ভারতের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া বা এসবিআই-এর হাজার হাজার গ্রাহকের তথ্য ডার্ক ওয়েবে ফাঁস হয়েছে। এই তথ্য ফাঁসের ঘটনার তদন্তও শুরু করেছে ব্যাংকটি, স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দেওয়া একটি ফাইলিংয়ে বুধবার তারা এই কথা জানিয়েছে। এসবিআই জানিয়েছে, ডার্ক ওয়েবে ফাঁস হওয়া তথ্যের মধ্যে তিন হাজার ৮৯৭টি রেকর্ডে গ্রাহকের ব্যক্তিগত পরিচয় শনাক্তকারী তথ্য বা পার্সোনালি আইডেন্টিফায়েবল ইনফরমেশন (পিআইআই) পাওয়া গেছে। পিআইআই বলতে নাম, মোবাইল নম্বর, ইমেল, ঠিকানা, আধার নম্বর বা ব্যাংকের সিআইএফ নম্বরের মতো তথ্য বোঝায়। বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জে (বিএসই-তে) জমা দেওয়া একটি ফাইলিংয়ে ব্যাংকটি জানিয়েছে, এই তথ্য প্রকাশ্যে চলে আসায় গ্রাহকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ব্যাংকের আশঙ্কা, এই গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করা হতে পারে।

তবে তারা এটাও জানিয়েছে, এই ঘটনা মোকাবিলা করতে এবং এর প্রভাব সীমিত রাখতে তারা যথাযথ পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। ব্যাংকের দাবি, এই ঘটনার ফলে তাদের ব্যবসায়িক কাজকর্ম, আর্থিক কর্মক্ষমতা বা ব্যবসার ধারাবাহিকতার উপরে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব পড়েনি। ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ কাজকর্ম কোনোরকম বাধা ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে চলছে বলেও জানানো হয়েছে। এসবিআই জানিয়েছে, ডার্ক ওয়েবে থাকা প্রায় তিন লাখ ৭৫ হাজার রেকর্ডের প্রাথমিক তদন্তে তিন হাজার ৮৯৭টি রেকর্ডে ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করার মতো ব্যক্তিগত তথ্য পাওয়া গেছে। ইনস্টাগ্রামে বিবিসি বাংলা ফলো করতে ক্লিক/ট্যাপ করুন এখানে ব্যাংকটি জানিয়েছে, ডার্ক ওয়েবে ফাঁস হওয়া গ্রাহকদের তথ্যের মধ্যে রয়েছে তাদের নাম, লিঙ্গ, নথিভুক্ত মোবাইল নম্বর, জন্মতারিখ, ইমেল আইডি ও বাড়ির ঠিকানা।

এই রেকর্ডগুলোয় ব্যাংকের শাখা এবং গ্রাহকের তথ্যের ফাইল বা কাস্টমার ইনফরমেশন ফাইল (সিআইএফ-এর) সঙ্গে সম্পর্কিত আইডেন্টিফিকেশন নম্বর, লিড আইডি এবং ঋণ ও লিড রেকর্ড সংক্রান্ত রেকর্ডের মেটাডেটাও রয়েছে। এসবিআই জানিয়েছে, ১৬ই অক্টোবর তাদের থ্রেট ইন্টেলিজেন্স পরিষেবা প্রদানকারী, ডিফেন্স সাইবার এজেন্সি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা সিইআরটি-ইন-এর কাছ থেকে ডার্ক ওয়েবে গ্রাহকদের তথ্য থাকার সম্ভাবনা সম্পর্কে সতর্কবার্তা পেয়েছিল তারা।

সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত এই ঘটনা মোকাবিলা করার যথাযথ প্রক্রিয়া তারা চালু করেছে এবং ঘটনাটি তদন্তের জন্য সিইআরটি-ইন স্বীকৃত একটি স্বাধীন সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাকেও নিয়োগ করার কথা বলেছে ব্যাংকটি। গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হওয়া এবং তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অন্য কারও প্রবেশাধিকার পাওয়া, দুটি আলাদা বিষয়। সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, ডার্ক ওয়েবে থাকা তথ্য ব্যবহার করে প্রতারকেরা ব্যাংকের কর্মী পরিচয় দিয়ে গ্রাহকদের ফোন করতে পারে।

কোনো সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে তারা গ্রাহকদের থেকে কোনো গোপন তথ্য জানতে চাইতে পারে। গ্রাহকের নাম, ঠিকানা, ঋণ সংক্রান্ত তথ্য বা মোবাইল নম্বর জানা থাকলে প্রতারকের ফোন অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হতে পারে। গ্রাহকের মনে হতে পারে, ফোনের ওপারে থাকা ব্যক্তি সত্যিই ব্যাংকের একজন কর্মী। তিন হাজার ৮৯৭ জন গ্রাহকের রেকর্ডে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হলেও তার অর্থ এই নয় যে, কেউ ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোয় অবৈধভাবে প্রবেশাধিকার পেয়েছে। স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া এখনো ডার্ক ওয়েবে পাওয়া তথ্যগুলোর সত্যতা এবং সেগুলোর সম্ভাব্য উৎস খতিয়ে দেখছে। ইতোমধ্যেই এসবিআই তথ্য ফাঁসে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের বিষয়টি জানিয়েছে কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠলেও এর স্পষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি।

