রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানকে তাৎক্ষণিকভাবে অব্যাহতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন৷ একই সঙ্গে হামলার ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে (বৃহস্পতিবার) প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে৷ তদন্তে দোষী হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের প্রাথমিকভাবে বহিষ্কার এবং তাদের নাম উল্লেখ করে মামলায় চার্জশিট দাখিল করা হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন৷ এ ছাড়া ঘটনার পেছনে ইন্ধন ও উসকানিদাতাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে৷ গতকাল সোমবার রাত ১১টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা৷ বিক্ষোভকারীদের ছয় দফা দাবি নিয়ে দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আলোচনা হয়৷

পরে দিবাগত রাত সোয়া ১টার দিকে উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম প্রশাসনের সিদ্ধান্তগুলো জানান৷ উপাচার্য বলেন, ‘‘আমরা ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তদন্তের রিপোর্ট পাবো, এটাই আশা৷ এরপর প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী যে শাস্তির বিধান আছে, তা নিশ্চিত করা হবে৷ এরপর পরবর্তী তদন্তের জন্য সিন্ডিকেট সভা ডেকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে৷ আমরা যে সিদ্ধান্ত নেবো, সেটার ওপর আস্থা রাখুন৷'' এর আগে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের করা মামলায় কারো নাম উল্লেখ না করে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করার প্রতিবাদে প্রশাসন ভবনের সামনে অবস্থান নেন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীরা৷

একপর্যায়ে তারা উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলামসহ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রায় ৪৫ মিনিট অবরুদ্ধ করে রাখেন৷ পরে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় বসেন শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের প্রতিনিধিরা৷ বিক্ষোভকারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে উপাচার্য জানান, আগামী তিন দিনের মধ্যে হামলার ঘটনা তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়া হবে৷ তদন্তে যারা দোষী সাব্যস্ত হবেন, তাদের সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হবে৷ এরপর সিন্ডিকেটে প্রয়োজনীয় কমিটি গঠন এবং ১৫ দিনের মধ্যে জরুরি সভা আহ্বান করে তাঁদের স্থায়ী বহিষ্কারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে৷ উপাচার্য আরো বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে যাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রত্ব নেই, তাদের সনদ বাতিল এবং ক্যাম্পাসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে৷

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে যাদের দোষী হিসেবে চিহ্নিত করা হবে, তাদের নাম উল্লেখ করে মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে চার্জশিট দাখিল করা হবে৷ ঘটনার পেছনে যারা ইন্ধন ও উসকানি দিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান উপাচার্য৷ তিনি বলেন, ‘‘এ ঘটনার পেছনে দোষী কেউ-ই ছাড় পাবে না৷ শুধু যে চিহ্নিত তা নয়, ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে যারা ঘটনাকে এত দূর এনেছেন, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে৷'' প্রশাসন ভবনে কথায়–কথায় তালা দেওয়ার বিষয়টিও তদন্ত সাপেক্ষে বিচার করার ঘোষণা দেন উপাচার্য৷ প্রশাসনের সিদ্ধান্তের পর আন্দোলনরত শিক্ষার্থী শাহ পরান বলেন, ‘‘আমাদের দাবির একটি অংশ প্রশাসন মেনে নিয়েছে৷ একই সঙ্গে বাকি দাবিগুলো মেনে নেওয়ার রোডম্যাপ তারা দিয়েছে৷ প্রশাসন ঠিকভাবে কাজ করলে আমরা সহযোগিতা করবো৷

তবে কোনো গাফিলতি পেলে আমরা পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবো৷'' এদিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা না দেওয়া পর্যন্ত ক্যাম্পাসে কর্মরত তিনটি সাংবাদিক সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সব ধরনের কর্মসূচি বয়কটের ঘোষণা দিয়েছে৷ সাংবাদিক দের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসন দৃশ্যমান ও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত এ বয়কট চলবে৷ একই সঙ্গে প্রশাসনের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করা হবে৷ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি মীর কাদির বলেন, ‘‘আমাদের দাবির বিষয়ে প্রশাসন কিছু সিদ্ধান্ত জানিয়েছে৷ তবে আমাদের বেশ কিছু দাবি মেনে নিতে প্রশাসন সময় চেয়েছে৷

আমরা তদন্ত প্রতিবেদন জমা হওয়া পর্যন্ত প্রশাসনের কোনো সংবাদ কভার করবো না৷'' এর আগে গত ৪ অক্টোবর রোববার রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে শাখা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়৷ হামলায় চার সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হন৷ আহত চার সাংবাদিক হলেন আগামীর সময়ের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলাম, দ্য ডেইলি স্টারের নূর আহসান মৃদুল, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আরিফ উজ্জামান কোরবান ও দৈনিক সমকালের মাঈনুল ইসলাম রাজু৷ আহত সাংবাদিকদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়৷ এ ঘটনায় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের ৩ নেতাকে সাংগঠনিক পদ থেকে বহিষ্কার এবং ৬ নেতাকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়৷ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি গঠন করে৷

তিন কার্যদিবসের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়৷ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা র ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা৷ তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে ছাত্র নামধারী সন্ত্রাসীরা সাংবাদিকদের ওপর হামলা করেছে৷ হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার, বহিষ্কার, ছাত্রত্ব, সনদ বাতিলসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা৷ গতকাল সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ আয়োজিত মানববন্ধনে এ কথা বলেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা৷ সাংবাদিকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে এদিন বিভাগটি ক্লাস বর্জন কর্মসূচিও পালন করে৷ জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর এ রকম কোনো ঘটনার মুখোমুখি হতে হবে - এমনটি আশা করেননি জানিয়ে মানববন্ধনে অধ্যাপক আ-আল মামুন বলেন, ‘‘এই ঘটনায় দুটি পক্ষ ফেসবুকে একে অপরকে মারার হুমকি দিয়ে আসছিল৷

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গত দুই দিনে প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে আছে এবং এই সুযোগে সহিংস ঘটনা ঘটেছে৷ আমাদের দাবি পরিষ্কার, যারা সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে খুব দ্রুত শাস্তির উপযুক্ত প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে৷'' ‘‘শিক্ষকতার তিন দশকে সাংবাদিক দের ওপর কখনো এমন আঘাত দেখিনি'' মন্তব্য করেন অধ্যাপক মশিহুর রহমান বলেন, ‘‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা করে ফৌজদারি আইনের আওতায় শাস্তির ব্যবস্থা করুক৷'' সহযোগী অধ্যাপক কাজী মামুন হায়দার বলেন, ‘‘যে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সংস্কারের কথা বলতে চেয়েছিলাম, তার বদলে আরো ধ্বংস হয়েছে৷ সবশেষ গতকাল এখানে খেয়াল করলে দেখা যাবে, নির্দিষ্ট করে সাংবাদিকদের মারা হয়েছে৷'' এসিবি/ জেডএইচ (প্রথম আলো)