ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার বিষয়ে ‘১১০ শতাংশ নিশ্চিত’ বলে দাবি করেছেন সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত। তাঁর বক্তব্যে ভারতের অবস্থান, প্রত্যর্পণ চুক্তি এবং আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্ন উঠে এসেছে। তবে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের নির্দিষ্ট সময়সূচি বা এ বিষয়ে ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নিশ্চিত করার মতো তথ্য ট্রান্সক্রিপ্টে নেই।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা আবারও সামনে এসেছে। ডিসেম্বরে তিনি দেশে ফিরবেন বলে দাবি করেছেন সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত। সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টির একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। একই সঙ্গে ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে কি না, বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত উদ্যোগ এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচন নিয়েও বিভিন্ন দাবি করেন তিনি।
সাক্ষাৎকারে এ আরাফাত শেখ হাসিনার ফেরার বিষয়ে ‘১১০ শতাংশ নিশ্চিত’ বলে মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা নিজেই সিদ্ধান্ত নেবেন কখন, কীভাবে এবং কাদের সঙ্গে দেশে ফিরবেন। এরপর তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন। তবে শেখ হাসিনার ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ, যাত্রাপথ কিংবা এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা সাক্ষাৎকারের বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়নি।
ভারতের অবস্থান নিয়ে এ আরাফাত দাবি করেন, ভারত সরকার শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত দিতে আগ্রহী নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তী বিএনপি সরকার শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার বিষয়ে যে অবস্থান নিয়েছে, তা বাস্তব পদক্ষেপের পরিবর্তে রাজনৈতিক কৌশলও হতে পারে। তিনি আরও দাবি করেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারত বাংলাদেশের অনুরোধে সম্মতি দেয়নি। তবে এসব দাবির পক্ষে ভারত সরকার বা বাংলাদেশ সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি এই সাক্ষাৎকারের ট্রান্সক্রিপ্টে উপস্থাপিত হয়নি।
প্রত্যর্পণ চুক্তি প্রসঙ্গে এ আরাফাত বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা হয়রানির আশঙ্কা থাকলে কোনো দেশ বন্দি হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানাতে পারে। তাঁর দাবি, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে ভারতের নেতিবাচক ধারণা রয়েছে এবং এ কারণেই শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে এটি তাঁর ব্যাখ্যা; ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক আইনি অবস্থান কিংবা সংশ্লিষ্ট চুক্তির প্রয়োগ সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য হিসেবে একে বিবেচনা করা যায় না।
সাক্ষাৎকারে এ আরাফাত আরও দাবি করেন, ভারতের রাজনৈতিক মহল ও জনগণের একটি অংশ শেখ হাসিনাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হিসেবে সম্মান করে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রশ্নে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ভারতের সরকার, বিরোধী দল এবং সাধারণ জনগণের অবস্থানকে এককভাবে ব্যাখ্যা করার মতো কোনো সমীক্ষা বা আনুষ্ঠানিক তথ্য তিনি ট্রান্সক্রিপ্টে তুলে ধরেননি।
শেখ হাসিনার সাংবিধানিক অবস্থান নিয়েও কথা বলেন সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী। তাঁর দাবি, শেখ হাসিনা পদত্যাগপত্র লিখলেও সেটি রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেননি। এ প্রসঙ্গে তিনি সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তবে একই বক্তব্যে তিনি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সেই নির্বাচনে সব পক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়া উচিত এবং জনগণ যে দলকে সমর্থন করবে, সেই ফল মেনে নিতে হবে।
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়েও নিজের ধারণা তুলে ধরেন এ আরাফাত। তাঁর দাবি, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের এককভাবে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে হবে না; বরং বিভিন্ন পেশার অসন্তুষ্ট মানুষও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হতে পারেন। তিনি কারখানা বন্ধ, কর্মসংস্থান এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অসন্তোষের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তবে এসব দাবির পক্ষে কোনো পরিসংখ্যান বা স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য সাক্ষাৎকারের বর্ণনায় দেওয়া হয়নি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়ালের বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এ আরাফাত। তাঁর দাবি, ওই বক্তব্যকে বাংলাদেশের কিছু গণমাধ্যমে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে মনে হয়েছে ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার ফেরার সম্ভাবনা নেই। এ আরাফাত এটিকে বক্তব্য বিকৃত করার প্রচেষ্টা বলে উল্লেখ করেন। তবে জয়সোয়ালের মূল বক্তব্য, তার পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট এবং ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান যাচাই না করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
সাক্ষাৎকারে এ আরাফাত দাবি করেন, ভারত শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনে সহযোগিতা করতে পারে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ এখন নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সমর্থন যাচাই করতে চায়। তাঁর বক্তব্যে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের দাবি পাশাপাশি উঠে এসেছে। তবে ফেরার বিষয়ে তাঁর আত্মবিশ্বাসী বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবসম্মত সময়সূচি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিশ্চিতকরণের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
সব মিলিয়ে, মোহাম্মদ এ আরাফাতের সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন, ভারতের অবস্থান, প্রত্যর্পণ চুক্তি এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দাবি সামনে এসেছে। তবে শেখ হাসিনা সত্যিই ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন কি না, ভারত সরকার এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং প্রত্যর্পণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কী ধরনের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ও নির্ভরযোগ্য নথি যাচাই করা প্রয়োজন।


পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য সরাসরি প্রকাশিত হবে। অনুপযুক্ত মন্তব্য প্রশাসক সরিয়ে দিতে পারেন। ব্যক্তিগত বা গোপন তথ্য লিখবেন না।
এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মন্তব্যটি লিখুন।
মন্তব্য লিখুন