রাজধানীতে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র লুট করে গুঁড়িয়ে দেয়ার একদিন পর কন্টেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতেও হামলা, ভাঙচুর, লুটতরাজ হয়৷ এসবের পাশাপাশি সারা দেশে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি র একাংশের বাস টার্মিনাল, ফুটপাত, বাজার, জলমহাল, বালুমহাল, হাটবাজার, কেব্‌ল, ইন্টারনেট ব্যবসা ইত্যাদি দখল ও চাঁদাবাজি র কথা উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি ৷ রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে লুটপাট, ভাঙচুর চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়ার এবং ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের কার্যালয়ে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার পর গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ( টিআইবি )। ঘটনাগুলোকে কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বরং সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের জন্য ‘অশনিসংকেত' উল্লেখ করে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহিসহ সারা দেশে দলের আত্মশুদ্ধি অভিযানের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

গতকাল রোববার টিআইবির এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘‘রাড্ডা এমসিএইচে লুটপাট, ভাঙচুর ও জবরদখল সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের জন্য বিব্রতকর দৃষ্টান্ত।'' বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘‘জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের একজন সদস্যের পৃষ্ঠপোষকতায় পুলিশের উপস্থিতিতে শত শত মানুষের সামনে অর্ধশত বছর ধরে গরিব–অসহায় মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে ক্ষমতাসীন দল কোন ধরনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে?

রক্তক্ষয়ী জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে কর্তৃত্বপরায়ণ চোরতন্ত্রের পতনের প্রেক্ষাপটে ঐতিহাসিক নির্বাচনের জনরায়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত দলের নেতা–কর্মীদের এ–জাতীয় কর্মকাণ্ড দেশবাসীর কাছে কী বার্তা দিচ্ছে? সাধারণ জনগণের মানসপটে বিগত সময়ের কর্তৃত্ববাদী সরকারের স্বেচ্ছাচারী আচরণ এখনো সতেজ। এ রকম একটি প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা দলীয় নেতা–কর্মীদের উল্লেখযোগ্য অংশের চলমান দখলবাজি ও চাঁদাবাজির পরিণতি ভেবে দেখছেন কি?'' ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টের পর বিএনপির একাংশের বিরুদ্ধে দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে।

বাস টার্মিনাল, ফুটপাত, বাজার, জলমহাল, বালুমহাল, হাটবাজার, কেব্‌ল, ইন্টারনেট ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে এসব কর্মকাণ্ড চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, এসব নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে, যা সরকারের জন্য অশনিসংকেত। কিশোরগঞ্জের জলমহাল দখল নিয়ে স্থানীয় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ ও রাজধানীতে সালমান মুক্তাদিরের ক্রিয়েটিভ স্টুডিও ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; ২০২৪ সালের আগস্টের পরের ঘটনাপ্রবাহের ধারাবাহিকতা।

সরকার এখনই কার্যকর আত্মশুদ্ধিমূলক পদক্ষেপ না নিলে দখলবাজি ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, দলীয়ভাবে বহিষ্কারসহ কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হলেও কঠোর প্রতিরোধের ঘাটতি এবং ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার কারণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। এতে স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

প্রতিটি ঘটনার যথাযথ তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবিও জানিয়েছে টিআইবি। গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে রাজধানীর মিরপুর ১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে নিরাপত্তাকর্মীদের বেঁধে রেখে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সেখানে ঢুকে প্রথমে দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে। এরপর মূল্যবান যন্ত্রপাতি, ওষুধ, ভ্যাকসিন, নগদ টাকা ও অন্যান্য মালপত্র লুট করে নিয়ে যায়।

পরে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি আধা পাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। রাত ১২টার দিকে এই ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড' নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে এ ভাঙচুর চালানো হয়। এতে এক কোটি টাকার বেশি ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার। এ ঘটনায় বাদী হয়ে শাহ আলী থানায় মামলা করেন তিনি।

