমন আলোচনাও রয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠ এখন শেখ হাসিনার পক্ষে নয়। আওয়ামী লীগের প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ নেই।

তার প্রতিপক্ষ সরকারি দল বিএনপি, বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এবং জুলাই ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের দল এনসিপি নিয়ন্ত্রণ করছে রাজনীতি। এদের পাশাপাশি বর্তমানে সক্রিয় অন্য দলগুলো্র নিজেদের ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক স্বার্থ থাকলেও শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তাদের মধ্যে এক ধরনের ঐকমত্য আছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিএনপিসহ এই দলগুলো প্রত্যার্পণ চুক্তির মাধ্যমেই তাকে ফিরিয়ে এনে মৃত্যুদণ্ডের সাজা ও অন্যান্য মামলায় বিচারের মুখোমুখি করার কথা প্রকাশ্যে বলছে।

কিন্তু শেখ হাসিনা নিজের ঘোষণা অনুযায়ী, কোনো বাধা ছাড়াই দেশে এসে রাজনীতিতে ফিরবেন বা ফিরতে পারবেন, এটা তারা চায় না। রাজনীতির মাঠের এই পরিস্থিতি তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এমন প্রেক্ষাপটে বর্তমানে প্রভাবশালী কোনো দলের সঙ্গে সমঝোতা করাও বেশ কঠিন। অন্যদিকে, জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হত্যাকাণ্ড, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গত বছরের ১৯শে নভেম্বর পর্যন্ত ৬৬৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৪৫৩টি।

দুর্নীতিবিরোধী বেসরকারি সংস্থা টিআইবি গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে একটি মামলায় তার মৃত্যুদণ্ডের সাজাও রয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, তার জন্য একেবারে বৈরি রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সেখানে তার নিরাপত্তার প্রশ্ন আছে। একইসঙ্গে আছে ফাঁসির রায়। এমন প্রেক্ষাপটেই দেশের রাজনীতিতে এক ধরনের সন্দেহ, অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে, শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ঝুঁকি নেবেন কি না।

বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের নেতারাও সভা-সমাবেশে বক্তব্যে এমন সন্দেহের কথা বলছেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলে আসছেন, শেখ হাসিনা তার কর্মীদের হতাশা কাটাতে দেশে ফেরার কথা বলছেন। কিন্তু তিনি ঝুঁকি নিয়ে ফিরবেন না। শেখ হাসিনাকে প্রত্যার্পণ চুক্তির আওতায় ভারত থেকে ফেরত আনার বিষয়টি বেশ কঠিন, এমন আলোচনা আছে রাজনীতিতে। তাহলে তার নিজের ফেরত আসার জন্য বিএনপি সরকার ট্রাভেল পাস বা পাসপোর্ট দেবে কি না, তাও নিশ্চিত নয়।

সবমিলিয়ে শেখ হাসিনার ফেরার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেক প্রশ্নে জটিলতা থাকছে। বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে যুক্ত হতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন তিনি নিজেই কয়েকদফা এই ঘোষণা দিয়েছেন যে, ডিসেম্বরেই দেশে ফিরবেন। যদিও তিনি মৃত্যুদণ্ডের সাজা, প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়ও তুলে ধরেছেন। তার সেই ঘোষণার পর থেকে দেশে পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা কিছুটা উদ্বুদ্ধ হয়েছেন বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।

ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় ঝটিকা মিছিল বেড়েছে বলেও দৃশ্যমান হচ্ছে। এতে গ্রেফতারের সংখ্যাও বাড়ছে। এ নিয়ে বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের নেতারাও নেতিবাচক নানা বক্তব্যে দিচ্ছেন। যেমন তারা বলছেন, শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের বড় নেতারা ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পালিয়ে রয়েছেন। সেখানে শেখ হাসিনার ফেরার কথা বলে দেশে থাকা নেতা-কর্মীদের বিপদে ফেলেছেন। তবে ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের একজন নেতা বিবিসিকে বলেছেন, তাদের নেত্রীর বয়স এখন প্রায় আশি বছর।

