ইসরায়েলগামী 'ফ্লাইদুবাই'য়ের একটি বিমানকে বিধ্বস্ত হওয়া থেকে রক্ষা করে সারা বিশ্বের প্রশংসা কুড়োচ্ছেন ভারতীয় পাইলট স্মিত মাচ্ছার। এই মুহূর্তে চিকিৎসাধীন তিনি এবং স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে শুক্রবার টেলিফোনে কথাও বলেছেন তিনি। মি. মোদী তার সাহস ও উপস্থিত বুদ্ধির প্রশংসা করেছেন। ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপকালে বিমানের ভেতরের ঘটনা সম্বন্ধে জানিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন তিনি পড়ে গিয়ে গুরুতর আঘাত পেলেও বুঝতে পারছিলেন বিমানের ভেতরের পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে।

তিনি বলেছেন, "আমি নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু আমি জানতাম যে আমি ওই লোকগুলোকে মরতে দিতে পারি না।" "আমার মনে হয়েছিল যে আমি যদি উঠে কোনো পদক্ষেপ না নিই, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।" ইনস্টাগ্রামে বিবিসি বাংলা ফলো করতে ক্লিক/ট্যাপ করুন এখানে তার এই সাহসের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। তিনি বলেন, "সারা দেশ আপনার জন্য প্রার্থনা করছে। সর্বত্র মহামৃত্যুঞ্জয় ধ্বনি উচ্চারিত হচ্ছে। আপনার সাহস, ধৈর্য এবং প্রজ্ঞা বহু জীবন বাঁচিয়েছে।"

বুধবারের এই ঘটনা ৪০ বছর আগের এমনই আরেক বিমানকর্মীর সাহসিকতার স্মৃতি উসকিয়ে দিয়েছে। তিনি হলেন ভারতীয় এয়ারহোস্টেস নীরজা ভানোত। ১৯৮৬ সালে ছিনতাই হওয়া এক প্যান অ্যাম বিমানের সিনিয়র ফ্লাইট পার্সার ছিলেন নীরজা ভানোত। তিনি ও তার সহকর্মীরা বিচক্ষণতা ও সাহসিকতার সঙ্গে ৩০০ জনেরও বেশি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছিলেন। তবে বিমান ছিনতাইকারীদের হাত থেকে তিনি নিজেকে বাঁচাতে পারেননি। ছিনতাইকারীদের গুলিতেই মৃত্যু হয় তার। সিনিয়র ফ্লাইট পার্সার হলেন বিমানের কেবিনের দায়িত্বে থাকা প্রধান ক্রু সদস্য।

যিনি নিরাপত্তা, বিমানকর্মীদের কর্তব্য এবং যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্যর বিষয়ে নজর রাখেন। সেদিন নিজের সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের জীবন দিয়েছিলেন মিজ. ভানোত। ঘটনাটা ১৯৮৬ সালের পাঁচই সেপ্টেম্বরের। ভারতের মুম্বাই থেকে প্যান অ্যাম-এর ওই বিমান করাচি ও ফ্র্যাঙ্কফুট হয়ে নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। মুম্বাই থেকে ছাড়ার পর বিমানটি পাকিস্তানের করাচি বিমানবন্দরে অবতরণ করে। টারম্যাকে দাঁড় করানো অবস্থাতেই ছিনতাই করা হয় ওই বিমান। রক্ষীদের ছদ্মবেশ ধারণ করে অস্ত্রধারীরা বিমানে ঢুকে পড়ে।

বিমানে ৩৬০ জন যাত্রী সওয়ার ছিলেন এবং ১৯ জন ক্রু সদস্য উপস্থিত ছিলেন। চারজন ছিনতাইকারী ওই বিমানটি উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। বিমান ছিনতাই হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টা নজরে আসে মিজ ভানোতের। তিনি সবার আগে পাইলটদের এই বিষয়ে জানান। তারপর পাইলট, কো-পাইলট ও ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার ককপিটের আপদকালীন দরজা দিয়ে বিমান থেকে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হন। ছিনতাইকারীদের সঙ্গে দীর্ঘ ১৬ ঘন্টা লড়াই চলেছিল। এক সময়ে অন্ধকার নেমে আসে।

