হামলা ও দখলের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে দৃশ্যমান কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশের সরকার৷ পাশাপাশি অভিযোগকারী ও সমালোচকদের হয়রানির অভিযোগও উঠেছে৷ আইন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের নীতি কতটা ধারাবাহিক তা নিয়ে প্রশ্ন বিশ্লেষকদের৷ ঢাকায় দখল, চাঁদাবাজি ও হামলার সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় দ্রুত গ্রেপ্তার, দলীয় কমিটি বিলুপ্ত এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেখা গেছে৷ ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদ সদস্যকে পদত্যাগও করতে হয়েছে৷ সরকারের ভাষ্য, রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধই বিবেচ্য এবং আইনের প্রয়োগে কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না৷

কিন্তু একই সময়ে কয়েকটি ঘটনায় অভিযোগকারী কিংবা সরকারের সমালোচনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে৷ হামলার অভিযোগ করার পর কারও ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়া হচ্ছে, তার স্বজনের ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানে অভিযান হচ্ছে৷ আবার প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে মন্তব্যের অভিযোগে আটক এক শিক্ষককে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সসম্মানে ছেড়ে দেওয়া হলেও একই ধরনের আরেক ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ভিডিওতে 'লাইক' দেওয়ার অভিযোগে আরেক শিক্ষক চাকরি হারিয়েছেন৷ ফলে প্রশ্ন উঠছে, সরকার আসলে কী বার্তা দিতে চাইছে?

আইন কি সবার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রয়োগ হচ্ছে? প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন অবশ্য বলছেন, সরকারের অবস্থানে কোনো দ্বৈততা নেই৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘সরকার ব্যক্তিকে না, অপরাধকে বিবেচনা করছে৷ যেকোন ক্ষেত্রে অপরাধী তার কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকুক বা না থাকুক ক্ষমতাসীন দলের সাথে কোনো সম্পৃক্ততা থাকুক বা না থাকুক তার ঊর্ধ্বে উঠে পূর্ণ নির্মোহভাবে অপরাধের ভিত্তিতেই অপরাধীকে শনাক্তকরণার কার্যক্রম চলছে৷ সে অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে৷'' গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে৷

এই ঘটনায় দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়৷ প্রতিষ্ঠানটিতে শুধু দেশি নয়, সুইডেনসহ আরও অনেক দেশের অনুদান ছিল৷ ফলে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে সরকার এক ধরনের চাপের মুখে পড়ে৷ শুরু থেকেই এই ঘটনায় অভিযোগের আঙুল উঠেছিল বিএনপি দলীয় সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির দিকে৷ শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে তিনি সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন৷ যদিও এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি৷

সাম্প্রতিক এই ঘটনার পর বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটি বিলুপ্ত এবং মোট ১৪ জন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে৷ এখন পর্যন্ত ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ৷ এদের মধ্যে ৬ জন বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত৷ সর্বশেষ গ্রেপ্তার করা মো. রফিকুল ইসলাম জিন্নাহ ওরফে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ (২৭) ছাত্রদলের ঢাকা মহানগর পশ্চিম ইউনিটের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক৷ আর সাজ্জাদ হোসেন মিশু মোল্লা (৩৬) জাতীয়তাবাদী সাইবার দলের সহ-সভাপতি৷ তিনি শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা কমিটির সদস্য৷

এদের মধ্যে একজনকে আগেই বহিষ্কার করা হয়েছে৷ বাকি পাঁচজন ওই সমিতির সঙ্গে সম্পৃক্ত৷ রাজধানীর ইসিবি চত্বরের দক্ষিণ মানিকদীতে নিউগিনি প্রপার্টিজ আবাসন প্রকল্পে গুলি করতে করতে অবৈধভাবে প্রবেশ করে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুর, মারধর ও লুটপাটের ঘটনায় পুলিশ এখন পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে৷ হামলায় নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ থাকা সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে (৬৬) সর্বশেষ গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ৷ এই ঘটনার পর বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক কমিটিসহ স্থানীয় কয়েকটি কমিটি বিলুপ্ত করা হয়৷