গ্রাহকদের এই বিষয়ে অন্ধকারে রাখার অভিযোগ তুলেছে ডিজিটাল অধিকার সংগঠন 'ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন' (আইএফএফ)। কংগ্রেস পার্টির রাজ্যসভা সংসদ সদস্য পবন খেরা তার এক্স হ্যান্ডেলে দাবি করেছেন, এসবিআই এখনো সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের কোনো সতর্কবার্তা দেয়নি। তার বক্তব্য, লাখ লাখ গ্রাহকের আর্থিক নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একটি ব্যাংকের তথ্য সুরক্ষা, তথ্য ফাঁস শনাক্ত করা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এমন ব্যর্থতা গ্রহণযোগ্য নয়। গ্রাহকদের কাছে এই ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়া এবং এর জন্য দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছেন তিনি। গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে প্রতারকেরা তাদের কাছ থেকে আরও তথ্য চেয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। এছাড়া, অথেন্টিকেশন, নো ইওর কাস্টমার (কেওয়াইসি) আপডেট বা ঋণের অনুমোদনের অজুহাত দেখিয়ে পাসওয়ার্ড এবং অন্যান্য গোপনীয়, সংবেদনশীল তথ্য চাওয়া হতে পারে।

ঋণ সংক্রান্ত তথ্য হাতে থাকলে প্রতারকেরা কোনো প্রকৃত ঋণের আবেদন বা প্রক্রিয়ার উল্লেখ করে গ্রাহকের বিশ্বাস অর্জন করতে পারে। তার পরে প্রসেসিং ফি বা অন্য কোনো চার্জের নামে টাকা চাইতে পারে তারা। ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে গ্রাহকের পরিচয় নকল করা বা অন্য ধরনের প্রতারণার চেষ্টা করা হতে পারে। গ্রাহকদের সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য হাতে থাকায় অপরাধীরা এমন বার্তা পাঠাতে পারে বা ফোন করতে পারে, যা সাধারণ ভুয়া ফোন বা বার্তার তুলনায় অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়। তবে তথ্য ফাঁস হওয়ার অর্থ এই নয় যে গ্রাহকদের পাসওয়ার্ড, পিন বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রবেশাধিকারও অপরাধীদের হাতে চলে গিয়েছে। গ্রাহকদের কখনও ওটিপি, পিন বা পাসওয়ার্ড অন্য কাউকে জানানো উচিত নয়।

সন্দেহজনক ফোন বা লিংকের ব্যাপারেও সতর্ক থাকা উচিত। এই ধরনের প্রতারণা থেকে বাঁচতে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (আরবিআই) কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছে। সেগুলো হলো: 'বায়োক্যাচ' একটি নামকরা সাইবার নিরাপত্তা এবং আর্থিক প্রতারণা প্রতিরোধকারী প্ল্যাটফর্ম। এটি বিহেভিয়ারাল বায়োমেট্রিক্স প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতারণা শনাক্ত করে। এই প্রযুক্তিতে কীবোর্ডে টাইপ করার গতি, মাউস নাড়ানোর ধরন এবং স্ক্রিনে স্পর্শ করার পদ্ধতির মতো বিষয় বিশ্লেষণ করে প্রতারণা শনাক্ত করা হয়। বায়োক্যাচের দাবি, ভারতে ব্যাংকিং প্রতারণার ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে। সংস্থাটির একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে প্রতারণার নথিভুক্ত ঘটনা তিন গুণ বেড়েছে। তাদের বক্তব্য, প্রতারণার ঘটনা জানাতে দেরি হওয়ায় প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। রিপোর্টিংয়ে বিলম্বের কারণে ভারতে আর্থিক প্রতারণার প্রকৃত মাত্রা বুঝতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।

বায়োক্যাচের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে ডিজিটাল অ্যারেস্ট স্ক্যাম অন্যতম প্রচলিত প্রতারণার ধরন। এই ধরনের প্রতারণায় আনুমানিক দুই হাজার কোটি টাকা বা ২৪ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে। এই প্রতারণাগুলোর ৪০ শতাংশেরও বেশি যোগসূত্র মিয়ানমার, কম্বোডিয়া এবং লাওসের সঙ্গে রয়েছে বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। ভারতীয় ব্যাংকগুলো এখন এমন অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করার উপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, যেগুলো ব্যবহার করা হয় প্রতারণার মাধ্যমে আদায় করা টাকা জমা রাখা বা অন্যত্র পাঠানোর কাজে। এই ধরনের অ্যাকাউন্টকে 'মিউল অ্যাকাউন্ট' বলা হয়। তবে আরবিআই-এর একটি নিয়মের কারণে সন্দেহজনক মিউল অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা ব্যাঙ্ক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে জটিল হয়ে পড়ে। কারণ, এই ধরনের অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তাদের আদালতের নির্দেশের প্রয়োজন হয়।