অক্টোবর মাসের গোড়ায় ভারতের আসাম থেকে মিথানল নিয়ে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিল৷ কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি না পাওয়ায় জাহাজটি সেদেশে প্রবেশ করতে পারেনি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা৷ ভারতের রাষ্ট্রীয় সংস্থা আসাম পেট্রোকেমিক্যালসের কারখানায় উৎপাদিত মিথানল পরিবহন করছিল জাহাজটি৷ সংস্থার চেয়ারম্যান বিকুল চন্দ্র ডেকা ডিডাব্লিউকে জানিয়েছেন, ‘‘বাংলাদেশের সরকার প্রয়োজনীয় অনুমতি না দেওয়ায় জাহাজটি সেদেশে প্রবেশ করতে পারেনি৷ বিষয়টি নিয়ে ভারত সরকারের হস্তক্ষেপ চাইছে সংস্থাটি৷

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল এবং তার দফতরের সঙ্গে তিনি নিজে যোগাযোগ করেছেন তবে এখনো প্রক্রিয়াটি এগোয়নি এবং জাহাজ আটকে রয়েছে আসামের যোগীঘোপায়৷'' তবে ডেকা আশাবাদী, ‘‘ভারত সরকারের উদ্যোগে জাহাজটি একদিন বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি পাবে৷'' দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রস্তুতি, পুরনো পণ্যবাহী নৌযান মেরামত, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা এবং ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগিতার পর গত ৫ অক্টোবর ডিব্রুগড়ের বগিবিল থেকে ৫৪০ টন মিথানল নিয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল একটি পণ্যবাহী জাহাজ৷

ভারতের বন্দর, জাহাজ ও জলপথ পরিবহণমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল আনুষ্ঠানিকভাবে সেই যাত্রার সূচনা করেছিলেন৷ অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়েছিলেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা৷ আসামের ডিব্রুগড় জেলার নামরূপে উৎপাদিত মিথানল ২০২৪ সাল থেকেই বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে আসাম পেট্রোকেমিক্যালস৷ এত দিন মেঘালয়ের ডাউকি সীমান্ত হয়ে সড়কপথে সেই পণ্য বাংলাদেশে পৌঁছাতো৷ কিন্তু বাংলাদেশের কয়েকটি এলাকায় রাস্তার অবস্থা খারাপ হওয়ায় পণ্য পরিবহণে সমস্যা হচ্ছিল বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের৷ ফলে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে জলপথ ব্যবহারের কথা ভাবতে শুরু করে কোম্পানিটি৷ আসাম পেট্রোকেমিক্যালসের চেয়ারম্যান ডেকা বলেন, ‘‘বাংলাদেশের বাজারে মিথানল সরবরাহের অভিজ্ঞতা থেকেই এই পরিকল্পনা করা হয়েছিল৷

সড়কপথের পরিবর্তে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে পণ্য পাঠানো সম্ভব হলে কম খরচে নিরাপদ পরিবহনে সুবিধা হবে, এমনটাই ভেবেছিলাম আমরা৷ বাংলাদেশে যারা মিথানল কিনছে, তারাও একই কথা বলেছিলেন৷'' এই লক্ষ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় বন্দর ও জাহাজ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়৷ কয়েকটি পণ্যবাহী বার্জ ভাড়ায় নেওয়ার পর সেগুলোকে পরিবহণের উপযোগী করে তোলার কাজ শুরু করেন সংস্থার কারিগরি কর্মীরা৷ ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে মেরামত ও প্রস্তুতির পর সেগুলি ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা হয়৷ একই সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও যোগাযোগ করে এব্যাপারে আলোচনা করে সংস্থাটি৷ জলপথে পণ্য পরিবহণের সম্ভাব্য সুবিধা এবং খরচের বিষয়টি তাদের সামনে তুলে ধরা হয়৷ বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরাই জাহাজ প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি সংগ্রহ করবেন বলে ঠিক হয়েছিল৷ ডেকার বক্তব্য, ‘‘এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলেছিল দু'বছরেরও বেশি সময় ধরে৷

সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পরই ৫ অক্টোবরের যাত্রার আয়োজন করা হয়৷ কিন্তু বাংলাদেশের অনুমতি শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত না হওয়ায় পুরো উদ্যোগই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে৷'' তবে কোন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ঠিক কী ধরনের অনুমতি পাওয়া যায়নি, তার বিস্তারিত তথ্য দেননি ডেকা৷ তিনি বারবার বলেছেন, বাংলাদেশ অনুমতি দেয়নি এবং এ নিয়ে তিনি ভারত সরকারের কাছে সাহায্য চাইছেন ৷

এদিকে বাংলাদেশের প্রশাসন এবং এই জাহাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা হলেও তারা কোনো মন্তব‍্য করতে চাননি৷ ডিডাব্লিউ জানতে পেরেছে, ‘থ্রি আই' নামের একটি হ্যান্ডলিং সংস্থা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল৷ ঐ সংস্থার সূত্র ডিডাব্লিউকে জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রশাসন জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় কাগজ না থাকায় তারা জাহাজটি ঢুকতে দেয়নি৷ সংস্থার সঙ্গে জড়িত এক কর্মকর্তা কাজী গুলশান আরাকে ১১ অক্টোবর রাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ তিনি একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা৷

সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইনে করা মামলায় তাকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ৷ ৫ অক্টোবর বগিবিল ঘাট থেকে ‘ডিবিএল-পাটকাই' নামে জাহাজটি ৫৪০ টন মিথানল নিয়ে বাংলাদেশের পানগাঁও বন্দরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে৷ আসামের নামরূপে সংস্থার কারখানায় উৎপাদিত ওই মিথানল ২৭টি বিশেষ পণ্যবাহী ট্যাংক করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল৷ জাহাজটির সঙ্গে ছিল কুশল কোঁওর নামে একটি সহায়ক টাগ৷ প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল, জাহাজটি প্রথমে ব্রহ্মপুত্রের উপর দিয়ে জাতীয় জলপথ-২ ব্যবহার করে ভারতের অভ্যন্তরে প্রায় ৭৬৮ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছাবে৷ এর পর দুই দেশের নির্ধারিত নৌপথ ব্যবহার করে বাংলাদেশের নদীপথ দিয়ে পানগাঁও বন্দরে যাবে৷ বগিবিল থেকে বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত পুরো জলপথের দূরত্ব প্রায় এক হাজার তিনশ কিলোমিটার৷ এই যাত্রাকে আসামের নদী বাণিজ্যের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছিল৷

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ডিব্রুগড় থেকে কোনও বিদেশি বন্দরের উদ্দেশে এই প্রথম পণ্যবাহী জাহাজ পাঠানো হচ্ছে বলে জানিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার৷ মন্ত্রী সনোয়াল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর বলেছিলেন, এক সময় ব্রহ্মপুত্রের উপর দিয়ে ডিব্রুগড়ের সঙ্গে কলকাতা-সহ বিভিন্ন বাণিজ্যকেন্দ্রের যোগাযোগ ছিল৷ কিন্তু দেশভাগ এবং পরবর্তী সময়ে সড়ক ও রেল পরিবহণের প্রসারের ফলে সেই বাণিজ্যিক গুরুত্ব কমে যায়৷ ৫ অক্টোবরের যাত্রার মাধ্যমে সেই পুরনো নদীবাণিজ্যকে নতুন করে সক্রিয় করার চেষ্টা হয়েছিল৷ অনুষ্ঠানে সর্বানন্দ সোনোয়াল বলেছিলেন, ‘‘নতুন করে যাত্রা শুরু হলো, আরো নিয়মিত পণ্য পরিবহণের ব‍্যবস্থা করা হবে৷'' আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাও জলপথে বাংলাদেশে মিথানল পাঠানোর উদ্যোগকে রাজ্যের রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ বলেছিলেন৷ দুজনেই এই মুহূর্তকে ঐতিহাসিক আখ্যা দিয়ে বহু ছবি সামাজিক মাধ‍্যমে তুলে ধরেছিলেন৷

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে জলপথে পণ্য পরিবহণের জন্য ১৯৭২ সাল থেকেই অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ ও বাণিজ্য সংক্রান্ত একটি চুক্তি রয়েছে৷ এই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের পণ্যবাহী জাহাজ নির্দিষ্ট জলপথ ব্যবহার করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য নিয়ে যেতে পারে৷ নির্ধারিত পথ এবং দুই দেশের স্বীকৃত বন্দর ব্যবহার করে পণ্য ওঠানো ও নামানোর ব্যবস্থাও রয়েছে৷ ভারতের অভ্যন্তরীণ জলপথ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ভারত-বাংলাদেশ নির্ধারিত নৌপথের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় দুই হাজার ৬৬০ কিলোমিটার৷ এর মধ্যে বাংলাদেশের অংশ এক হাজার ৭৯২ কিলোমিটার এবং ভারতের অংশ ৮৬৮ কিলোমিটার৷ এই জলপথ জাতীয় জলপথ-১, জাতীয় জলপথ-২ এবং জাতীয় জলপথ-১৬-কে যুক্ত করেছে৷ ফলে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের অন্য অংশ এবং বাংলাদেশের বন্দরগুলির যোগাযোগের বিকল্প পথ তৈরি হয়েছে৷ এই পথে আগে থেকেই বিভিন্ন ধরনের পণ্য পরিবহণ হচ্ছে৷

কয়লা, চুন, খাদ্যশস্য, পাথর এবং শিল্পজাত পণ্য এই জলপথ ব্যবহার করে দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত করে৷ ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে এই পথে প্রায় ৪৬ দশমিক আট লক্ষ টন পণ্য পরিবহণ হয়েছিল বলে ভারতের অভ্যন্তরীণ জলপথ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে৷ তবে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি থাকলেও প্রতিটি জাহাজের চলাচল স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত হয় না৷ নির্দিষ্ট পথ, জাহাজের নথি, সংশ্লিষ্ট সংস্থার নথিভুক্তি এবং প্রয়োজনীয় বন্দর ও যাত্রার অনুমতি নিতে হয়৷ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাতেও সংস্থার নথিভুক্তি এবং প্রতিটি যাত্রার জন্য পৃথক অনুমতি নেওয়ার নিয়ম রয়েছে৷ আসাম পেট্রোকেমিক্যালসের ক্ষেত্রে ঠিক কোন স্তরে এই প্রক্রিয়া আটকে গিয়েছিল, সেটা এখনও পরিষ্কার নয়৷ বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের উপর অনুমতি সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে চূড়ান্ত ছাড়পত্র পাওয়া গিয়েছিল কি না, সেটি জানা যায়নি৷