স্থানীয় বিএনপির দুটি পক্ষ দীর্ঘদিন ধরে জায়গাটি দখল করার চেষ্টা করে আসছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে একটি পক্ষ ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড' নামে তা দখল করে নেয়। স্থানীয় একাধিক সূত্র ডয়চে ভেলের কন্টেন্ট পার্টনার প্রথম আলোকে জানায়, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বিএনপি নেতা ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি এই পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক।

প্রয়াত এক কাউন্সিলরের স্ত্রী এবং বিএনপির প্রয়াত একজন এমপির বোন তিনি। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, হামলা ও ভাঙচুরের সময় পুলিশকে খবর দিয়েছিলেন তারা। পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও স্থাপনাটি রক্ষা করতে পারেনি। পুরো ভবনটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেন, পাঁচ–ছয় বছর ধরে সমমনা সমবায় সমিতির নামে কিছু লোক জায়গাটি দখলের চেষ্টা করে আসছিল। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে এসে সব গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

জমি দখলের উদ্দেশ্যেই এ হামলা করা হয়েছে। রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ১৯৭৪ সালে মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের মাতৃ ও শিশুসেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কার্যক্রম শুরু করে। তৎকালীন সুইডিশ সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রতিষ্ঠান রাড্ডা বার্নেনের উদ্যোগে কেন্দ্রটির যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা, গর্ভকালীন ও প্রসবোত্তর সেবা, শিশুদের টিকাদান, শিশু স্বাস্থ্যসেবা এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্য কার্যক্রম পরিচালনা করে।

কেন্দ্রটির তিনটি স্থায়ী ক্লিনিকে রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্যাথোলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, হেমাটোলজিসহ বিভিন্ন পরীক্ষার সুবিধাও রয়েছে। মিরপুর ১০ এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কেন্দ্র হলেও মিরপুর ১, বাউনিয়াবাদ, উত্তরা, ভাসানটেক বস্তি ও পুরান ঢাকায় প্রতিষ্ঠানটির সেবা কার্যক্রম বিস্তৃত রয়েছে। ধ্বংসস্তূপের সামনেই চলছে স্বাস্থ্যসেবাদান রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেয়া হলেও ধ্বংসস্তূপের সামনেই কাজ করে যাচ্ছেন কর্মীরা৷ গতকাল রোববার সকাল থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত ৩৭ জন শিশুকে টিকা দিয়েছেন তারা।

এ ছাড়া অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছেন অন্তত ১৫ জনকে। স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, এই কেন্দ্রে স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১৫০ জনকে স্বাস্থসেবা দেয়া হয়। দ্রুত, নিরপেক্ষ, কার্যকর তদন্ত, দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতা এবং ক্ষতিপূরণ দাবি রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত, দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে তিন শতাধিক বেসরকারি ও নাগরিক সংগঠনের জোট সিএসও অ্যালায়েন্স। গতকাল রোববার এক বিবৃতিতে জোটটি জানায়, ২৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে ২০০ থেকে ২৫০ জনের একটি দল কেন্দ্রটির নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে টিকা, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও টাকা লুট করে। পরে ভারী যন্ত্র দিয়ে কেন্দ্রের ভবনগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে ত্রিপলের অস্থায়ী তাঁবুতে শিশুদের টিকাদান চললেও বেশির ভাগ সেবা বন্ধ রয়েছে।

রাড্ডা দশক ধরে রাড্ডা সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বে দরিদ্র মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে- উল্লেখ করে বিবৃতিতে আরো বলা হয়, জমি নিয়ে বিরোধের মীমাংসা আইনি প্রক্রিয়ায় হওয়া উচিত, শক্তি প্রয়োগ করে নয়। এ ঘটনায় ৯ জনকে গ্রেপ্তার ও লুট হওয়া মালামাল উদ্ধারের তথ্য এবং পুলিশের ভূমিকা তদন্তের ঘোষণা ও টিকাদান চালু রাখার বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আশ্বাসকে স্বাগত জানিয়েছে তারা।

