আইনে বাধা নেই, তা সত্ত্বেও একজন অ্যাথলেট প্রশিক্ষককে শর্টস (হাফপ্যান্টের চেয়ে দৈর্ঘ্যে ছোট) পরার কারণে মেট্রোরেলে যেতে বাধা দেয়া হয়৷ আর প্রাপ্তবয়স্ক তিন নারীকে নেপালে যেতে দেয়া হয়নি শুধু অবিবাহিত হওয়ার কারণে৷ গত রোববার সকালে শরীরচর্চা শেষ করে টি-শার্ট ও শর্টস পরে মেট্রোরেলে উঠতে যান অ্যাথলেট প্রশিক্ষক সাজ্জাদ হাসেন৷ কিন্তু পোশাককে ‘অশালীন' বলে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য তাকে ভেতরে যেতে দেননি৷ টিকিট পাঞ্চ মেশিনের সামনে প্রায় ৪০ মিনিট দাঁড় করিয়ে রাখা হয় তাকে৷ ঘটনার পর নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন সাজ্জাদ হোসেন৷

৫৫ সেকেন্ডের ওই ভিডিওর শুরুতে জাকির নামের এক পুলিশ সদস্যকে হেসে হেসে বলতে শোনা যায়, ‘‘দাঁড়ান একটু চুলটা ঠিক করি৷'' চুল ঠিক করার পরে সাজ্জাদ হোসেন তাকে স্টেশনে ঢুকতে না না দেয়ার কারণ জানতে চাইলে জাকির বলেন, ‘‘আপনাকে বলা হয়েছে আপনি একটু শালীনতার সঙ্গে যান৷ এইটা একেবারে পুরোপুরি শালীনতার মধ্যে পড়ে না৷'' সাজ্জাদ হোসেন প্রশ্ন করেন, ‘‘কোনটা শালীনতা, কোনটা শালীনতা না, সেটি আপনার নিয়মে লেখা আছে?'' জবাবে জাকির নামে পুলিশ সদস্য বলেন, ‘‘এটা দেখা আমার দায়িত্ব৷'' প্রায় ৪০ মিনিট আটকে রাখার পর অবশ্য সাজ্জাদ হোসেনকে হাফপ্যান্ট পরেই যেতে দেয়া হয়৷ ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে মেট্রোরেলের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ডয়চে ভেলের কন্টেন্ট পার্টনার প্রথম আলোকে বলেন, মেট্রোরেলে চলাচলের জন্য কোনো ড্রেস কোড (পোশাক বিধি) নেই৷

এই অপ্রয়োজনীয় হেনস্তা পুলিশ কেন করলো, তা তিনি জানেন না৷ ভুক্তভোগী সাজ্জাদ হোসেন জানান, রোববার সকালে রমনায় প্রশিক্ষণ করানোর পর ফার্মগেটে একটা কাজ কাজ শেষ করে বিজয় সরণি যাওয়ার জন্য ফার্মগেট মেট্রোস্টেশনে গিয়েছিলেন৷ টিকিট কেটে স্টেশনে ঢোকার সময় সেখানে দায়িত্বরত এক পুলিশ সদস্য তাকে ডেকে নেন৷ ধমক দিয়ে ওই পুলিশ সদস্য বলেন, ‘‘ আপনি, এই সব কি ড্রেস পরেন, এই সব অশ্লীল ড্রেস পরে মেট্রোতে ঢোকা যাবে না!'' পুলিশ সদস্যকে সাজ্জাদ হোসেন জানান, তিনি একজন রানিং কোচ এবং প্রশিক্ষণ শেষে মেট্রোরেলে করে পরবর্তী জায়গায় যাচ্ছেন৷ মেট্রোরেলে শর্টস পরে যাওয়া যাবে না—এমন কোনো নিয়ম থাকলে তা দেখাতেও বলেন তিনি৷

