টোকিওতে ভাড়া করা অ্যাপার্টমেন্টে প্রথমবার পা রাখার মুহূর্ত থেকেই রিউয়া বিশ্বাস করতেন যে, জায়গাটা ভুতুড়ে। "আমি যখন জায়গাটা দেখতে গিয়েছিলাম, তখন সেখানে একজন লোক দাঁড়িয়ে আমার দিকে কটমট করে তাকাচ্ছিল," তিনি বলেন। "যেহেতু এস্টেট এজেন্ট তাকে দেখতে পাচ্ছিল না, আমি বুঝতে পারলাম সে নিশ্চয়ই একটা ভূত"। যেখানে আরও বেশি স্পর্শকাতর কেউ হয়তো দ্রুত ফ্ল্যাটটি ছেড়ে চলে যেত এবং আর কখনও ফিরত না, সেখানে রিউয়া এগিয়ে গিয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। "আমি একটু ভিন্নমতাবলম্বী। তাই আমি এই জ্বলজ্বলে পুরুষ ভূতটার সাথে বন্ধুত্ব করার সিদ্ধান্ত নিলাম," যোগ করেন রিউয়া, যিনি একজন আইডোরু বা তরুণ বিনোদনকারী হিসেবে কাজ করেন এবং নিজের নামের সঙ্গে থাকা পদবিটি প্রকাশ করতে চান না।
চার বছর পরেও, সেই একই অ্যাপার্টমেন্টে থেকেও তিনি বলেন যে তিনি প্রতিদিন অলৌকিক কার্যকলাপের সম্মুখীন হন। তিনি জানান, তিনি অবিরাম পা ফেলার শব্দ এবং ভূতের কথা শুনতে পান। বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় জাপানে হ্যালোইন উৎসবের প্রচলন বেড়েছে, বহু জাপানি সারা বছর ধরেই ভূতকে গুরুত্বের সঙ্গে নেন। দেশটিতে 'ইউরেই' নামে একটি শব্দ আছে, যার অর্থ দীর্ঘস্থায়ী ও অশান্ত আত্মা। এরা সেইসব মানুষের প্রেতাত্মা যারা সহিংস বা মর্মান্তিক পরিস্থিতিতে মারা গেছেন - যারা খুন হয়েছেন, আত্মহত্যা করেছেন, অথবা কেবল নিঃসঙ্গ ছিলেন এবং একাকী মারা গেছেন।
যদি তারা বাড়িতে মারা যান, তবে এমন বিশ্বাস প্রচলিত আছে যে তাদের প্রেতাত্মা কখনও দূর হয় না। যেসব ক্রেতা এধরনের বাড়ি নিয়ে কুসংস্কারাচ্ছন্ন বা স্পর্শকাতর নন, তাদের জন্য এর অর্থ হলো বড় ধরনের সওদা খুঁজে পাওয়ার সুযোগ। জিকো বুক্কেন নামে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন শ্রেণীর বাসস্থান রয়েছে, যার অর্থ 'কলঙ্কিত' বা 'ঘটনাপূর্ণ' সম্পত্তি। ২০২১ সালে সরকার কর্তৃক জারি করা নির্দেশিকা অনুসারে, জাপানি রিয়েল এস্টেট এজেন্টদের আত্মহত্যা, খুন, আগুনে পুড়ে মৃত্যু এবং দীর্ঘ সময় ধরে মৃতদেহ খুঁজে না পাওয়া যেকোনো মৃত্যুর ঘটনা প্রকাশ করতে হবে।
ভাড়া দেওয়া সম্পত্তির ক্ষেত্রে এই তথ্য তিন বছরের জন্য প্রকাশ করতে হবে এবং বিক্রয়ের জন্য প্রস্তাবিত যেকোনো সম্পত্তির ক্ষেত্রে তা অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রকাশ করতে হবে। এর বিপরীতে, যুক্তরাজ্যে কোনো সম্পত্তিতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে কি না তা প্রকাশ করার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। আর যুক্তরাষ্ট্রে, এটি রাজ্যভেদে ভিন্ন হয়। উদাহরণস্বরূপ, ক্যালিফোর্নিয়ায় গত তিন বছরে কোনো সম্পত্তিতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হয়ে থাকলে তা প্রকাশ করতে হয়, কিন্তু অ্যারিজোনা এবং ওরেগনে তা করতে হয় না। রিউয়াকে জানানো হয়েছিল যে তার অ্যাপার্টমেন্টে একজন লোক আত্মহত্যা করেছে। এর ফলে, সেতাগায়ার অভিজাত এলাকায় তার ২৫ বর্গমিটারের ছোট্ট বেডসিটটির ভাড়ায় তিনি প্রায় ৩০ শতাংশ ছাড় পান।
