উত্তর আফ্রিকার মুসলিমপ্রধান দেশ মরক্কোর একটি প্রাচীন শহরের নাম 'ফেজ'। পাহাড়ঘেরা শহরটির রাস্তাগুলো এতটাই সরু ও আঁকাবাঁকা যে, সেখান দিয়ে ইঞ্জিনচালিত গাড়ি চলাচল করতে পারে না। ফলে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের জন্য গাধা এবং গরুর গাড়িই বাসিন্দাদের প্রধান ভরসা। পাহাড়িপথ ধরে মূল শহরে প্রবেশ করতেই পরস্পর সংযুক্ত এমন অসংখ্য গলি চোখে পড়ে, যেগুলো দেখে দর্শনার্থীদের মনে হতে পারে যে, তারা একটি গোলকধাঁধার মধ্যে এসে পড়েছেন। কিন্তু শহরের যেকোনো প্রান্তের উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে কেউ যদি কেন্দ্রের দিকে তাকান, তাহলে প্রথমেই যে দৃশ্যটিতে তার চোখ আটকে যাবে, সেটি হচ্ছে- সবুজ রঙের সিরামিক টালি দেওয়া চমৎকার কিছু ছাদ।

এসব ছাদের নিচেই গত সাড়ে এগারোশ' বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে আসছে একটি প্রতিষ্ঠান, যার বর্তমান নাম 'ইউনিভার্সিটি অব আল কারাউইয়্যিন' বা আল কারাউইয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয়। কেউ কেউ এই একে 'আল কারাওইন' এবং 'আল কারাউয়িয়্যিন' নামেও ডেকে থাকেন। ৮৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে বর্তমান বিশ্বের 'প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো ও গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস। 'আল কারাউইয়্যিন' চালু হওয়ার দু'শ বছরেরও বেশি সময় পর ১০৮৮ সালে ইতালিতে 'বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়' কার্যক্রম শুরু করে, যা ইউরোপের সবচেয়ে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃত।

এর বছর আটেকের মাথায় ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। আর ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম হয়েছিল তারও শত বছর পরে, ত্রয়োদশ শতকের শুরুর দিকে। কিন্তু এগুলোর চেয়েও চমকপ্রদ তথ্য হচ্ছে, আল কারাউইয়্যিন নামের প্রচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একজন মুসলিম নারী, যার নাম: ফাতিমা আল-ফিহরি। কে ছিলেন এই ফাতিমা? কেন এবং কীভাবে তিনি সেই নবম শতকে একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলেছিলেন? এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা জানবো, কিন্তু তার আগে আরেকটি একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ইউনেস্কো ও গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস 'আল কারাউইয়্যিন'কে বর্তমানে কার্যক্রম চালু রয়েছে- এমন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে 'সবচেয়ে প্রাচীন' বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

এর অর্থ আল কারাউইয়্যিনের আগেও বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে থাকতে পারে, যেমন: প্রাচীন ভারতের তক্ষশীলা ও নালন্দার কথা জানা যায়, কিন্তু সেগুলো এখন আর চালু নেই। কিন্তু হাজার বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও আল কারাউইয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয় এখনও সারাবিশ্বের শিক্ষার্থীদেরকে আকর্ষণ করে চলেছে। ইতিহাসের বিভিন্ন গ্রন্থে ফাতিমা আল-ফিহরি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। তবে সেসব তথ্যের বেশিরই নেওয়া হয়েছে চতুর্দশ শতাব্দীতে লেখা একটি প্রাচীন ইতিহাস গ্রন্থ থেকে। 'রাওয আল-কিরতাস' নামের ওই বইটি লিখেছেন ইতিহাসবিদ ইবনে আবি জার। এটি মূলত ফেজ শহরের প্রচীন ইতিহাস বিষয়ক একটি গ্রন্থ।

