বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান বাইন্যান্স জানিয়েছে, বৃহস্পতিবারের হ্যাকিংয়ের ঘটনায় চুরি হওয়া ৬৩০ কোটি ডলারের সম্পদের ৯০ শতাংশ ক্ষতি পুনরুদ্ধার করেছে। তবে বাকি ১০ শতাংশ সংগ্রহ করতে আরও সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ক্রিপ্টোকারেন্সির ইতিহাসে এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় হ্যাকিংয়ের ঘটনা বলে ধারণা করা হচ্ছে এটিকে। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের শতভাগ অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে বাইন্যান্স। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব তহবিল থেকে ৬৩৪ কোটি ডলারের বেশি অর্থ বরাদ্দ রাখার কথা জানিয়েছে।
"চুরি হওয়া সম্পদের আর্থিক ক্ষতির দায় বাইন্যান্স বহন করবে, আমাদের ব্যবহারকারীরা নয়," শনিবার এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই শনিবার জানিয়েছে, এই হ্যাকিংয়ের জন্য উত্তর কোরিয়া দায়ী। এর আগে দুটি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান বিবিসিকে জানিয়েছিল, উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হ্যাকার গোষ্ঠী লাজারাস গ্রুপ, যারা ট্রেডারট্রেইটার নামেও পরিচিত, এই হামলার সঙ্গে জড়িত বলে তাদের কাছে জোরালো গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে।
এফবিআইও তাদের বিবৃতিতে এই গোষ্ঠীর নাম উল্লেখ করেছে। বাইন্যান্স জানিয়েছে, বিভিন্ন তহবিল এবং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কোষাগার থেকে অর্থ ব্যবহার করে চুরি হওয়া সম্পদের ঘাটতি পূরণ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, বিটকয়েন, ইথেরিয়াম ও টেথারসহ আরও সাতটি বহুল লেনদেন হওয়া ক্রিপ্টোকারেন্সির সব সম্পদই এই ক্ষতিপূরণের আওতায় রয়েছে। ব্যবহারকারীদের জন্য অর্থ উত্তোলন সেবা পুনরায় চালু করাই এখন প্রতিষ্ঠানটির পরবর্তী লক্ষ্য। আগামী ১লা নভেম্বরের মধ্যে এই সেবা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে বাইন্যান্স। বিস্তারিত নিশ্চিত হলে এ বিষয়ে আরও তথ্য জানানো হবে বলে জানিয়েছে তারা। ধারণা করা হচ্ছে, এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হ্যাকিংয়ের ঘটনা। এর আগে ২০২৫ সালে বাইবিট এক্সচেঞ্জ থেকে ১৫০ কোটি ডলারের সম্পদ চুরির ঘটনাটি ছিল এযাবতকালের সবচেয়ে বড়। ওই ঘটনার জন্যও উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করেছিল এফবিআই।
তবে এসব সাইবার হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে উত্তর কোরিয়া। বাইন্যান্সের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হয়েছিল, প্রতিষ্ঠানের একজন প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক হওয়ার মাধ্যমে অননুমোদিতভাবে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ তৈরি হয়। বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন। তবে পরবর্তী এক হালনাগাদ তথ্যে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তারা নিরাপত্তা ব্যবস্থায় 'অনুপ্রবেশের আরও কিছু পথ' শনাক্ত করেছে।
বাইন্যান্সের সহ-প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিচার্ড টেং বলেন, একাধিক ব্যক্তি মিলে এই হ্যাকিং চালিয়েছে। নিজেদের পরিচয় ও কর্মকাণ্ডের চিহ্ন আড়াল করতে হ্যাকাররা 'সেলফ-ডেস্ট্রাক্ট মেকানিজম' বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য মুছে ফেলার ব্যবস্থাসহ অত্যাধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। শুক্রবার বাইন্যান্স জানায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে একযোগে কাজ করে চুরি হওয়া প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, এ ঘটনার তদন্ত এখনো চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিস শুক্রবার বলেছে, বাইন্যান্স থেকে চুরি হওয়া অর্থ শনাক্ত, জব্দ, লেনদেনের গতিপথ অনুসরণ এবং উদ্ধারের জন্য তারা বেসরকারি খাতের অংশীদারদের সঙ্গে 'দিনরাত কাজ করছে'। ২০১৭ সালে চীনে প্রতিষ্ঠিত বাইন্যান্স ব্যবহারকারীদের ডিজিটাল সম্পদ কেনাবেচা ও লেনদেনের সুযোগ দেয়। বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠানটির কয়েক শ কোটি ব্যবহারকারী রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ক্রিপ্টোকারেন্সি একধরনের ডিজিটাল সম্পদ, যার কোনো বাস্তব বা ভৌত অস্তিত্ব নেই। ডিজিটাল ওয়ালেট কিংবা কম্পিউটারের মাধ্যমে এসব সম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা হয়।
শুক্রবার বাইন্যান্স হ্যাকের ঘটনা ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। নিউইয়র্কে শুক্রবার বিকেলে লেনদেনের সময় বিটকয়েনের দাম পাঁচ শতাংশ কমে ৭৬,৮০০ ডলারে নেমে আসে। ২০১৭ সালে চীনে প্রতিষ্ঠিত বাইন্যান্স ব্যবহারকারীদের ডিজিটাল সম্পদ লেনদেন করার সুযোগ দেয় এবং বিশ্বজুড়ে এর ৩০০ মিলিয়নেরও বেশি নিবন্ধিত ব্যবহারকারী রয়েছে বলে অনুমান করা হয়। কোম্পানিটি ২০২৪ সালে জানায় যে, তাদের তত্ত্বাবধানে ১৬০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের সম্পদ রয়েছে।


পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য সরাসরি প্রকাশিত হবে। অনুপযুক্ত মন্তব্য প্রশাসক সরিয়ে দিতে পারেন। ব্যক্তিগত বা গোপন তথ্য লিখবেন না।
এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মন্তব্যটি লিখুন।
মন্তব্য লিখুন