বাংলাদেশের রাঙামাটি জেলার সাজেকে তৃতীয় দফায় অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ শুরুর প্রথম দিনেই গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। ঘটনা নিয়ে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) ও আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) দিক থেকে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া গেছে। আজ বৃহস্পতিবার সকালে বাঘাইছড়ির গঙারাম এলাকার উজোবাজার এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। অবরোধের কারণে সাজেকে প্রায় তিন হাজার পর্যটক আটকা পড়েন এবং সেনাবাহিনী ও পুলিশের নিরাপত্তায় তাদের খাগড়াছড়িতে ফিরিয়ে আনা হয় বলে একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে আইএসপিআর। তারা বলছে, গুলির ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে রাঙামাটির পুলিশ সুপারের তথ্য অনুযায়ী, অবরোধকারীদের ইটপাটকেলের আঘাতে সেনাবাহিনীর চারজন এবং পুলিশের দুইজন সদস্য আহত হয়েছেন। এদিকে, ইউপিডিএফ বলছে, কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর গোলাগুলির ঘটনার "বিন্দুমাত্র প্রমাণ মেলেনি"।

অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার বিকেলে দেওয়া কর্মসূচিতে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে শনিবার আধাবেলা সড়ক অবরোধের ডাক দিয়েছে 'ছাত্র-জনতা সংগ্রাম পরিষদ' নামক আরেকটি সংগঠন। পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল জনসংহতি সমিতি বা জেএসএসের সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন অংশকে সাজেক থেকে সরিয়ে দেওয়াসহ তিন দফা দাবিতে বৃহস্পতিবার ভোর ছয়টা থেকে তৃতীয় দফায় অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধের ডাক দেয় সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি এবং কার্বারী অ্যাসোসিয়েশন নামক দু'টো স্থানীয় সংগঠন। বুধবার বিকেলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তারা এ সিদ্ধান্ত জানায়। তারা সেই বিজ্ঞপ্তিতে বলেছিল, "বাঘাইহাট ও মাচলং বাজার দুর্গাপূজা উদ্‌যাপন কমিটির অনুরোধে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে গত শুক্রবার থেকে আজ বুধবার পর্যন্ত সড়ক অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছিল। দাবি পূরণ না হওয়ায় পূজা শেষে আগামীকাল থেকে আবারও রাজপথে নামার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে আজকের মধ্যেই পর্যটকদের সাজেক ত্যাগ করার অনুরোধ জানাচ্ছি।" সংগঠন দু'টির ডাকা অবরোধের পর পর্যটকদের জন্য সাজেক বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয় জেলা প্রশাসন। বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন এরপর বুধবার সন্ধ্যায় এক গণবিজ্ঞপ্তিতে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী জানান, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে এবং বৃহস্পতিবার বিকেল চারটার মধ্যে সবাইকে সাজেক ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয় তাতে। স্থানীয় কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী জানান, জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে আজ সকাল থেকে সাজেক ছাড়ছিলেন পর্যটকরা, তবে সাজেক থেকে বের হওয়ার আধা ঘণ্টার মধ্যেই তারা অবরোধকারীদের সামনে পড়েন। এদিন সকাল থেকেই সাজেক সড়কের বিভিন্ন স্থানে টায়ার ও গাছের গুঁড়ি পুড়িয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন অবরোধকারীরা এবং তারা যান চলাচলে বাধা দেন।

আইএসপিআরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এ সময় সেনাবাহিনী ও পুলিশ অবরোধকারীদের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে অবরোধকারীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণ শুরু করে। আইএসপিআর ও পুলিশ বলছে, এই ঘটনার পেছনে ইউপিডিএফ-এর সদস্যরা রয়েছে। যদিও ইউপিডিএফ গোলাগুলির ঘটনা অস্বীকার করেছে। আইএসপিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, আজ সকাল ১০টার দিকে গঙ্গারাম বাজার এলাকায় অবরোধকারীরা পর্যটকবাহী যানবাহনের চলাচল বন্ধ করে দেয়। "এ সময় সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল দল পর্যটকদের নিরাপদে যাতায়াত নিশ্চিত করতে অবরোধকারীদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণ করে। আলোচনা চলাকালে, সকাল পৌনে ১০টার দিকে ইউপিডিএফের প্ররোচনায় অবরোধকারীরা আকস্মিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে।"