ইতিহাসবিদ ইবনে আবি জারের দেওয়া তথ্যমতে, ফাতিমা আল-ফিহরি'র ছিলেন আরবের সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের উত্তরসূরি। তার পূর্বপুরুষরা পেশায় বণিক ছিলেন। এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন শহরে তাদের যাতায়াত ছিল। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে এক সময় তারা তিউনিসিয়ার কাইরুয়ান শহরে যান এবং সেখানে বসতি গড়ে তোলেন। ওই শহরেই আনুমানিক আটশ' খ্রিস্টাব্দের দিকে জন্ম হয় ফাতিমা আল-ফিহরি'র। তার পুরোনাম ছিল- ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ আল ফিহরি আল কুরাইশিয়া। বাবা মুহাম্মদ আল ফিহরিও ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। দীর্ঘদিন ব্যবসায় মন্দা চলার একপর্যায়ে তিনি আর্থিক সংকটে পড়েন এবং ভাগ্য ফেরানোর আশায় নবম শতাব্দীর প্রথমভাগে মরক্কোয় পাড়ি জমান।

মরক্কো যাওয়ার পর ক্রমেই আর্থিক অবস্থা ফিরতে থাকে মুহাম্মাদ আল ফিহরি'র। পরিবার-পরিজন নিয়ে একপর্যায়ে তিনি ফেজ শহরে থিতু হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফেজ তখন ক্রমেই ওই এলাকার ব্যবসা বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে শুরু করেছে। পরবর্তীতে মুহাম্মদ আল ফিহরি রীতিমত ধনী ব্যবসায়ীতে পরিণত হন। এই ব্যবসায়ী তার ছেলে-মেয়েদের সবাইকে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলেছিলেন। ছোটবেলায় পরিবারের কাছ থেকেই ইসলামি রীতি-নীতির শিক্ষা পান ফাতিমা আল-ফিহরি। পরবর্তীতে তিনি কোরান-হাদিসের পাশাপাশি ফিকাহ বা ইসলামি আইনশাস্ত্রসহ আরো অনেক বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। বড় হওয়ার পর ফেজ শহরেই একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিয়ে হয় ফাতিমার। কিন্তু কয়েক বছর না যেতেই তার জীবনে যেন দুর্যোগ নেমে আসে।

স্বামীকে হারিয়ে অল্প বয়সেই বিধবা হন ফাতিমা। কাছাকাছি সময়ে বাবা এবং ভাইকেও হারান। ফলে উত্তরাধিকারসূত্রে পরিবারের বিপুল সম্পত্তির মালিকানা চলে যায় ফাতিমা আল-ফিহরি এবং তার বোন মারিয়াম আল-ফিহরির নামে। বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন উত্তরাধিকারসূত্রে বিপুল সম্পত্তির মালিকানা পাওয়ার পর ফাতিমা এবং তার বোন মারিয়াম সিদ্ধান্ত নেন যে, সেগুলো তারা কোনো বিলাসিতার উদ্দেশ্যে ব্যয় করবেন না। তারা স্থির করেন, সম্পদ দিয়ে এমন কিছু করবেন যা ইসলাম ও মানবতার কল্যাণে কাজে আসবে। ফেজে তখন মুসলিমদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছিল। তাদের কথা মাথায় রেখে শহরে বড় মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন দুই বোন।

মারিয়াম আল-ফিহরি তার সম্পত্তির বেশিরভাগ অংশ ব্যয় করে বড় একটি মসজিদ নির্মাণ করেন, যেটি 'আল আন্দালুস মসজিদ' নামে পরিচিত। চমৎকার কারুকার্যখচিত ওই মসজিদটির আয়তন এতটাই বিশাল যে, সেখানে একসঙ্গে প্রায় ২০ হাজার মুসল্লি নামাজ পড়তে পারেন। অন্যদিকে, ফাতিমা আল-ফিহরিও তার ভাগের অর্থ-সম্পদ খরচ করে আরেকটি বড় মসজিদ তৈরি করেন। তবে অন্য মসজিদগুলোর তুলনায় সেটি ছিল ব্যতিক্রম। মসজিদ কমপ্লেক্সের নকশায় নামাজ পড়ার জায়গার পাশাপাশি বিশাল একটি ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র বা মাদ্রাসাও রাখেন ফাতিমা। ইতিহাসবিদদের মতে, হিজরি ২৪৫ সালের (৮৫৯ খ্রিস্টাব্দ) পহেলা রমজানে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়।