এই বয়সে তিনি লম্বা সময় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকতে পারবেন না। ফলে তিনি এখন দেশের ভেতরে রাজনীতিতে ফিরতে যে কোনো ঝুঁকি নিতে চান। নিজের বয়স ও দলকে রাজনীতিতে ফেরাতে দেশে আসার প্রশ্নে শেখ হাসিনা নিজে আগে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে সমর্থন আদায়ে তিনি গত কয়েক মাসে তার দলের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন বলেও আওয়ামী লীগের ওই নেতা জানান।

পশ্চিমা একটি দেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের আরেক নেতা জানান, শেখ হাসিনা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তার পরিবার এবং এমনকি ভারতের সঙ্গেও কথা বলেছেন। সংশ্লিষ্ট সবার মতামত নেওয়ার পরই তিনি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন। কিন্তু দেশে রাজনৈতিক ও আইনগত চ্যালেঞ্জের মুখে তিনি কিভাবে কোন প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরবেন, সে সব প্রশ্নে দলের নেতাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেননি। এমনকি ফেরার দিনক্ষণ নিয়েও অন্য কারও সঙ্গে তিনি এখনও কথা বলেননি। আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করেন, ফেরার প্রক্রিয়া এবং তাতে বাধা থাকলে বিকল্প উপায় ও দিনক্ষণ- শেখ হাসিনা সবকিছুই ঠিক করে রেখেছেন। তথ্য ফাঁস হওয়ার ভয়ে এখনও অন্য কারও সাথে আলোচনা করছেন না। জুলাই আন্দোলনে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ভূমিকা নিয়ে অনুশোচনা না করায় দেশের জনগণ তাকে কতটা আস্থায় নেবে, সেই প্রশ্নও তুলছেন বিশ্লেষকেরা।

তবে আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যর্থতার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা ছিল না। বর্তমান বিএনপি সরকারেরও সমালোচনা বাড়ছে। এই পরিস্থিতি তাদের রাজনৈতিক অবস্থান তৈরির সুযোগ করে দিয়েছে বলে তারা মনে করছেন। সেই সুযোগটা কাজে লাগাতে চাইছেন তাদের নেত্রী। বিদেশে অবস্থানরত দলটির অন্যতম মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাত বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, শেখ হাসিনা ঝুঁকি থাকলেও ডিসেম্বরেই দেশে ফিরবেন। এই অবস্থানে অটল রয়েছেন তাদের নেত্রী।

আর সেজন্য সারাদেশে তাদের দলকে সাংগঠনিক দিক থেকে গোছানো হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। মি. আরাফাত মনে করেন, প্রত্যার্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত নেওয়া বিএনপি সরকারের জন্য বেশ কঠিন। তিনি নিজের ঘোষণা অনুযায়ীই দেশে ফিরবেন। বিএনপি সরকার গঠনের পর তাদের গত ১০ মাসে প্রত্যার্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের বিজেপি সরকারকে কয়েক দফা চিঠি দিয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এটিকে শুধু আইনি বিষয় হিসেবে বলে আসছেন। রাজনৈতিক সরকারের আগে বাংলাদেশে ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের শাসন। সেই সরকারও তাদের ১৮ মাসের শাসনে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতকে কয়েক দফায় চিঠি পাঠিয়েছে এবং তাগিদ দিয়েছে। তারাও হ্যাঁ বা না, কোনো জবাব পায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিকে গত বছরের ডিসেম্বরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ওই সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছিলেন, "শেখ হাসিনার প্রত্যার্পণ শেষপর্যন্ত নয়দিল্লির সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে"।