আলো কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে মিজ. ভানোত বিমানের কেবিনের আপদকালীন দরজা খুলে দেন। এরপরই যাত্রীরা পালাতে থাকেন। প্রায় সব যাত্রী বাইরে যেতে পারলেও তিনটি শিশু তখনো বিমানে আটকিয়ে ছিল। নীরজা ভানোত যখন বাচ্চাদের বাইরে বের করে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই বিমান ছিনতাইকারীরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। ওই শিশুরা বেঁচে গেলেও ছিনতাইকারীদের গুলির হাত থেকে বাঁচতে পারেননি মিজ ভানোত। ওই ঘটনায় সব মিলিয়ে ২২ জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং ১৫০ জন আহত হন।

ছিনতাইকারীরা ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন বলে পরে জানা যায়। মূল ছিনতাইকারী ছিলেন জায়েদ হাসান আবদুল লতিফ মাসুদ আল-সাফারিনি। ২০০১ সালে, পাকিস্তান তাকে মার্কিন তদন্ত সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের কাছে হস্তান্তর করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে এবং আদালতে তার ১৬০ বছরের কারাদণ্ড হয়। ওই ঘটনার ভয়াবহতা সারা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। হাইজ্যাকের ঘটনা থেকে বেঁচে ফেরা বিমানকর্মী এবং যাত্রীরা দীর্ঘদিন এই ঘটনা নিয়ে কথা বলার মতো অবস্থাতেই ছিলেন না।

তবে ভয়াবহতার মাঝেও মিজ ভানোতের সাহস এবং কর্তব্যবোধ বিশ্বকে মুগ্ধ করেছিল। ঘটনাচক্রে ওইদিন তার ছুটি ছিল। কিন্তু অন্য এক কর্মী অসুস্থ হয়ে পড়ায় সেদিন কাজে যোগ দেন তিনি। ওই ঘটনার ঠিক দুদিন পরেই তার জন্মদিন ছিল। দিনটা পরিবারের সঙ্গে একান্তে কাটাতে চেয়েছিলেন এই হাসি খুশি তরুণী, যিনি গত শতাব্দীর আটের দশকে বহু বিজ্ঞাপনে মডেলিংও করতেন। এই ঘটনা নিয়ে বছরকয়েক আগে বলিউডে চলচ্চিত্রও তৈরি হয়েছিল। সেখানে তার বীরত্বের কথাও তুলে ধরা হয়।

সেখানে দেখানো হয় কীভাবে নিজের জীবনের পরোয়া না করেই অন্যদের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন তিনি ও তার সহকর্মীরা। ওই বিমানে সওয়ার বিমানকর্মী এবং যাত্রীদের উপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল এই ঘটনা। বিমান ছিনতাইয়ের ৩০ বছর পর প্রথমবারের মতো ২০১৬ সালে, গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছিলেন প্যান অ্যাম ৭৩- এর ছয়জন ক্রু সদস্য। বিমান সেবিকা নূপুর আবরোল বিবিসি নিউজকে বলেছিলেন, "আমি প্রথমে ভেবেছিলাম বিমানের ডানার দরজা খুলে কয়েকজন যাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে লাফিয়ে পড়ব।

কিন্তু পরে বুঝতে পারলাম যে এতে অন্য যাত্রীদের জীবন বিপন্ন হবে।" ওই ঘটনা এখনো তাদের কাছে 'দুঃস্বপ্নের মতো' বলেই জানিয়েছিলেন নূপুর আবরোল, "আমার এবং আমার সহকর্মীদের কাছে বিমান ছিনতাইয়ের এই ঘটনা এখনো শেষ হয়নি। কিছু বিমানকর্মী এবং যাত্রী এখনো এই দুঃস্বপ্নের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন, রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য লড়াই করছেন।" ঘটনার দিন সকাল ছয়টার দিকে বিমানটি করাচি পৌঁছায়। সেই সময় চারজন সশস্ত্র ব্যক্তি বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেদ করে গুলি ছুড়তে ছুড়তে বিমানে প্রবেশ করেন।

মিজ আবরোল বিবিসি নিউজকে জানিয়েছিলেন সেদিন কীভাবে তারই এক সহকর্মীর পায়ের কাছে এসে একটা গুলি লাগে। তিনি চিৎকার করে তাকে বিমানের গেট বন্ধ করতে বলেন। বিমানসেবিকা শিরিন পবনকে সশস্ত্র ব্যক্তিরা তখনো দেখতে পাননি। গুলির শব্দ শোনা মাত্র তিনি ইন্টারকমের কাছে পৌঁছে ককপিটের জরুরি নম্বরে ডায়াল করেন। দ্বিতীয়বার প্রচেষ্টায় পর অপর প্রান্ত থেকে সাড়া মেলে এবং শিরিন পবন তাকে হাইজ্যাকিংয়ের খবর জানাতে যে কোড ব্যবহার করা হয়, সেই কোড বলেন।