সিএসও অ্যালায়েন্স হামলার পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও অংশগ্রহণকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনের আওতায় আনা, তদন্তের ফল প্রকাশ, রাড্ডার নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা এবং লুট হওয়া টিকা ও সামগ্রী প্রতিস্থাপনের দাবি জানিয়েছে। বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন রাশেদা কে চৌধূরী, শাহীন আনাম, সারা হোসেন, আসিফ সালেহ্, শিব নারায়ণ কৈরী, হাসিন জাহান, এ কে এম মুসা, কে এ এম মোর্শেদ ও সাঈদ আহমেদ। শনিবার রাতে রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাটের ঘটনা ঘটে৷

সেই রাতেই নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তার স্টুডিও নিয়ে ভিডিও প্রকাশ করেন বাংলাদেশের জনপ্রিয়া কন্টেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদির। ভিডিওতে তিনি বলেন, ‘‘একটু আগে এখানে অ্যাটাক হয়েছিল…এই পুরা অ্যাটাকে আমাদের স্টুডিও ডেস্ট্রয়েড হয়ে গেছে।'' ভিডিওতে দেখা যায়, স্টুডিওর বিভিন্ন অংশে ভাঙচুর করা হয়েছে। চেয়ার, টেবিল, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন আসবাব ও সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্টুডিওর কর্মীদের কয়েকজনকে তখন কাঁদতে দেখা যায়। সালমান মুক্তাদিরকে আরো বলতে শোনা যায়, ‘‘ভিডিওটা শুধু খুবই স্পেশালি বানানো আমাদের যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, উনার জন্য। আপনি প্লিজ কোনো টেনশন নিবেন না, দিস ইজ নরমাল ইন বাংলাদেশ।'' ডিএমপির ক্যান্টনমেন্ট অঞ্চলের সহকারী কমিশনার (এসি) নাজমুল আলম ডয়চে ভেলের কন্টেন্ট পার্টনার প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য, সালমান মুক্তাদিরের জবাব স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের বিএনপির বিরুদ্ধে ‘চাঁদাবাজির' অভিযোগকে ‘ঢালাও মন্তব্য' হিসেবে অভিহিত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। প্রাথমিক তদন্তের বরাতে গতকাল রোববার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এ ঘটনায় তিনি (সালমান মুক্তাদির) ‘ভিকটিমাইজড' (ঘটনার শিকার) হয়েছেন। এর আগে শনিবার রাতে হামলা,ভাঙচুর. লুটের পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা ভিডিওতে সালমান মুক্তাদির বলেন, ঘটনার পিছনে বিএনপির লোকজনের ‘চাঁদাবাজির' সম্পর্ক থাকতে পারে।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ঘটনাস্থলে একটি বিরোধপূর্ণ জমি আছে। জমি নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ আছে। এক পক্ষের হয়ে বেশ কিছু লোক তা লোক দখল করতে গিয়েছিল। গিয়ে সেখানে ভাঙচুর করেছে। এর মধ্যে সালমান মুক্তাদিরের একটি স্থাপনা, যেখানে তিনি কনটেন্ট ক্রিয়েট করতেন, সেটায়ও ভাঙচুর হয়েছে। এটি ভিডিওতে দেখেছেন। সালাহউদ্দিন আহমদ আরো বলেন, ‘‘যিনি অভিযোগ করেছেন, তিনি কোনো মামলা করেছেন? করেননি।

