ত্বক হলো শরীরের বৃহত্তম অঙ্গ এবং এটি সারাজীবন টিকে থাকে। তারুণ্য ধরে রাখার পাশাপাশি, যত্ন পাওয়া ত্বক আমাদের সার্বিক স্বাস্থ্যের জন্যও সক্রিয়ভাবে উপকারী। কিন্তু আমাদের শরীর ও বাইরের জগতের মধ্যে প্রতিবন্ধক হিসেবে আমাদের ত্বক ক্ষতির শিকার হয়। লাইবনিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্টাল মেডিসিনের চর্মরোগবিদ্যার অধ্যাপক জ্যঁ ক্রুটম্যান বলেন, বায়ু দূষণ, ওজোন এবং জলবায়ু পরিবর্তনসহ পরিবেশগত অনেক কারণ ত্বকের বার্ধক্যের পেছনে ভূমিকা রাখে।
"কয়েক দশক ধরে আমরা মনে করতাম যে পরিবেশগত কারণে ত্বকের বার্ধক্যের প্রধান চালিকাশক্তি হলো অতিবেগুনি (ইউভি) রশ্মি, কিন্তু আমরা জানি যে এটি সঠিক নয়," বলেছেন ক্রুটম্যান। অতিবেগুনি রশ্মি হলো সূর্য থেকে আসা এক প্রকার শক্তি। তিনি বলেন, "প্রাকৃতিক সূর্যালোকের অন্যান্য তরঙ্গদৈর্ঘ্য, যেমন দৃশ্যমান আলো ও অবলোহিত (ইনফ্রারেড) বিকিরণ, বার্ধক্যে ভূমিকা রাখতে পারে"। এমনকি তাপমাত্রা বৃদ্ধিও এই প্রক্রিয়ায় অবদান রাখতে পারে। বয়স বৃদ্ধি নিজেও একটি কারণ।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ধীরে ধীরে কোলাজেন হারাতে থাকি; এই প্রোটিনটি ত্বককে তার গঠন দেয় এবং টানটান রাখতে সাহায্য করে। আর, একটি উপেক্ষিত বিষয় যা আপনার ত্বককে ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে, তা হলো আমাদের খাদ্যাভ্যাস। স্বাস্থ্যকর চর্বি থেকে শুরু করে গাঁজানো খাবার পর্যন্ত, কিছু খাবার স্বাস্থ্যকর ত্বক বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে। বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন অনেক গবেষণায় দেখা গেছে যে, আমাদের ত্বক সুস্থ রাখতে উদ্ভিদজাত খাবার সমৃদ্ধ খাদ্যতালিকা গুরুত্বপূর্ণ।
রঙিন ফল ও শাকসবজি খাওয়ার চেষ্টা করা উপকারী, কারণ এগুলোয় শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যা ত্বককে দূষণ এবং সূর্যের আলোর কারণে হওয়া ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। গাজর, মরিচ এবং টমেটোয় প্রচুর পরিমাণে ক্যারোটিনয়েড থাকে, যার মধ্যে লুটেইন, লাইকোপেন, বিটা-ক্যারোটিন অন্তর্ভুক্ত। ফ্রেডরিখ শিলার ইউনিভার্সিটি জেনার খাদ্য রসায়নের অধ্যাপক ফলকার বোহম বলেন, "এগুলো চর্বি কলায় (ফ্যাট টিস্যুতে) জমা হয় এবং অতিবেগুনি রশ্মি থেকে সুরক্ষা দেয়।"
বোহম বলেন, সানস্ক্রিন গুরুত্বপূর্ণ হলেও, মানুষ সাধারণত প্রতিদিন ব্যবহারের পরিবর্তে দীর্ঘক্ষণ বাইরে থাকার সময় এটি ব্যবহার করে থাকে। তিনি বলেন, নিয়মিত ক্যারোটিনয়েড-সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করলে "সারা বছর ধরে প্রায় দুই থেকে তিনের একটি ধারাবাহিক ভিত্তিগত ইউভি সুরক্ষা ফ্যাক্টর" পাওয়া যায়। টমেটো বা গাজরের সঙ্গে অলিভ অয়েলের মতো স্বাস্থ্যকর ফ্যাট অল্প পরিমাণে যোগ করলে, শরীর সহজেই এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলো শোষণ করতে পারে। বিটা-ক্যারোটিন ভিটামিন এ-তেও রূপান্তরিত হতে পারে, যা ত্বকের কোষের বৃদ্ধি এবং ত্বককে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ত্বকের কোষকে হায়ালুরোনিক অ্যাসিড তৈরি করতে সাহায্য করে ক্যারোটিনয়েড। এই অণুটি ত্বকের দৃঢ়তা ও স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে সহায়তা করে এবং এটি অনেক ময়েশ্চারাইজার ও ‘অ্যান্টি-এজিং’ ক্রিমে পাওয়া যায়। একই রঞ্জক পদার্থ কোলাজেন বাড়াতেও সাহায্য করতে পারে।