অন্য এক বিমানসেবিকা সানশাইন ভেসুভালা লক্ষ্য করেন যে ছিনতাইকারীরা নীরজা ভানোতকে ধরে ফেলে তার মাথায় বন্দুক তাক করে রেখেছে। একে ফর্টিসেভেন এবং গ্রেনেড হাতে এক ছিনতাইকারী ক্যাপ্টেনের কাছে নিয়ে যাওয়ার আদেশ দেন মিজ ভেসুভালাকে। কিন্তু মিজ ভানোত বা মিজ ভেসুভালা কেউই সাহস হারাননি। এদিকে ততক্ষণে ককপিট একেবারে খালি অবস্থায় ছিল। মিজ ভেসুভালার চোখে পড়ে বিমান থেকে এগজিটের জন্য ব্যবহৃত সরঞ্জাম ককপিটে খোলা অবস্থায় পড়ে আছে। ককপিটের ছাদ দিয়ে প্রস্থানের যে পথ রয়েছে, সেটাও খোলা।

কিন্তু ছিনতাইকারীদের সামনে এসবের কিছুই না দেখার ভান করেন তিনি। তিনি ধারণা করেছিলেন, ছিনতাইকারীরা বিমানের কলকব্জা সম্পর্কে তেমন কিছু জানেন না। তাই তারা প্রস্থানের পথ ও যন্ত্রপাতির দিকে মনোযোগ দেননি। ছিনতাই হওয়ার পর যাত্রীদের বিমানে থাকা অবস্থাতেই পাইলটদের এইভাবে বেরিয়ে আসা নিয়ে অনেকে সমালোচনা করেছিলেন। তবে অন্য এক ক্রু সদস্য দিলীপ বেদি চন্দানির মতে পাইলটদের প্রস্থানের ফলে অনেক জীবন রক্ষা করা পায়। তিনি বলেন, "পাইলটরা বিমান ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো, আমরা পুরোপুরি ছিনতাইকারীদের নিয়ন্ত্রণে ছিলাম না।

পাইলটরা যদি সেখানে থাকতেন, তাহলে তারা সেই বিমান আকাশে উড়িয়ে কোনো ভবনে আঘাত করার কথা বলতে পারত বা আকাশে থাকা অবস্থাতেই বিস্ফোরণ ঘটাতে পারত।" ছিনতাইকারীদের পরিকল্পনা ছিল পাইলটদের সাইপ্রাস ও ইসরায়েলের উপর দিয়ে ওই বিমান নিয়ে যেতে বাধ্য করা। তাদের সংগঠনের কয়েকজন সদস্য সাইপ্রাস ও ইসরায়েলের কারাগারে ছিল। তাদের মুক্ত করার কথাই ভেবেছিল ওই ছিনতাইকারীরা। প্যান আমেরিকান সার্ভিসের করাচির পরিচালক বিরাফ দারোগা মেগাফোনের মাধ্যমে এই সশস্ত্র ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন।

তিনি ওই চার সশস্ত্র ব্যক্তিকে জানিয়েছিলেন, তারা যেখানে যেতে চায় সেখানে নিয়ে যাবেন পাইলটরা। তিনি এও জানিয়েছিলেন যে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বিমানে পাইলট পাঠানোর কথা ভাবছে। এদিকে, ছিনতাইকারীরা বিমানে সওয়ার ২৯ বছরের মার্কিন নাগরিক রাজেশ কুমারকে তার আসন থেকে টেনে নিয়ে যায়। বিমানের দরজার কাছে নিয়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসানো হয় এবং তার দিকে বন্দুক তাক করা হয়। এক ঘণ্টার মধ্যে কোনও পাইলট না এসে পৌঁছানোয় রাজেশ কুমারকে গুলি করে বিমান থেকে ফেলে দেয় ওই ছিনতাইকারীরা।