পরের দুই বছরের মধ্যে মসজিদের মূল ভবন তৈরি হয়ে যায়। তবে মাদ্রাসাসহ পুরো কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে ১২ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত সময় লেগে গিয়েছিল বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে। ইতিহাসবিদ ইবনে আবি জার তার 'রাওয আল-কিরতাস' বইতে উল্লেখ করেছেন যে, ফাতিমা নিজে সার্বক্ষণিকভাবে মসজিদ কমপ্লেক্সের নির্মাণ কাজ তদারকি করতেন। এক্ষেত্রে তিনি এতটাই নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন যে, মসজিদ কমপ্লেক্সের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত টানা রোজা রেখেছিলেন বলেও জানা যায়। নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর ফাতিমা তার জন্মস্থান তিউনিসিয়ার কাইরুয়ান শহরের নামের সঙ্গে মিল রেখে মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্সটির নামকরণ করেন 'আল কারাউইয়্যিন'।

বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায়, ফেজ শহরের যে এলাকায় ফাতিমা ও তার পরিবারের সদস্যরা বসবাস করতেন, সেখানকার বাসিন্দাদের বড় অংশই কাইরুয়ান থেকে এসে সেখানে বসতি গড়ে তুলেছিলেন। সেজন্য ফেজের বাকি অংশের বাসিন্দাদের কাছে এলাকাটি পরিচিত পায় 'কারাউইয়্যিন' নামে, যার অর্থ 'কাইরুয়ান থেকে আসা ব্যক্তিগণ'। সেই ধারাবাহিকতায় মসজিদ কমপ্লেক্সটির নামকরণ করা হয়েছিল 'আল কারাউইয়্যিন'। কমপ্লেক্সটি প্রাচীন ফেজ শহরের একেবারে কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সেখানকার মূল স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে একটি মসজিদ, একটি মাদ্রাসা এবং একটি গ্রন্থাগার। কমপ্লেক্সের একেবারে কেন্দ্রে আল কারাউইয়্যিন মসজিদের অবস্থান।

সেখানে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের জন্যও আলাদা নামাজ পড়ার জায়গা রাখা হয়। মসজিদের দিকে তাকালেই ছাদে একটি বড় মিনার চোখে পড়ে। ওই মিনার থেকে প্রতিদিন নামাজের আগে আজানের শব্দ ভেসে আসে। মসজিদের বাইরের অংশে বেশ বড় একটি খালি আঙিনা দেখা যায়। সেখানে মার্বেল পাথরের তিনটি ফোয়ারা রয়েছে, যা মুসল্লিদের ওযু করার কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। শুরুর দিকে মসজিদটির দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র ১০০ ফুট, যা পরবর্তীতে আরও বড় করা হয়েছে। এটি প্রথমবার সংস্কার করা হয়েছিল ৯৫৬ সালে। কর্ডোবার তৎকালীন শাসক তৃতীয় আব্দুর রহমানের উদ্যোগে তখন মসজিদটি আরও বড় করা হয়।

এতে মসজিদের সামনের খোলা জায়গাটিও আগের জায়গা থেকে পেছনে সরে যায়। আর ওপরের সাদ রঙের মিনারটি স্থানান্তর করে মসজিদের উত্তরপাশের দেয়ালে স্থাপন করা হয়। এরপর দ্বাদশ এবং ষোড়শ শতাব্দীতে আরও দু'বার মসজিদের আকার সম্প্রসারণ করা হয়। এভাবে বাড়তে বাড়তে বর্তমানে মসজিদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৭২ ফুটে দাঁড়িয়েছে, যা এটিকে আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম বৃহত্তম মসজিদে পরিণত করেছে। সেখানে প্রায় ২২ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের ছাদে পাঁচটি গম্বুজ রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান প্রবেশদ্বারটির ওপরে থাকা গম্বুজটি ভেতরের অংশ অত্যন্ত কারুকার্যমণ্ডিত। ভবনের মাঠের দরজা এবং উঁচু দেয়ালেও চমৎকার সব নকশা চোখে পড়ে।

