জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বাদী, তালিকাভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীকে শনিবার কঠোর পুলিশি নিরাপত্তায় পিরোজপুরে দাফন করা হয়। প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার দেয়া এবং তার দাফনের বিষয়ে স্থানীয় জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে৷ ডয়চে ভেলের কন্টেন্ট পার্টনার দ্য ডেইলি স্টারকে গতকাল রোববার পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম মানিক পশারীর দাফনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন ৷ জামায়াত কর্মীদের বিরোধিতা এবং কবর ভরাট করে দেওয়ার পর শনিবার দিবাগত রাত ২টার দিকে পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিথলিয়া গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে মানিক পশারীকে দাফন করা হয়। ডেইলি স্টারকে ওসি মো.
শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘‘মানিক পশারীর দাফন কোনো অসুবিধা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে।'' ডেইলি স্টারের খবর অনুযায়ী, শনিবার দুপুরের দিকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া থেকে মানিক পশারীর মরদেহ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে আনা হয়। মরদেহ সেখানে পৌঁছানোর পর স্থানীয় জামায়াতের নেতা-কর্মীরা জড়ো হন এবং তাকে গার্ড অব অনার দেওয়ার বিরোধিতা করেন। মানিক পশারীকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ' দাবি করে পিরোজপুর পৌর জামায়াতের আমির আবদুর রাজ্জাক শেখ বলেন, ‘‘আমরা মানিককে গার্ড অব অনার দেওয়া এবং তার মরদেহ দাফনের বিরোধিতা করছি।'' পরে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি পিরোজপুর পুলিশ লাইনসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিকেল ৫টার দিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। এর আগে, শনিবার সন্ধ্যায় চিথলিয়া গ্রামে তাকে দাফনের জন্য খনন করা একটি কবর ‘একদল লোক' ভরাট করে দেয়।
মানিক পশারীর বোন হাসিনা বেগম বলেন, ‘‘কবর ভরাটের সময় ওই ব্যক্তিরা বিভিন্ন স্লোগান দেন।'' তবে কবর ভরাটের বিষয়ে জামায়াতের কোনো জ্যেষ্ঠ নেতার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে মানিক পশারীর মরদেহ পারিবারিক গোরস্থানে দাফনের সিদ্ধান্ত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভয়ে স্থানীয়রা কেউ এগিয়ে না আসায় রাতে মানিক পশারীর পরিবারের সদস্যরা কবরটি পুনঃখনন শুরু করেন। পরে পুলিশ প্রশাসনের আশ্বাসে স্থানীয় কয়েকজন এসে কবরটি পুনঃখননের কাজ সম্পন্ন করে দেন।
এরপর রোববার রাত ১টার দিকে পুলিশ মানিক পশারীর মরদেহ তার বাড়িতে নিয়ে যায়। ডেইলি স্টারের খবর অনুযায়ী, প্রায় এক ঘণ্টা পর পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দাদের উপস্থিতিতে পুনরায় খনন করা কবরে তাকে দাফন করা হয়। ২০০৯ সালের ১১ আগস্ট পিরোজপুরের মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নায়েবে আমির সাঈদী সহ চারজনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা করেন মানিক পশারী।
ওই মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট রাতে কারা হেফাজতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মানিক পশারীর বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। প্রাণ বাঁচাতে তিনি বাড়ি ছেড়ে গোপালগঞ্জে আশ্রয় নেন। এর আগে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও তিনি পুলিশি নিরাপত্তায় ছিলেন। এদিকে পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মরদেহ দাফনে জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতা-কর্মীদের বাধা দেওয়া নিয়ে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ ও অ্যাকাউন্টের পোস্টে প্রশ্ন তুলেছেন চিকিৎসক ও তরুণ রাজনীতিক তাসনিম জারা। ফেসবুক পোস্টে তাসনিম জারা লিখেছেন, ‘‘আমাদের সমাজে কেউ মারা গেলে কবর খুঁড়তে কাউকে ডেকে আনতে হয় না। খবর পেয়ে পাড়ার ছেলেরা কোদাল হাতে নিজেরাই চলে আসে।