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাঠিচার্জের মাধ্যমে অবরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করে এবং পুনরায় পর্যটকবাহী যানবাহনের চলাচলের ব্যবস্থা গ্রহণ করে, বলা হয় বিবৃতিতে। "পরবর্তীতে সকাল ১১টার দিকে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে আনুমানিক ৩০-৪০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। এ সময় সেনাবাহিনীর টহল দল আত্মরক্ষা ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পাল্টা গুলিবর্ষণ করলে সশস্ত্র ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়," জানানো হয় আইএসপিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে। পুরো ঘটনাটি 'পূর্বপরিকল্পিত' ছিল বলেও প্রাথমিক তথ্যের বরাত দিয়ে দাবি করেছে আইএসপিআর। তারা বলছে, ইউপিডিএফের সদস্যরা স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অবরোধে অংশ নিতে বাধ্য করেছেন এবং তাদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। অন্যদিকে, রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ রকিব হোসেন আজ এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, "পর্যটকরা উজোবাজারে এলে সেনাবাহিনী ও পুলিশ অবরোধকারীদের সাথে কথা বলে।

কিন্তু অবরোধকারীরা তখন পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে।" "আমরা গোয়েন্দা তথ্যে পেয়েছি, ইউপিডিএফের সশস্ত্র গোষ্ঠী পর্যটকদের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি করে। পরে সরকারি যানমালের স্বার্থে, পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও পাল্টা গুলি বর্ষণ করে। পর্যটকরা যখন নিরাপদে চলে যায়, তখন আইনৃঙ্খলা রক্ষাকারীর সাথে সশস্ত্র বাহিনীর সাথে থেমে থেমে গোলাগুলি হয়।" বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত এই গোলাগুলি চলতে থাকে বলে জানান তিনি। তবে সাজেকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলির অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইউপিডিএফ। বৃহস্পতিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা বলেন, "আজ কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে নিরাপত্তা বাহিনীর গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে, সেখানকার জনগণের সাথে কথা বলে এমন খবরের সত্যতার বিন্দুমাত্র প্রমাণ মেলেনি।"

সংবাদমাধ্যমে সব খবর প্রচার করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ "মিথ্যা ও বানোয়াট" বলে দাবি করেন তিনি। তার দাবি, "জেএসএস সন্তু গ্রুপের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়ার ন্যায্য দাবিতে সাজেকবাসীর চলমান শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধ কর্মসূচি বানচাল করার অপচেষ্টায় অংশ হিসেবে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নিরীহ অবরোধকারীদের বিভিন্ন দিকে গুলি বর্ষণ করেছে।" বৃহস্পতিবারের সংঘর্ষ ও গোলাগুলির পর সাজেকে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে খাগড়াছড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে সেনাবাহিনী ও পুলিশ। রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ রকিব হোসেন জানিয়েছেন, আজ দুপুর ১টার পর থেকেই সাজেক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক। তবে সাজেক সড়কে অবরোধ প্রত্যাহারের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। পর্যটকদের ভ্রমণ ও অবস্থানের ওপর জেলা প্রশাসনের জারি করা নিষেধাজ্ঞাও বহাল রয়েছে।

এদিকে, শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে নতুন করে আধাবেলা অবরোধের ডাক দেওয়ায় সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে আবারও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এছাড়া, পুলিশ সুপার মুহম্মদ রকিব হোসেন আজ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, "সাজেকে আমাদের অভিযান চলবে"। এদিকে, বাঘাইছড়ি উপজেলার ইউএনও আমেনা মারজান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "সাজেকে প্রায় তিন হাজার পর্যটক আটকা পড়েছিল। পরবর্তীতে সেনাবাহিনী তাদের বের করে নিয়েছে।" গোলাগুলির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "আজ সেনাবাহিনীর সাথে কিছু অস্ত্রধারীর গোলাগুলি হয়েছে"। অস্ত্রধারী কারা, সে বিষয়ে কিছু নিশ্চিতভাবে জানা গেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, "প্রশাসন এ বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছে। সার্বক্ষণিক এ বিষয়টি মনিটরিং করছি।" শনিবারের অবরোধের ডাক প্রসঙ্গে তিনি রাত ৯টার দিকে বলেন, "কিছুক্ষণ আগেই ঘোষণা এসেছে। এটাও আমাদের পর্যবেক্ষণে আছে।"