ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়াকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে জানতে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো ওই দুই বাংলাদেশির বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বাংলাদেশের দিক থেকে 'দূতাবাসকে জানানো হয়নি' বলে যে দাবি করা হচ্ছে তা দিয়ে দায় এড়ানোর সুযোগ কতটা আছে? সৌদি আরবে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ বলছেন, মিশনে দায়িত্বপ্রাপ্তরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করবে এর দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে সাবেক কূটনীতিক মাহফুজুর রহমান বলছেন, দূতাবাস বা মিশন এ ধরনের ঘটনা নাও জানতে পারে কারণ অনেক সময় কোনো নাগরিক ভিন দেশে অপরাধে জড়িয়ে আটক হলে নিজ দেশের দূতাবাসের কনস্যুলেট সুবিধা নিতে রাজী হন না বলে স্বাগতিক দেশ সেটি আর জানাতে পারে না।
সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে গত বুধবার দুজন বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানায়। মক্কার একটি মসজিদে তারা অনৈতিক ও অশালীন কাজে লিপ্ত হলে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী তাদের আটক করে বলে ওই খবরে জানানো হয়। খবরটি জানাজানি হলে বৃহস্পতিবার জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট থেকে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে ঘটনার বিস্তারিত জানানোর অনুরোধ করা হয়। সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাসের সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশিদের আটক করে বিচার ও শাস্তি কার্যকরের বিষয়ে কোনো তথ্যই সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ দূতাবাসকে জানায়নি। শনিবার বিকেলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামও দাবি করেন যে, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের আদেশ নিয়ে বাংলাদেশ সরকার এখনো কিছু জানতে পারেনি।
তবে বাংলাদেশ চিঠি দিয়ে তথ্য জানতে চেয়েছে। কিন্তু অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন যে, সৌদি আরবের রিয়াদ ও জেদ্দায় বাংলাদেশের এত বড় মিশন থাকার পরেও জানি না বলে দায় এড়ানোর সুযোগ কতটা আছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড হয় সৌদি আরবে। নানা ধরনের অভিযোগে এই শাস্তি দিয়ে থাকে দেশটির কর্তৃপক্ষ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেও একদিনে সাতজনের শিরশ্ছেদ করে বিশ্ব গণমাধ্যমে সংবাদ হয়েছে দেশটি। কয়েক বছর আগে নিয়োগকর্তাকে খুনের মামলার সৌদি আরবে প্রায় ছয় বছর জেলে থাকার পর বিচারে শিরশ্ছেদের আদেশ হয়েছিল বাংলাদেশের নরসিংদীর ছিদ্দিক মিয়ার। যদিও পরে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের উদ্যোগে তার শাস্তি মওকুফ হলে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে দেশে ফিরে এসেছেন তিনি।
কিন্তু এবার দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর বাংলাদেশ দূতাবাসের দিক থেকে বলা হচ্ছে বিষয়টি তাদের জানাই ছিল না বা তাদের জানানো হয়নি। ওই সময় সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন গোলাম মসিহ। তিনি বলছেন, "সৌদি আরবের বিচার ব্যবস্থা খুবই কঠোর ও নিখুঁত। এখানে হুট করে কিছু হয় না। জানি না বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই"। তিনি বলেন, জেদ্দা ও রিয়াদে বাংলাদেশ মিশনে অনেকে লিগ্যাল এসিস্ট্যান্ট কর্মকর্তা আছেন যাদের কাজই হলো মামলার খোঁজ নেওয়া, কোর্টগুলোতে যাওয়া কিংবা বিভিন্ন জেলে গিয়ে খোঁজখবর করা। "আর এবারের এমন মেজর কেস দূতাবাস জানেনা বললে তো হবে না। অন্তত ২০ জন কর্মকর্তা আছে এগুলো মনিটর করার জন্য। মনিটরটা ঠিক মতো হলে তো দায় এড়ানোর সুযোগ নেই," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