বিএনপি সরকারও এখন পর্যন্ত কোনো জবাব পায়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তারা (ভারত) কোনো জবাব দেয়নি। শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে না, এমনটাও বলেনি। তবে, এই সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অন্য একাধিক সূত্র বলছে, ভারতের সাথে বাংলাদেশের প্রত্যার্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ফেরানো যাবে, সেই সম্ভবনা কার্যত নেই।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রত্যার্পণযোগ্য অপরাধ মামলায় অভিযুক্ত, ফেরার আসামি ও বন্দিদের একে অপরের কাছে হস্তান্তরের জন্য চুক্তি আছে ২০১৩ সাল থেকে। এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে গ্রেফতার হওয়া আসামের আলফা নেতা অনুপ চেটিয়াকে ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। দুই দেশের সাবেক কূটনীতিকদের অনেকে মনে করেন, প্রত্যার্পণ চুক্তির আওতায় ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে, সেই সম্ভাবনা কম। ভারত সে পথে যাবে না বলে তাদের ধারণা। যদিও বাংলাদেশে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে। ঢাকায় একজন সাবেক কূটনীতিক বিবিসি বাংলাকে বলেন, ভারত সরকার তাকে অপরাধী হিসেবে নয়, একজন রাজনীতিক হিসেবে উচ্চ মর্যাদা দিয়ে আশ্রয় দিয়েছে। ফলে রাজনৈতিক চিন্তার বাইরে গিয়ে ভারত তাকে চুক্তিটির আওতায় ফেরত দেবে না বলে তার ধারণা।

বিএনপি সরকারের নীতিনির্ধারকদেরও কারও কারও এখন একই ধারণা বলে মনে হয়েছে। বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত এবং পরে সংশোধন করা প্রত্যর্পণ চুক্তিতে যে সব শর্ত আছে, ভারতের দিক থেকে সেগুলোও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। চুক্তিতে একটি ধারায় বলা হয়েছে, যাকে হস্তান্তরের জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ যদি 'রাজনৈতিক প্রকৃতি'র হয়, তাহলে সেই অনুরোধ খারিজ করা যাবে। তবে, কোন কোন অপরাধের অভিযোগকে 'রাজনৈতিক' বলা যাবে না, সেই তালিকাও রয়েছে চুক্তিটিতে। আর এই তালিকার মধ্যে হত্যা, গুম, অনিচ্ছাকৃত হত্যা ঘটানো, বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো ও সন্ত্রাসবাদের মতো নানা অপরাধ আছে। এর ভিত্তিতে শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের অনুরোধ জানানোর অধিকার রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের। এরপরও একইসঙ্গে চুক্তিতে এমন কিছু ধারা আছে, যেগুলো প্রয়োগ করে অনুরোধ খারিজ করার অধিকার রাখে সংশ্লিষ্ট দেশ।

যেমন, অনুরোধ পাওয়া দেশেও যদি ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনও 'প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধে'র মামলা চলে, তাহলে সেটা দেখিয়ে অন্য দেশের অনুরোধ খারিজ করা যায়। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে অবশ্য এটা প্রযোজ্য নয়, কারণ ভারতে তার বিরুদ্ধে কোনও মামলা হয়নি বা অচিরে হওয়ারও সম্ভাবনা নেই। কিন্তু চুক্তিতে এ-ও বলা আছে যে, যদি অনুরোধ পাওয়া দেশের মনে হয় "অভিযোগগুলো শুধুমাত্র ন্যায় বিচারের স্বার্থে, সরল বিশ্বাসে আনা হয়নি" – তাহলেও তাদের সেটি নাকচ করার ক্ষমতা থাকবে। অভিযোগগুলো যদি 'সামরিক অপরাধে'র হয়, যা সাধারণ ফৌজদারি আইনের পরিধিতে পড়ে না, তাহলেও একইভাবে অনুরোধ নাকচ করা যাবে। এখন ভারত এই ধারা প্রয়োগ করেই শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ খারিজ করতে পারবে। আর সে ক্ষেত্রে চুক্তির আওতায় প্রত্যার্পণের অনুরোধ ঝুলিয়ে রাখলেও ভারত এ পথে যাবে না বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।

প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টাও বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি ভারতের সদিচ্ছা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঢাকায় মৃত্যুদণ্ডের সাজা যেমন রয়েছে, একইসাথে তার রেড পাসপোর্ট ও সাধারণ পাসপোর্ট বাতিল করা হয়েছে। ফলে তিনি যখন নিজে দেশে ফিরতে চাইছেন, তাকে পাসপোর্ট বা এর বিকল্প হিসেবে ট্রাভেল পাসের জন্য আবেদন করতে হবে বাংলাদেশ সরকারের কাছে। সে ধরনের কোনো আবেদন এলে বিএনপি সরকার কী করবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