তিনি একপর্যায়ে বলেছেন, ‘তার (সালমান মুক্তাদির) কাছে কেউ চাঁদা চায়নি। চাইলে নাকি দিতেন। এ রকম শুনেছি।'' বিএনপিকে সালমান মুক্তাদির চাঁদাবাজ বলার বিষয়টিকে ‘ঢালাও মন্তব্য' অভিহিত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সালমান মুক্তাদির সুনির্দিষ্ট মামলা করলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর আরেক ভিডিওতে সালমান মুক্তাদির বলেন, দেশের প্রত্যেক মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা সরকারকে দিতে হবে। তা না হলে দেশ বিরাটভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘‘দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য পারলে কিছু করে দেখান।'' তিনি আরো বলেন, তাকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর দরকার নেই। ভিডিও বার্তায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে সালমান মুক্তাদির বলেন, স্টুডিওতে হামলার পর শনিবার রাতেই তিনি থানায় মামলা করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু ভোর চারটা পর্যন্ত অপেক্ষা করলেও মামলা নেওয়া হয়নি। পরের দিন, অর্থাৎ, রোববার দুপুরে মামলা না হওয়ার কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তাই সালমান মুক্তাদিরেরও প্রশ্ন, এই ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার আগপর্যন্ত এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য আসার আগপর্যন্ত মামলা কেন হলো না? সালমান জানতে চান, তিনি লোকজন নিয়ে ভোর চারটা পর্যন্ত বসে থাকার পরও কেন মামলা করতে পারলেন না? পরে মামলা হলেও সেই তথ্য কেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে গেল না? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে সালমান মুক্তাদির আরো বলেন, ‘‘আপনার এত বড় রেসপনসিবিলিটি থেকে আপনি যখন স্টেটমেন্টে বললেন যে, মামলা দায়ের কেন করা হয় না, সালমান মুক্তাদির মামলা দায়ের করেন নাই।

এই জিনিসটা কেন হাস্যকর এবং আপনাদের পুরো ডিপার্টমেন্ট, আপনাদের পুরো সরকারকে কীজন্য এখানে এত ছোট করে ফেললেন।'' ‘‘আমি যে গতকালকে (শনিবার) চারটা পর্যন্ত এতগুলো মানুষ নিয়ে আপনার থানাতে বসে ছিলাম, ক্যান্টনমেন্ট থানায় গত রাত চারটা পর্যন্ত..... আমি টায়ার্ড হয়ে বাসায় ফেরত আসলাম৷ আমার মাথা ঠিক থাকার কথা না....

আজকে (রোববার) দুপুর পর্যন্ত মামলা করা হয় নাই। আনটিল থিংস গট ভাইরাল অ্যান্ড আপনার স্টেটমেন্ট আসে, এর আগপর্যন্ত মামলা আসলেও কেন দায়ের করা হয় নাই - এই প্রশ্নটা আমার আপনার কাছে থাকার কথা। দেশবাসীকে আপনারই অ্যানসার করতে হবে, কেন সালাহউদ্দিন আহমদের আন্ডারে মামলা দায়ের হয় নাই।'' এ ঘটনায় কখন মামলা হয়েছে জানতে চাইলে ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. গিয়াস উদ্দিন রোববার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, আজ রোববার সকাল সাড়ে আটটায় এ ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছে। অথচর দুপুরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন মামলা হয়নি৷ এ বিষয়ে ভিডিও বার্তায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে সালমান মুক্তাদির বলেন, ‘‘আপনি একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আপনার প্রত্যেকটা থানা, প্রত্যেকটা অথরিটি, প্রত্যেকটা অ্যাডমিন আপনার এক কল, এক বাটনের আন্ডারে। আপনি জানেনও না যে, মামলা দায়ের করা হয়েছে। আপনার কাছে আপডেটটা নাই।

আপনি কতটুকু ডিটাচড (বিচ্ছিন্ন) আপনার দেশের নাগরিকদের সঙ্গে, আপনার যে সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি প্রোটোকল, সেটার সঙ্গে আপনি পুরোপুরি ডিটাচড, আপনি জানেন না, মামলা দায়ের করা হয়েছে।'' সালমান মুক্তাদির আরো বলেন, ‘‘আমি বিএনপির কথা কেন বললাম, চাঁদাবাজির কথা কেন বললাম? আপনি মুচকি যে রকম হাসি দেন, এই মুচকি হাসি এখন আমার দিতে ইচ্ছা করতেছে। দেখেন, আমারও হাসি আসে, আপনারও হাসি আসে।