তিনি জানান, যেখানে মাসিক ভাড়া ৬২ হাজার ইয়েন হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন তিনি ৪৫ হাজার ইয়েন (২৮৫ ডলার বা ২১৩ পাউন্ড) দেন। যদিও বিশ্বের যেকোনো জায়গাতেই খুন বা আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে এমন বাড়ি বিক্রি করা বা ভাড়া দেওয়া সম্ভবত কঠিন, তবে টোকিওর এস্টেট এজেন্ট এরিক ওসক্যাম্প বলেন যে, জাপানিরা কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং কলঙ্কিত সম্পত্তির প্রতি বিশেষভাবে বিমুখ। "(এমনকি) কবরস্থানের পাশের একটি অ্যাপার্টমেন্টও ভাড়া দেওয়া কঠিন হবে, বিশেষ করে যদি রান্নাঘর থেকে কবরগুলো দেখা যায়," ওসকাম্প ব্যাখ্যা করেন। "সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার হলো যদি অ্যাপার্টমেন্টে কোনো আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে থাকে। এমনকি কেউ ছাদ থেকে ঝাঁপ দিলেও অনেক ভাড়াটে বাসা ছেড়ে চলে যাবেন।
অন্যান্য সমস্যার মধ্যে রয়েছে, কোনো গুরুতর অপরাধ বা নিঃসঙ্গ মৃত্যু।" শেষোক্ত বিষয়টি, অর্থাৎ কোনো ব্যক্তির একা মারা যাওয়া, সাধারণত যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে সম্পত্তির দামকে প্রভাবিত করবে না। কিন্তু জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গ্রামাঞ্চল কাগেশিমায়, এর ফলেই প্রায় অর্ধেক দামে একটি বড় তিন-বেডরুমের বাড়ি কিনতে পেরেছিলেন ডায়ান টিঞ্চার, যা অন্যথায় আরো বেশি দাম চাওয়া হতো। ৭৯ বছর বয়সী এই আমেরিকান প্রায় ৪০ বছর ধরে জাপানে বসবাস করছেন এবং একজন ট্যুর গাইড হিসেবে কাজ করেন। তিনি বলেন যে, এস্টেট এজেন্ট তার সঙ্গে সৎ ছিলেন। যেহেতু একজন বয়সী নারী সেখানে একা মারা গিয়েছিলেন, তাই সম্পত্তিটি কলঙ্কিত হয়ে পড়েছিল এবং সেই কারণে এতে একটি বড় ছাড় দেওয়া হয়েছিল।
টিঞ্চার বাড়িটির জন্য দুই কোটি ইয়েন দিয়েছেন, এমন একটি এলাকায় যেখানে একই ধরনের সম্পত্তি সাধারণত সাড়ে চার কোটি ইয়েন পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়। "আমি ভূতে বিশ্বাস করি না। কিন্তু আমি জানি যে জাপানিরা খুব কুসংস্কারাচ্ছন্ন," তিনি বলেন। "যদি সত্যিই কোনো ভূত থাকে, তবে আমি প্রতিদিন তার কাছে কৃতজ্ঞ... এমন চমৎকার ও সাশ্রয়ী একটি বাড়িতে বাস করার জন্য।" বাড়িটি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে টিঞ্চার 'ওশিমাল্যান্ড' নামের একটি ওয়েবসাইটে এটি খুঁজে পেয়েছিলেন, যেখানে জিকো বুক্কেন-এর সম্পত্তিগুলোর তালিকা ও সেখানে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর বিবরণ দেওয়া থাকে। এটি ২০০৫ সালে টোকিওকে কেন্দ্র করে চালু হয়েছিল, এবং পরে ২০১১ সালে জাপানজুড়ে ও তারপর আন্তর্জাতিকভাবে এর বিস্তার ঘটে।
এটি গণ-উৎসভিত্তিক, অর্থাৎ সাধারণ মানুষ এতে বাড়িঘর ও সেগুলোর বিবরণ যুক্ত করেন। ওশিমাল্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা তেরু ওশিমা বলেন যে, অতীতে জাপানে এই ধরনের সম্পত্তি "খুব একটা আকর্ষণীয় বিকল্প ছিল না"। তথাপি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে বাড়ির দাম আকাশচুম্বী হওয়ার পাশাপাশি জীবনযাত্রার সামগ্রিক ব্যয়ও ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায়, ২০২৫ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, অর্ধেকেরও বেশি জাপানি এখন সস্তা হলে একটি জিকো বুক্কেন ভাড়া নিতেও রাজি। সেতাগায়ায় ফিরে এসে রিউয়া জানায়, সে তার ভূতুড়ে ফ্ল্যাটমেটের সঙ্গে সুখেই আছেন তিনি। "আমি বিশ্বাস করি যে ভূতেরাও একসময় জীবিত মানুষ ছিল, তাই তারা আমাদের সম্মান পাওয়ার যোগ্য," বলেন তিনি।


পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য সরাসরি প্রকাশিত হবে। অনুপযুক্ত মন্তব্য প্রশাসক সরিয়ে দিতে পারেন। ব্যক্তিগত বা গোপন তথ্য লিখবেন না।
এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মন্তব্যটি লিখুন।
মন্তব্য লিখুন