গ্রেপ্তার ও কমিটি বিলুপ্তিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও সরকারের কিছু পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন৷ সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাবের তথ্য ও লেনদেনের বিবরণ চেয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)৷ গত ৩০ সেপ্টেম্বর পাঠানো ওই ই-মেইল বার্তায় সালমান মুক্তাদিরের নাম উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে তথ্য দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়৷ আবার সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নুর ইসলামের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেড'-এর চারটি ওয়্যারহাউস সিলগালা করেছে যৌথ তদন্ত দল৷

অনুমোদিত সংখ্যার বাইরে গুদাম ব্যবহার এবং সেখানে শুল্কমুক্ত পণ্য মজুত রাখার অভিযোগে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে রাজধানীর গুলশানে অভিযান চালিয়ে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়৷ সরকারের এই পদক্ষেপকে হয়রানিমূলক বলেছেন সালমান মুক্তাদির৷ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও সরকারের বার্তায় বৈপরীত্য সামনে এসেছে৷ কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে শ্রেণিকক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ‘কটূক্তি ও আপত্তিকর' মন্তব্যের অভিযোগে শিক্ষক গোলাম কিবরিয়া লালনকে আটক করে পুলিশ৷ পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে বুধবার এক ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন৷ জানা গেছে, গোলাম কিবরিয়া লালন উপজেলার প্রাগপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বাংলা বিষয়ের শিক্ষক৷

বুধবার বেলা ১১টার দিকে ভেড়ামারা-প্রাগপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের প্রাগপুর এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়৷ প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তি ও আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগে তাকে আটক করা হয় বলে জানিয়েছিলেন দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান৷ তবে ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক আশরাফুজ্জামান বলেছিলেন, তিনি বিষয়টি জানতে পেরে ওই শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন৷ তখন তিনি দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ প্রবাসজীবনে থাকার কারণে বাংলা উচ্চারণে কিছুটা অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে, এমন মন্তব্যই তিনি করেছিলেন৷

ফেসবুক পোস্টে মাহদী আমিন লেখেন, শিক্ষককে আটকের বিষয়টি জানতে পেরে প্রধানমন্ত্রী সংক্ষুব্ধ হন এবং সংশ্লিষ্ট থানাকে নির্দেশ দেন শিক্ষককে সসম্মানে ছেড়ে দিয়ে নিরাপদে তার বাসায় পৌঁছে দিতে৷ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পরে পুলিশ তাকে নিরাপদে বাসায় পৌঁছে দেয়৷ তিনি লিখেছেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে, প্রত্যেক মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামত তাঁর নিজস্ব৷ কারও মতের সঙ্গে একমত না হলেও তাঁর মতপ্রকাশের অধিকারকে সম্মান করা উচিত৷ ভিন্নমত ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি এই সম্মানই গণতন্ত্রের শক্তি৷'' কিন্তু পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় আরেক শিক্ষকের ভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়েছে৷

প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে প্রচার করা ‘আপত্তিকর ভিডিওতে লাইক' দেওয়ার অভিযোগে মিঠাখালী পিজিএস আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. মামুন অর রশিদ তালুকদারকে স্কুল থেকে বরখাস্ত করা হয়৷ গত ৯ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তারেক রহমানকে নিয়ে তৈরি করা একটি ভিডিওতে লাইক দেন৷ শিক্ষককে বরখাস্তের ঘটনায় ফেসবুকে প্রতিবাদ জানিয়েছেন অনেকেই৷ শনিবার পর্যন্ত তার বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার হয়নি বলে স্কুলের একজন শিক্ষক ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন৷ ভুক্তভোগী শিক্ষক দাবি করেন, ঘটনাটি তার ইচ্ছাকৃত কোনো ভুল বা অপরাধ নয়; বরং অনিচ্ছাকৃত ও অসাবধানতাজনিত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা৷

মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামালের মতে, সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে আইনের নিরপেক্ষ ও ধারাবাহিক প্রয়োগের ঘাটতি৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘ বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসন বা রাষ্ট্রের খুব নিরপেক্ষ ভূমিকা নিতে হয়৷ সত্যানুসন্ধানের একটা ব্যাপার থাকে৷ আমরা দেখছি যে, এ সমস্ত ঘটনার মধ্যে কোনোটাই খুব একটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয় না৷ অনেক সময় আমরা দেখতে পাই যে কোন না কোনোভাবে যদি কেউ প্রভাব খাটাতে পারে সেখানে একটা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়৷

আমরা যেটা বলি আইন নিজের গতিতে চলবে অত্যন্ত নিরপেক্ষ এবং সৎভাবে সেটা প্রয়োগ হবে, সেই সংস্কৃতিটা আমরা তৈরি করতে পারিনি৷'' তার মতে, যে সমস্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে তা হয় চাপে পড়ে হচ্ছে কিংবা কেউ প্রভাব খাটাচ্ছে বলে হচ্ছে৷ অথবা কোথাও সরকার মনে করছে যে এখানে একটা পদক্ষেপ নিলে হয়ত কিছুটা জনপ্রিয়তা অর্জন করা যাবে৷ তিনি বলেন, ‘‘অন্য একটা উদ্দেশ্য থেকে আইনের প্রয়োগ চলছে, আইনের জন্য আইন প্রয়োগ চলছে না৷

সেটা যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা নিশ্চিত করতে না পারবো, আপনার প্রশ্নের সোজা উত্তর হলো, বাকস্বাধীনতাই হোক সুশাসনই হোক আমরা নিশ্চিত করতে পারবো না৷'' মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটনের মতে রাড্ডা হামলার ঘটনার পর বেশ কিছু উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার ইতিবাচক উদাহরণ তৈরি করেছে৷ কিন্তু সালমান মুক্তাদিরের ক্ষেত্রে অভিযোগকারীর ওপর পালটা পদক্ষেপের ঘটনায় সাধারণ মানুষের ভেতরে একটা ভীতিকর অবস্থা তৈরি হচ্ছে৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘আমি অভিযোগ করলাম উল্টো আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখলাম৷ তখন তো আর কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব হবে না বিচার চাওয়ার৷

এক ধরনের ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হবে৷ এর মধ্য দিয়ে যেমন বাকস্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, পাশাপাশি মানুষের ভিতরে ভীতি ছড়াতে পারে৷'' এক্ষেত্রে অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অভিযোগকারী বা ভুক্তভোগী যেন অভিযোগ জানাতে গিয়ে নতুন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও সরকারের নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক৷

তিনি বলেন, ‘‘যে ক্ষতিগ্রস্ত সে তার ক্ষুব্ধতা-সংক্ষুব্ধতা কিংবা তার কষ্ট বা ক্ষতির কথা জানাতে গিয়ে যাতে কোনো অবস্থায় হয়রানির মধ্যে না পড়ে এটাও কিন্তু সরকারের দেখা প্রয়োজন৷'' তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, সরকার আইনের শাসন নিশ্চিত করতে কাজ করছে৷ তিনি বলেন, ‘‘আমরা দেখেছি প্রতিটি ক্ষেত্রে নিশ্চিত করা হচ্ছে যে, জনগণের যে আকাঙ্ক্ষা তার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে সব রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে যেকোন অনৈতিক বা শৃঙ্খলা বহির্ভূত কাজের ক্ষেত্রে আইনের অনুশাসন নিশ্চিত করা হচ্ছে৷ মামলা গ্রহণ-গ্রেপ্তার প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিশ্চিত করা হচ্ছে যারা অপরাধী এবং যারা দুর্বৃত্তায়নের সাথে জড়িত তারা অবশ্যই যেন আইনগতভাবে শাস্তির আওতায় আসে৷''