মসজিদের বাইরে আল কারাউইয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক একাডেমিক ভবন এবং ছাত্রাবাস যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। মারিনিড রাজবংশের শাসনামলে ১৩৫৯ সালে গ্রন্থাগারটি সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। এই গ্রন্থাগারে মধ্যযুগের ২০ হাজারেরও বেশি বই রয়েছে, যেগুলো মূলত হাতে লেখা। এর মধ্যে চার হাজারের মতো 'দুর্লভ গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপি' অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা ইসলামী ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে গ্রন্থাগারের সংগ্রহে থাকা উল্লেখযোগ্য পাণ্ডুলিপিগুলোর মধ্যে রয়েছে: ইমাম মালিক ইবনে আনাস রচিত বিখ্যাত হাদিস সংকলন 'আল-মুওয়াত্তা'-র খণ্ডসমূহ, ইবনে ইসহাক রচিত 'আল-সিরাহ আন-নাবাওয়িয়্যাহ' বা ইসলামের নবী মোহাম্মদের জীবনী, ইবনে খালদুনের ঐতিহাসিক গ্রন্থ 'মুকাদ্দিমাহ ' ও 'আল- ইবারে'র মূল পাণ্ডুলিপি।

এছাড়াও লাইব্রেরিটিতে মুসলিমদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কুরআনের একটি প্রচীন পাল্ডুলিপি পাওয়া যায়, যা ১৬০২ সালে সুলতান আহমদ আল মনসুর গ্রন্থাগারটিতে দান করেছিলেন। ২০১২ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে এই লাইব্রেরির সর্বশেষ সংস্কারের সময় ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপিগুলো পুনরুদ্ধারের জন্য একটি অত্যাধুনিক গবেষণাগার নির্মাণ করা হয়। গ্রন্থাগারটিতে ষোড়শ শতাব্দীর একটি ভল্ট রয়েছে, যেখানে একটি দুর্ভেদ্য তামার দরজা আছে। সেই দরজায় চারটি তালা রয়েছে এবং এটি খুলতে চারজন চাবিধারীর প্রয়োজন হয়। 'দুর্লভ গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপিগুলো' ওই নিরাপদ ভল্টে সংরক্ষিত আছে। ফাতিমার হাতে প্রতিষ্ঠিত আল কারাউইয়্যিনকে কেন্দ্র করে ফেজ হয়ে উঠতে থাকে আফ্রিকার ইসলামী শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র।

পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও এখানে জ্ঞানার্জন করতে পারতো। তবে তাদের পড়ার জায়গা ছিল পুরুষদের থেকে আলাদা। এমনকি ফাতিমা নিজেও এখানে অধ্যয়ন করতেন বলে জানা যায়। প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকে মাদ্রাসাটি মূলত ইসলামী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিত। কিন্তু পরবর্তীতে ভাষাবিজ্ঞান, ব্যাকরণ, আইন, গণিত, সঙ্গীত, দর্শন, সুফিবাদ, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যন্ত এর পরিধি বিস্তৃত হয়। শুধু মুসলমান না, মধ্যযুগের অনেক খ্যাতিমান ইহুদি এবং খ্রিস্টান মনীষীও এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বেরিয়েছেন। এর ছাত্রদের মধ্যে একজন ছিলেন পোপ দ্বিতীয় সিলভাস্টার, যিনি এখান থেকে আরবি সংখ্যাপদ্ধতি বিষয়ে ধারণা লাভ করে সেই জ্ঞান ইউরোপে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষকতার সাথে যুক্ত ছিলেন বিখ্যাত মালিকি বিচারপতি ইবনে আল-আরাবি, ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন এবং জ্যোতির্বিদ নূরুদ্দীন আল-বিতরুজি। মরক্কোর ইতিহাসবিদ মোহাম্মদ আল-মানুনি'র মতে, আনুমানিক ১০৪০ থেকে ১১৪৭ সালের মধ্যে মাদ্রাসাটি উচ্চশিক্ষার একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, যেখানে শিক্ষার্থীদেরকে যোগ্যতার ভিত্তিতে সনদ প্রদান করা হতো। বেশিরভাগ বেশিরভাগ ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা একমত হয়েছে যে, আল কারাউইয়্যিনই ছিল বিশ্বের প্রথম ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। ১৯৬৩ সালে একটি রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে একে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করার উদ্যোগ গ্রহণ করে মরক্কো। ১৯৬৫ সালে আল কারাউইয়্যিন নামের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শব্দটি যুক্ত করা হয়।