কেউ বাঁশ কেটে আনে, কেউ চাটাই। মৃত মানুষের দাফনে দেরি করতে নেই, এটা শুনেই বড় হয়েছি।‘‘ ‘‘শনিবার সকাল দশটার দিকে ৮৭ বছর বয়সি একজন বৃদ্ধ মানুষ, মানিক পশারী, মারা গেছেন। সারা দিন তার পরিবারকে মরদেহ নিয়ে উৎকণ্ঠার সাথে অপেক্ষা করতে হয়েছে। স্থানীয় জামায়াতের নেতা-কর্মীরা মিছিল করেছেন, মাইকে আর ফেসবুকে ঘোষণা দিয়েছেন, পিরোজপুরে তাকে দাফন করতে দেওয়া হবে না।'' ‘‘তার জন্য বাড়িতে প্রথমে একটা কবর খোঁড়া হয়েছিল।
মেয়ে সীমু আক্তার স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন, "কিছু মানুষ এসে তা ভরাট করে ফেলে। পরে ফুফুদের নিয়ে আমি নতুন কবর খুঁড়ি।" পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় কবর খুঁড়তে আর কাউকে পাওয়া যায়নি। যে কোদাল পাড়ার ছেলেদের হাতে থাকার কথা, সেদিন তা ছিল মৃত ব্যক্তির মেয়ে আর বোনেদের হাতে।'' ‘‘অবশেষে রাত দুইটার দিকে পুলিশ পাহারায়, মেয়ে আর বোনেদের খোঁড়া সেই কবরে ওনার দাফন হয়েছে।
প্রশাসনের লোকজন ছাড়া পরিবারের বাইরের আর কেউ সেখানে ছিলেন না।'' ‘‘এই বৃদ্ধ মানুষটি একজন সরকারি গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা। পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি সেদিন বলেছেন, মানিক পশারী ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা; তাকে গার্ড অব অনার দিতে দেওয়া হবে না, পিরোজপুরের মাটিতে দাফনও করতে দেওয়া হবে না। দাফনের পর সেই একই নেতা বলেছেন, জামায়াতের নেতারা লাশের রাজনীতি করেন না।'' ‘‘মানিক পশারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কিনা, সেই প্রশ্ন আপনি চাইলে তুলতে পারেন। তোলার জায়গাও আছে। যাচাইয়ের জন্য রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান আছে, আদালত আছে। কিন্তু জামায়াতের নেতা-কর্মীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেই প্রশ্নের মীমাংসা তারা করবেন দাফন করা ঠেকিয়ে দিয়ে, মাইক হাতে নিয়ে।'' ‘‘আমাদের দেশে জানাজার আগে মৃতের ছেলে বা ভাই সবার সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, "আমার আব্বা যদি কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকেন, মাফ করে দেবেন।"
আমরা মাফ করে দিই। কারণ, মৃত্যুর পর মানুষের সব হিসাব-নিকাশ শেষ। যা বাকি থাকে, তার বিচার আল্লাহর হাতে। শনিবার পিরোজপুরে জামায়াতের নেতা-কর্মীরা অন্য পথে হেঁটেছেন। নিজের গ্রামে মানিক পশারীর জানাজাটুকুও হয়নি। গ্রামের মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে মাফ চাওয়ার সুযোগটুকুও পায়নি তার পরিবার।'' ‘‘মানিক পশারীর "দাফন পিরোজপুরে হতে দেয়া হবে না” -এই কথাটা জামায়াতের নেতা-কর্মীরা এমনভাবে বলেন যেন এই মাটির দলিল ওনাদের নামে লেখা। যেন একজন মানুষ নিজের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে শুয়ে থাকবেন কিনা সেই অনুমতিও তাদের কাছ থেকে নিতে হবে। ওনাদেরকে একসময় একই ভাষায় বলা হতো, "জামাত-শিবির রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়।" এটা যে কেমন অন্যায় কথা, সেটা ওনাদের ভালোই জানার কথা।
কিন্তু ক্ষমতা একটু হাতে আসার সাথে সাথেই, বিরোধী দলে থাকতেই, সেটা ভুলে গেছেন।'' ‘‘একাত্তরে জামায়াত দল হিসেবে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। সেই দলের নেতা-কর্মীরা আজ ঠিক করে দিতে চাইছেন কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে ভুয়া, কে রাষ্ট্রীয় সম্মান পাবেন আর কার কবর কোথায় হবে।'' ‘‘নিজেদের নেতাদের ক্ষেত্রে জামায়াত ন্যায় বিচার, মানবাধিকার, ডিউ প্রোসেস আর মানবিক মর্যাদার কথা বলেন, কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে সেটা করতে নারাজ। ভোটের আগে আর বক্তৃতায় ইনসাফের কথা বলেন, কিন্তু একজন মৃত মানুষের সাথে ও তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সাথে এমন আচরণ করেন। বিরোধী দলে থাকতেই নিজের বসতভিটায় কবর দিতে বাধা দিচ্ছেন, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা ওনাদের হাতে গেলে কী করবেন?'' এসিবি/এডিকে (দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, ড. তাসনিম জারার ফেসবুক পোস্ট)


পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য সরাসরি প্রকাশিত হবে। অনুপযুক্ত মন্তব্য প্রশাসক সরিয়ে দিতে পারেন। ব্যক্তিগত বা গোপন তথ্য লিখবেন না।
এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মন্তব্যটি লিখুন।
মন্তব্য লিখুন