কারণ সরকারের একাধিক নীতিনির্ধারকের সঙ্গে কথা বললে বিষয়টিতে তাদের অবস্থান পরিস্কার করেননি। তাদের একজন বলছেন, তাদের সরকার এখনও প্রত্যার্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ফেরত আনার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। সেই অবস্থানেই তারা রয়েছেন এবং ভারত সরকারকে তাগিদ দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি এমনটাও জানাচ্ছেন যে, ট্রাভেল পাসের আবেদন পাওয়া গেলে তা দেওয়া যায় কি না অথবা না দিলে প্রভাব কী হতে পারে-এসব বিভিন্ন প্রশ্নে আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করে আইনগত দিক খতিয়ে দেখে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।

তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। শেষপর্যন্ত কোন সিদ্ধান্তে তারা যেতে পারেন, সে ব্যাপারে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না সরকারের ওই নীতিনির্ধারক। অন্যদিকে, ডিসেম্বর মাস বেশি দূরেও নয়। শেখ হাসিনা ট্রাভেল পাস বা পাসপোর্টের জন্য আবেদন করবেন কি না, সে ব্যাপারেও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছ থেকে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। শেখ হাসিনার ফেরার প্রশ্নে নিয়ন্ত্রণ তার হাতে নেই। তার সিদ্ধান্ত নেওয়া ও বাস্তবায়নের চেষ্টার ক্ষেত্রে ভারত সরকারের ভূমিকা রয়েছে বলে সরকারি দল বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ মনে করেন। তারা বিষয়টাতে যুক্তরাষ্ট্রকেও ফ্যাক্টর হিসেবে দেখছেন। যদিও ভারত ও পশ্চিমা দেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলছেন, তাদের নেত্রী নিজে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন।

তবে ভারতের ভূমিকা নিয়ে তারা কিছু বলছেন না। এছাড়া তারা শেখ হাসিনার ফেরার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমর্থন তৈরির চেষ্টাও করছেন। ঢাকায় রাজনীতিকদের কেউ কেউ ভারতের ভূমিকা বা অবস্থানকে দেখছেন ভিন্নভাবে। তাদের মতে, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এখানে ফ্যাক্টর। কারণ, শেখ হাসিনার ভারতে থাকার প্রশ্নে দেশটির রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটা ঐকমত্য আছে। সেকারণে তার নিরাপত্তার বিষয় বিজেপি সরকারের জন্য বড় ইস্যু।

তার নিরাপত্তায় কোনো ঘাটতি হলে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চাপের মুখে পড়তে হতে পারে, এটি বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে ভারত সরকারকে। ফলে ঢাকায় রাজনীতিতে এই আলোচনা রয়েছে যে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রশ্নে ভারত সরকারের ভূমিকা থাকবে। বাংলাদেশ সরকারেরও অনেকে ডিসেম্বর মাস ঘিরে সতর্ক থাকার কথা বলছেন। বিএনপি সরকারের নীতিনির্ধারকদের অনেকে মনে করেন, আওয়ামী লীগ গোপন তৎপরতায় আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করতে পারে।

তারা উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িত হতে পারে। সেজন্য তারা সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলছেন। যদিও তারা বলছেন, ট্রাভেল পাস বা পাসপোর্ট ছাড়া সীমান্ত বা বিমান পথ, কোনো দিক দিয়েই শেখ হাসিনার দেশে প্রবেশের সুযোগ থাকবে না। ফলে ট্রাভেল পাস বা পাসপোর্ট না পেলে শেখ হাসিনা তার সমর্থকদের নিয়ে ভারতের কোনো বিমাবন্দরে বা কোনো স্থল সীমান্তে এসে একটা পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করতে পারেন। সে বিষয়টিও তারা বিবেচনায় রাখছেন। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যে,, ডিসেম্বর যত এগিয়ে আসবে, দেশের ভেতরে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার অভিযান জোরদার করতে পারে সরকার। অন্যদিকে, যেহেতু শেখ হাসিনা নিজে ঘোষণা দিয়েছেন, ফলে তাদের দিক থেকে তৎপরতা বাড়ানোর চেষ্টা থাকবে। ফলে ডিসেম্বরে রাজনীতি উত্তপ্ত হয় কি না, এমন শঙ্কা রয়েছে বিশ্লেষকদের পাশাপাশি রাজনীতিকদেরও অনেকের।