সাজ্জাদ হোসেনের ভাষ্য, সেখানে থাকা আরো দুই পুলিশ সদস্যও তখন বলেন, পাবলিক প্লেসে এভাবে যাওয়া যাবে না৷ তাদের মধ্যে একজন তাকে ট্রাউজার পরে আসতে বলেন৷ এভাবে তাকে প্রায় ৪০ মিনিট সেখানে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়৷ সাজ্জাদ হোসেন জানান, মেট্রোরেলের কন্ট্রোল বোর্ডের এক নারী কর্মকর্তাও সেদিন তার পোশাক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন৷ ওই কর্মকর্তা তার ছবি তুলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে যান বলেও জানান তিনি৷ পরে মেট্রোরেলের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে ওই নারী কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেনকে মেট্রোরেলে উঠতে দেন৷ ঘটনার পর ফার্মগেট মেট্রোস্টেশনে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলেও জানান সাজ্জাদ হোসেন৷ তবে লিখিত অভিযোগের কোনো কপি দেওয়া হয়নি তাকে৷

অভিযোগপত্রের ছবি তুলে রাখতে চাইলে সেই সুযোগও দেওয়া হয়নি৷ ‘ পুলিশই নিপীড়কের ভূমিকা নিলে তো ভয়ংকর' এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, ‘‘এমআরটি পুলিশের এমন আচরণ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রকাশ৷ কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে মব তৈরি হলে বা কেউ অন্যায়ভাবে আক্রান্ত হলে পুলিশের দায়িত্ব তাকে উদ্ধার করা৷ কিন্তু সেই পুলিশই যদি নিপীড়কের ভূমিকায় চলে যায়, তাহলে বিষয়টি আরো ভয়ংকর৷'' অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকী আরো বলেন, ‘‘সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত উগ্রতার সঙ্গে যখন পুলিশের পোশাক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার অপব্যবহার যুক্ত হয়, তখন সেটি সামাজিক অবক্ষয়ের আরো ভয়ংকর রূপ নেয়৷

এ জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি৷'' তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে অবিবাহিত হওয়ার কারণে নেপালে যেতে বাধা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে৷ ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পাস্পোর্ট, ভিসা, হোটেল-বুকিং-সহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তাদের নেপালে যেতে দেয়া হয়নি৷ এ বিষয়ে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিলেন তারা৷ তার প্রেক্ষিতে গতকাল মঙ্গলবার বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার কার্যক্রম কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল দিয়েছে হাইকোর্ট৷ একই সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক নারী নাগরিকদের বৈধ বিদেশযাত্রায় শুধু অবিবাহিত হওয়া, অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণ বা অনুরূপ লিঙ্গভিত্তিক বিবেচনায় বাধা না দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথাযথ নির্দেশনা প্রণয়ন ও জারির নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না— এসবও জানতে চেয়েছে আদালত৷

তিন নারীর করা এক রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল মঙ্গলবার রুলসহ আদেশ দেন৷ বিদেশযাত্রায় বাধার প্রেক্ষাপটে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক বরাবরে যে অভিযোগ করা হয়েছিল, তার নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে হাইকোর্টের রুলে৷ উল্লেখ্য, গত ৩০ আগস্ট রিট আবেদনকারীরা বিদেশযাত্রায় বাধা দেয়ার বিষয়ে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক বরাবর ওই অভিযোগটি করেন৷ লিখিত অভিযোগ করেও কোনো ফল না পাওয়ায় ভুক্তভোগী তিন নারী পরে হাইকোর্টে রিট করেন৷ আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ইশরাত হাসান৷ তাকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী তানজিলা রহমান৷

রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আবদুস সামাদ আজাদ৷ রিট আবেদনকারীরা প্রাপ্তবয়স্ক উল্লেখ করে আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, ‘বৈধ পাসপোর্ট, ‘‘ভিসা বা এন্ট্রি পারমিশন ও বিমান টিকিট থাকা সত্ত্বেও তাদের বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়া হয়৷ তাদের (তিন নারী) কাছে জানতে চাওয়া হয় যে তাদের বাসায় জানে কি না, বাসায় ফোন করতে বলে এবং তারা ফোনও করেন৷ এ–ও বলে যে তারা অবিবাহিত এবং নিজেরা–নিজেরা যাচ্ছেন—মূলত এ ধরনের হয়রানি৷ এ ধরনের আচরণ সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদের সমতা ও লিঙ্গবৈষম্যবিরোধী নিশ্চয়তা, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের আইনের আশ্রয় ও ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং ৩৬ অনুচ্ছেদের চলাফেরার স্বাধীনতার প্রশ্ন উত্থাপন করে৷'' এসিবি/ জেডএইচ (প্রথম আলো)