তবে পেশাদার কূটনীতিক হিসেবে বিভিন্ন দেশে দায়িত্ব পালন করা সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান বলছেন, আটক হলেই দূতাবাস বা মিশন জানতে পারবে এমন নিশ্চয়তা নেই। বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন "কারণ কোনো দেশে কেউ অভিযুক্ত হলে বা কোনো কারণে পুলিশি হেফাজতে গেলে তিনি এডাল্ট হলে তার কাছে জানতে চাওয়া হয় তিনি তার দূতাবাসে যোগাযোগ করতে চান কি-না। অনেক সময় অপরাধে জড়িত হলে অনেকে চায় না যে দূতাবাসকে জানানো হোক। সৌদি আরবের এবারের ঘটনায় তেমনটাও হতে পারে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি। অর্থাৎ তার মতে, সাধারণভাবে দূতাবাসকে নাগরিকের বিষয়ে না জানানোর কারণ নেই, তবে সেই নাগরিক নিজে যোগাযোগে অনীহার কথা জানালে সেই দেশের কর্তৃপক্ষ তখন আর দূতাবাসকে জানায় না।
কিন্তু এবারে সৌদি আরবে যে দুজনের মৃত্যুদণ্ডের খবর এসেছে তাদের ক্ষেত্রে কি ঘটেছে সেটি এখনো পরিষ্কার নয়। কারণ তাদের বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল। ফলে সৌদি কর্তৃপক্ষ না জানালেও প্রবাসী বাংলাদেশিসহ নানা সূত্র থেকে বাংলাদেশ দূতাবাসের এ বিষয়ে অবহিত থাকাটাই স্বাভাবিক বলে মনে করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ। প্রবাসী বাংলাদেশিদের একাধিক সূত্রও বলছে, ওই দুজনের বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসময় ধরেই চলছিল এবং আদালতে বাংলাদেশিরাই দোভাষী হিসেবে কাজ করেছেন। মাহফুজুর রহমান বলছেন, এখন সৌদি আরবের ব্যাখ্যা পাওয়া গেলেই কেবল পরিষ্কার হওয়া যাবে যে এই দুজনের ক্ষেত্রে আসলে কী ঘটেছিল। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ শনিবার বলেছেন, "অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি সৌদি আরবের একটি নিজস্ব আইনি কাঠামো আছে।
সেই আইনি কাঠামো অনুযায়ী কেউ যদি গর্হিত অন্যায় কাজ করে তখন অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সেই আইন অনুযায়ী সাজা হয়। সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড আমাদের জন্য বড় শিক্ষা"। তবে গত বুধবার ওই দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি সৌদি কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে বাংলাদেশে তুমুল শোরগোল শুরু হওয়ায় গত বৃহস্পতিবারই এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাস। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, সৌদি আরবে বাংলাদেশ মিশনের শ্রম উইং থেকে যে বার্তা এসেছে মক্কায় একটি মসজিদের ভেতরে 'ব্যভিচারে' লিপ্ত ছিলেন ওই দুই বাংলাদেশি, যা সৌদি আইনে একটি গর্হিত কাজ হিসেবে গণ্য। ওই আইন অনুযায়ী আদালত ব্যবস্থা নিয়েছে, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের সরকার কোনো কিছুই পায়নি।
জেদ্দায় বাংলাদেশ মিশনের কূটনৈতিক সূত্র শুক্রবার বিবিসিকে জানিয়েছিল যে, ওই দুজনের নাগরিকত্বসহ বিস্তারিত তথ্য তারা সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চেয়েছেন। কিন্তু এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে। বিশেষ করে দূতাবাসের ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে। এমন প্রেক্ষাপটে আজ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সৌদি রাষ্ট্রদূতকে ডেকে এনে বৈঠক করেছে। রোববার দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সেখানে ওই মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সূত্রে জানতে পেরেছে বিবিসি বাংলা। এর আগে, মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে সৌদি সরকারের কাছে যে কূটনৈতিক পত্র পাঠিয়েছিল ঢাক তার একটি অনুলিপি রোববারের বৈঠকে সৌদি রাষ্ট্রদূতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বলেও জানা যাচ্ছে। কর্মকর্তারা অবশ্য জানিয়েছেন, আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়াকে ডেকে পাঠানোর এই ঘটনাটি ঠিক 'তলব' নয়, বরং 'তথ্য জানতে বৈঠক'।


পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য সরাসরি প্রকাশিত হবে। অনুপযুক্ত মন্তব্য প্রশাসক সরিয়ে দিতে পারেন। ব্যক্তিগত বা গোপন তথ্য লিখবেন না।
এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মন্তব্যটি লিখুন।
মন্তব্য লিখুন