আমরা এক রকম হেল্পলেস (অসহায়)। আপনিও কিছু করতে পারতেছেন না, আমিও কিন্তু কিছু করতে পারছি না। আপনি হেসে হেসে উড়ায় দিচ্ছেন, আমিও হেসে হেসে উড়ায় দিচ্ছি।'' ঘটনাস্থল থেকে যে তিনজনকে আটক করা হয়, তারাই বিএনপির নাম বলেছে বলে দাবি করে সালমান মুক্তাদির বলেন, ‘‘তাদের বন্দুক থেকে ফায়ার করা হয়েছে। সে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। তাদের চাপাতি, কোদাল—সব সংগ্রহ করা হয়েছে। তাদের ফোনের ভিডিও আমি দেখলাম।

তাদের চেহারা আমি দেখলাম। তারা স্বীকার করতেছে, মানুষের কাছ থেকে মাইরটাইর খাওয়ার পর, মানুষের মুখে শুনতেছি, তারা বিএনপির নাম নিয়ে নিছে।'' এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করে সালমান মুক্তাদির আরও বলেন, ‘‘আমার স্যানিটি বজায় রাখতে হবে, কম্পোজার বজায় রাখতে হবে, এরপর আমার স্পিচ ঠিক রাখতে হবে? আমি বিএনপিকে কোনো কথা বলতে পারবো না, আঙুল তুলতে পারবো না? আমি খুবই কনফিউজড।

আপনি (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) কি বিএনপির পিআর ম্যানেজমেন্ট ক্রাইসিসের দায়িত্ব নিয়েছেন, নাকি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন? এখানে আমি খুবই কনফিউজড। বিকজ প্রবলেম ওয়াজ সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি।'' স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে সালমান মুক্তাদির আরো বলেন, ‘‘আমরা এখানে ইনভেস্টিগেশনের জন্য আপনার কাছে আসিনি। আমরা আসছি অ্যাকশনের জন্য। আপনি নিজে বললেন যে, আমি ঢালাওভাবে কথা বলছি। আপনি তো নিজে বলে দিলেন যে, কোনো একটা সামরিক বাহিনীর লোক এখানে ইনভলভড।

ওকে, আপনার তো তার ইনভেস্টিগেশন হইছে। তারপর আপনি কী করলেন? আপনি এসে প্রেস ব্রিফিংয়ে কোনো অ্যানসার দিলেন না, কোনো অ্যাকশন নিলেন না, এমন কোনো কাজ করলেন না যেখানে বাংলাদেশের মানুষ সিকিউরিটিকে এনশিওর করতে পারে; বরং আপনি বলে দিলেন, সালমান মুক্তাদির বলেছেন, ভদ্রলোক হ্যান বলেছেন, ত্যান বলেছেন।'' সালমান মুক্তাদির বলেন, ‘‘কিছু একটা করে দেখান। আপনাদের থেকে কিন্তু টাকা চাই না।

আমার স্টুডিও বানায় দিতে হবে না। আমি সালমান মুক্তাদির যথেষ্ট স্ট্রং। আমি কারো থেকে ভিক্ষা চাবো না।...আমার কিছু লাগবে না। ইফ ইউ রিয়েলি ওয়ান্ট টু ডু সামথিং, ডু সামথিং ফর বাংলাদেশ।'' তিনি বলেন, ‘‘আমার এটার থ্রুতে যদি আপনারা কোনো রকমের সেফটি, সিকিউরিটি মানুষের জন্য এনশিওর করতে না পারেন, আমার নাগরিকদের সিকিউরিটি এনশিওর করতে না পারেন, তাহলে মাই লস।'' এসিবি/ এসএস (প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার)