সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের আল খুরাইস এলাকায় গত রোববার হুথিদের নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের আঘাতে মোঃ সজিব হোসেন নামে এক বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ওই দিন রাতেই মি. হোসেনের মৃত্যুর খবর কুমিল্লার কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার শশীদল ইউনিয়নের বাগড়া গ্রামে পরিবারের কাছে পৌঁছায়। এরপর থেকে তার পরিবারে গত দুদিন কান্নার রোল চলছে। এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গতকাল ও আজ দিনভর আত্মীয়স্বজন আর এলাকাবাসী এসে ভিড় করেছেন ওই বাড়িতে। শোক প্রকাশ আর সজিব হোসেনের স্ত্রী, ছোটো কন্যা, মা আর ভাবীকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন তারা। ওই এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মোঃ আল মামুন বলছেন, অল্প বয়সে সজিবের এমন মৃত্যুর খবর তাদের সবাইকে শোকাহত করেছে।
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, সজিবের বাবা ও ভাই সৌদি আরবেই আছেন কিন্তু তারা এখনো জানেন না কবে নাগাদ সজিবের মরদেহ দেশে আনা সম্ভব হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য জানিয়েছে যে, মরদের দেশে পাঠাতে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সারতে সৌদি কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় করছে রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস। প্রসঙ্গত, ইরান সমর্থিত হুথিরা গত কিছুদিন ধরেই সৌদি আরবের আরামকোসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। সোমবার তারা বলেছে, সৌদি আরবের আকাশসীমাও নিরাপদ নয়। ইয়েমেনের সংখ্যালঘু শিয়া মুসলিম জায়েদিদের পক্ষে কথা বলা সশস্ত্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠী হুথি। নব্বইয়ের দশকে জন্ম নেওয়া গোষ্ঠীটির নাম এসেছে তাদের প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন আল-হুথির নাম থেকে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে নিহত বাংলাদেশি নাগরিকের নাম মোঃ সজিব হোসেন বললেও পরিবার বলছে তার নাম সজিব মিয়া। তার বড় ভাই শাকিল মিয়ার স্ত্রী লাভলি আক্তার বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, সজিবরা দুই ভাই ও দুই বোন। ভাইদের মধ্যে ছোটো সজিব মিয়া ২০২৩ সালে এইচ এস সি পরীক্ষার কয়েক মাস পরই সৌদি আরবে যাওয়ার আগে বিয়ে করেছিলেন। সজিব মিয়ার তিন বছর বয়েসি কন্যা সন্তান আছে। "আমার শ্বশুর ও স্বামী দুজনেই সৌদি আরবে। সজিব ২০২৩ সালে ইন্টার পরীক্ষা দেয়ার পর বিয়ে করলো ও তার কয়েক মাস পরেই সৌদি আরবে গেল। সম্প্রতি ৮/৯ মাস আগে বাড়ি ঘুরে গিয়েছিল সে। এখন তো সব শেষ হয়ে গেল," কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন তিনি।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে যেই এলাকায় সজিবদের বাড়ি ওই এলাকাটি প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, ওই এলাকার বহু মানুষ সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নানা কাজে নিয়োজিত আছেন। সজিব মিয়ার মা নয়না আখতার বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, তার স্বামী প্রায় দুই দশক আগে কাজের সন্ধানে সৌদি আরব গিয়েছিলেন আর সজিবের বড় ভাই শাকিল মিয়া গেছে প্রায় দুই বছর আগে। কুমিল্লায় তাদের পরিবারে দুই ভাইয়ের মা ও স্ত্রীসহ অন্য স্বজনরা বসবাস করেন। সজিব মিয়ার দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন লাভলি আক্তার বলছেন, সজিব মিয়ার তিন বছর বয়সী কন্যা বুঝতেই পারছে না তার জীবনে কী ঘটে গেছে।