একটি ছোট গবেষণায় দেখা গেছে, যে নারীরা দশ মাস ধরে প্রতিদিন ক্যারোটিনয়েড সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেছেন, তাদের ত্বকের কোলাজেন এবং ইলাস্টিনের উন্নতি হয়েছে, যা থেকে বোঝা যায় এটি কোলাজেনের ভাঙ্গন রোধ করতে সাহায্য করতে পারে। অবশেষে, প্রচুর পরিমাণে রঙিন ফল ও শাকসবজি খেলে ত্বকে এক স্বাস্থ্যকর আভা তৈরি হয় বলে দেখা গেছে। উপকার পেতে হলে আমাদের এই খাবারগুলো নিয়মিত খেতে হবে, বলেন ক্রুটম্যান।
আপনি যে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টই গ্রহণ করুন না কেন, পরিবেশগত প্রভাব থেকে সুরক্ষা পেতে এর পরিমাপযোগ্য ফল পেতে সাধারণত আট থেকে দশ সপ্তাহ সময় লাগে। গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আম আমাদের ত্বককে তরুণ রাখতে সাহায্য করে। ক্যালিফোর্নিয়া ডেভিস বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিভিয়েন ফামের নেতৃত্বে পরিচালিত মেনোপজ হয়ে যাওয়া (রজোনিবৃত্তি-পরবর্তী) নারীদের উপর একটি গবেষণার কথা ধরা যাক। অংশগ্রহণকারীরা ১৬ সপ্তাহ ধরে প্রতি সপ্তাহে চারবার ৮৫ গ্রাম (২.৯ আউন্স) আম খেয়েছিলেন। গবেষকরা দেখেছেন যে এটি বিদ্যমান বলিরেখার আকার কমানোর পাশাপাশি নতুন বলিরেখার সংখ্যাও কমিয়ে দিয়েছে।
এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে, তবে গবেষকরা ধারণা করছেন যে এই উপকারী প্রভাবগুলোর কারণ হতে পারে ক্যারোটিনয়েড এবং সেইসঙ্গে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ফ্ল্যাভোনয়েড ও ম্যাঙ্গিফেরিন। আশ্চর্যজনকভাবে, গবেষণায় দেখা গেছে যে প্রতিদিন প্রায় ২৫০ গ্রাম (৮.৮ আউন্স) আম খেলে বলিরেখা বাড়ে। এই গবেষণার অন্যতম সহ-লেখক এবং ক্যালিফোর্নিয়া ডেভিস বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিদ্যার অধ্যাপক রবার্ট হ্যাকম্যান বলেন, এর কারণ এখনো স্পষ্ট নয়, তবে আমে থাকা উচ্চমাত্রার প্রাকৃতিক চিনির কারণে এটি হতে পারে।
"আমাদের প্রস্তাবনা হলো, চিনি ত্বকের অণুগুলোর কিছু ক্ষতি করেছে," বলেন হাকান। এবং যদিও গবেষণাটি ছোট ছিল, পরবর্তী গবেষণায়, যা এখনো প্রকাশিত হয়নি, একই ফলাফল পাওয়া গেছে বলে তিনি জানান। আম এবং লেবু জাতীয় ফলও ভিটামিন সি-তে ভরপুর। এই ভিটামিন আমাদের কোলাজেন উৎপাদনে সাহায্য করে এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবেও কাজ করে, যা আমাদের ত্বককে সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে রক্ষা করতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে যে, ভিটামিন সি ত্বকের আর্দ্রতা বাড়াতে এবং পিগমেন্টেশন কমাতে সাহায্য করতে পারে। এ কারণেই ত্বকের যত্নের পণ্যগুলোয় এবং সাপ্লিমেন্ট হিসেবে ভিটামিন সি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, বলেন ক্রুটম্যান। প্রচুর পরিমাণে বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার খেলে তা আমাদের ত্বকের জন্য উপকারী হতে পারে। এলোমেলোভাবে বিন্যস্ত ও নিয়ন্ত্রিত (র্যান্ডমাইজড-কন্ট্রোলড) একটি ছোট গবেষণায় দেখা গেছে যে, যারা ১৬ সপ্তাহ ধরে নাস্তা হিসেবে বাদাম খেয়েছেন, তাদের বলিরেখা অন্য কোনো নাস্তা খাওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় কম দৃশ্যমান ছিল।
ভিটামিন ই, যা বাদাম ও বীজে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়, তা ত্বককে কোষের ক্ষতি এবং বার্ধক্য থেকেও রক্ষা করতে পারে। এই ভিটামিনের অভাবে ত্বকের স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যার মধ্যে ক্ষত নিরাময় ধীর হয়ে যাওয়াও অন্তর্ভুক্ত। এর ভালো উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে আমন্ড বা কাঠবাদাম, হ্যাজেলনাট, পাইন নাট এবং বিভিন্ন বীজের তেল। বাদামে ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিডও থাকে, যা ত্বকের সুরক্ষা স্তরকে শক্তিশালী করে একে আরও আর্দ্র রাখতে পারে।
আরেক ধরনের স্বাস্থ্যকর ফ্যাট যা আমাদের ত্বকের জন্য উপকারী বলে পরিচিত, তা হলো ওমেগা-৩, যা তৈলাক্ত মাছ এবং শৈবালে পাওয়া যায়। ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ মাছের মধ্যে রয়েছে স্যামন, সার্ডিন এবং ম্যাকেরেল। ছোট ছোট গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই মাছগুলো সূর্যের প্রতি ত্বকের সংবেদনশীলতা কমাতে পারে এবং এর ফলে সূর্যের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে আমাদের রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে। চর্বিযুক্ত মাছ বিদ্যমান কোলাজেন সংরক্ষণ করতে এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
যখন আমরা তাজা ফলমূল, বাদাম এবং বীজ সমৃদ্ধ একটি বৈচিত্র্যময় খাবার খাই, তখন আমাদের অন্ত্রের অণুজীবগুলো উপকৃত হয় – এবং আমাদের ত্বকও সুস্থ থাকে। এর কারণ হলো আমাদের অন্ত্রের স্বাস্থ্য এবং ত্বক একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত। গবেষকরা এই সম্পর্কটিকে 'অন্ত্র-ত্বক অক্ষ' (গাট স্কিন অ্যাক্সিস) বলে থাকেন। যখন আমরা বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ-ভিত্তিক খাবার খাই, তখন আমাদের অন্ত্রের অণুজীবগুলো এমন কিছু যৌগ নিঃসরণ করে যেগুলোর প্রদাহ-বিরোধী এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
হ্যাকম্যান বলেন, এগুলো আমাদের ত্বককেও প্রভাবিত করে। একটি স্বাস্থ্যকর অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে ত্বকের অবস্থারও উন্নতি করতে পারে। এই উপকারিতাগুলো পাওয়ার একটি উপায় হলো বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ-ভিত্তিক খাবার খাওয়া। এর মধ্যে রয়েছে ফল ও শাকসবজি, ডাল, শস্য, গোটা শস্য, ভেষজ এবং মশলা। এটি মানসিক চাপ কমাতে, ঘুমের উন্নতি ঘটাতে এবং সোরিয়াসিসের মতো চর্মরোগ থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে, যার কারণে ত্বকে শুষ্ক ও আঁশযুক্ত চুলকানিসহ এবং বেদনাদায়ক ছোপ দেখা দেয়। গাঁজানো খাবার, যেমন সাওয়ারক্রাউট, কিমচি, কম্বুচা বা দই, আমাদের অন্ত্রের অণুজীবদের পুষ্টি জোগানোর জন্য বিশেষভাবে উপকারী। আপনি হয়তো চিরকাল ৩০ বছর বয়সী থাকবেন না, কিন্তু স্বাস্থ্যকর খাবার খেলে আগামী বছরগুলোতে আপনার ত্বক সুস্থ থাকার সেরা সুযোগ পাবে। এবং আরেকটি বিষয়, সানস্ক্রিন ব্যবহার করাও জরুরি।


পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য সরাসরি প্রকাশিত হবে। অনুপযুক্ত মন্তব্য প্রশাসক সরিয়ে দিতে পারেন। ব্যক্তিগত বা গোপন তথ্য লিখবেন না।
এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মন্তব্যটি লিখুন।
মন্তব্য লিখুন