''এই কিছুদিন আগে এসে গেল। একটা ছোট্ট মেয়ে রেখে গেল। কি যে হয়ে গেল," ফোনে বলছিলেন তিনি। তিনি জানান, রবিবার রাতেই খবরটা বাড়িতে আসে। "আমি বাড়িতে ছিলাম না। সজিবের স্ত্রীই আমাকে জানায়। পরে সবাই ছুটে আসে। আমার শ্বশুর ও স্বামীর সাথেও কথা হয়েছে তারা দেখতে গিয়েছিলেন হাসপাতালে"। পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কিছুদিন আগেও বাবা ও বড় ভাইয়ের সাথে এক জায়গাতেই ছিলেন সজিব। অল্প কিছুদিন হলো ভিন্ন কাজ নিয়ে তিনি আল খুরাইস এলাকায় চলে গিয়েছিলেন। সেখানেই সৌদি আরবের বৃহত্তম তেল কোম্পানি আরামকোর একটি স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা হয়। ওই হামলাতেই মারা যান সজিব মিয়া।
তবে তিনি আরামকোতেই কাজ করতেন নাকি ওই এলাকায় অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন এবং কি ধরনের কাজ করতেন তা এখনো নিশ্চিত নয়। ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য আল মামুন বলছেন, সৌদি আরবের নিয়ম অনুযায়ী সজিবের মৃতদেহ সেখানকার হাসপাতালে রাখা হয়েছে বলে পরিবার থেকে তারা তথ্য পেয়েছেন। তার বাবা ও ভাই গিয়ে দেখে এসেছেন। তবে যেহেতু মরদেহ আনার একটা প্রক্রিয়া আছে সেটার জন্য হয়তো অপেক্ষা করতে হবে। ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার জানিয়েছে, গত ৪ঠা অক্টোবর সৌদির আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের আল খুরাইস এলাকায় আরামকোর একটি স্থাপনায় হুথিদের নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের আঘাতে বাংলাদেশি নাগরিক মোঃ সজিব হোসেন মৃত্যুবরণ করেছেন। নিহত সজিব হোসেন কুমিল্লা জেলার অধিবাসী ছিলেন।
"সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাস ইতোমধ্যেই মৃতের পরিবারের সদস্য ও নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং প্রয়োজনীয় সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করছে। তাঁর মরদেহের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্নকরণ ও দেশে পাঠানোর বিষয়ে দূতাবাস সংশ্লিষ্ট সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করছ," ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে। প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হুথিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকবার হামলা চালিয়েছে। তারা আরও দাবি করেছে, ইয়েমেনে একটি সৌদি যুদ্ধবিমানও তারা ভূপাতিত করেছে। গত মাসেই ওই হামলার পর হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া আল-সারিয়া অনলাইনে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছেন, তারা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর কিছু স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করেছে।
সবশেষ হুথিরা সতর্ক করে বলেছে, বেসামরিক বিমান চলাচলের জন্য সৌদি আরবের আকাশসীমা মোটেও নিরাপদ নয়। যেকোনো মুহূর্তে সেখানে হামলা হতে পারে বলে সোমবার হুঁশিয়ার করেছে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীটি। এমন একটি সময় তারা এই সতর্কবার্তা উচ্চারণ করলো, যখন ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে জোটবেঁধে হুথিদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান শুরু করেছে সৌদি আরব। অভিযানের দ্বিতীয়দিনে বাব আল-মান্দেব প্রণালির পাশাপাশি ধু বাব বিমানবন্দরেরও নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছে ইয়েমেনের সেনারা। বর্তমানে তারা রাজধানী সানা দখলের জন্য অগ্রসর হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, সৌদি সেনাদের পাঠানো একটি দূরপাল্লার ড্রোন ভূপাতিত করার দাবিও করেছে হুথিরা। সেই সঙ্গে, সৌদি আরবে পাল্টা হামলার পরিকল্পনাও করছে বলে জানিয়েছে গোষ্ঠীটি।


পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য সরাসরি প্রকাশিত হবে। অনুপযুক্ত মন্তব্য প্রশাসক সরিয়ে দিতে পারেন। ব্যক্তিগত বা গোপন তথ্য লিখবেন না।
এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মন্তব্যটি লিখুন।
মন্তব্য লিখুন