সেদিনের ঘটনার স্মৃতিচারণা করে সানশাইন ভেসুভালা বলেন, "এই ঘটনা বিমানের ভেতরের পরিবেশকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল। এতে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে তারা নির্মম হত্যাকারী।" এই অবস্থায় নীরজা ভানোত, সানশাইন ভেসুভালা-সহ অন্যান্য বিমানকর্মীদের উপর গিয়ে পড়ে বিমানের ভিতরের পরিস্থিতির দিকে নজর দেওয়া এবং যাত্রীদের সুরক্ষার দায়িত্ব। বিমান ছিনতাইয়ের প্রায় চার ঘণ্টা পর ছিনতাইকারীরা যাত্রীদের মধ্যে মার্কিন নাগরিকদের খোঁজ করতে শুরু করেন।

হাইজ্যাকাররা আবু নিদাল অর্গানাইজেশনের (এএনও) সদস্য ছিলেন বলে জানা যায়, যা ফাতাহ বিপ্লবী কাউন্সিল নামেও পরিচিত। এই গোষ্ঠীর এখন আর অস্তিত্ব নেই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের 'সন্ত্রাসী গোষ্ঠী' হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। ১৯৭০ এবং ১৯৮০এর দশকে বেশ কয়েকটা হামলার নেপথ্যে এই গোষ্ঠী ছিল বলে অভিযোগ। সানশাইন ভেসুভালা, মাধবী বহুগুণা-সহ অন্যান্য ফ্লাইট অ্যাটেন্ডেন্টরা যাত্রীদের পাসপোর্ট সংগ্রহ শুরু করেন। কিন্তু বাস্তবে তারা চুপিচুপি একটা রণকৌশল তৈরি করছিলেন।

মার্কিন নাগরিকদের পাসপোর্ট ওই ছিনতাইকারীদের কাছে জমা দেননি তারা, যাতে হাইজ্যাকাররা তাদের শনাক্ত করতে না পারেন। শিরিন পবন এবং মিজ ভেসুভালা তাদের বেশিরভাগ সময় প্রধান ছিনতাইকারী জায়েদ হাসান আবদুল লতিফ মাসুদ আল-সাফারিনির সঙ্গে কাটিয়েছিলেন। তারা জানিয়েছেন কীভাবে মি. সাফারিনি বিমানের বাইরের দিকে নজর রাখার জন্য নিজের বন্দুককে সামনে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন। "এইভাবে সে আমার চুল ধরে জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করছিল যে আমি বাইরে কী দেখতে পাচ্ছি।

মার্কিন যুদ্ধবিমানের জন্য অপেক্ষা করছে বলে জানিয়েছিল সে।" বিমানে মেকানিক হিসাবে কর্মরত বছর ২৮-এর মেহেরজি খারাসকে ছিনতাইকারীরা রেডিওর মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বাধ্য করেছিল। তখনো ওই সশস্ত্র ব্যক্তিদের আশা ছিল একজন পাইলট ঠিক পাওয়া যাবে। মিজ ভেসুভালা এটাও জানান যে মি. সাফারিনি তার সঙ্গে বেশ কয়েকবার ফ্লার্ট করেন এবং তার সঙ্গে সাইপ্রাসে যাওয়ার প্রস্তাবও দেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পরে, ওই সশস্ত্র ব্যক্তিরা ঘোষণা করেন পাইলট না এলে তারা প্রতি ১৫ মিনিটে একজন যাত্রীকে গুলি করবেন।

এর মাঝেই শিরিন পবন লক্ষ্য করেন মেহেরজি খারাসকে মেরে ফেলা হয়েছে। এই সময় দৌড়াদৌড়ি শুরু হয় এবং পদদলিত হওয়ার মতো অবস্থা দেখা দেয়। সেই সময়ে নূপুর ও মাধবী বহুগুণা বিমানের ডানা থেকে লাফিয়ে পড়েন। প্রায় ২০ ফুট উচ্চতা থেকে লাফ দেওয়ার কারণে তাদের হাড় ভেঙে যায়। সানশাইন ভেসুভালা এবং দিলীপ বেদি চন্দানিও বিমানের ডানার কাছে পৌঁছে যান। কিন্তু অন্ধকারের কারণে কোথায় লাফ দেবেন তা অনুমান করতে পারছিলেন না।

এরপরই ক্রুরা জরুরি স্লাইডের মাধ্যমে যাত্রীদের বিমান থেকে বের করে আনতে শুরু করেন। সব যাত্রী উইং থেকে বের হলে ক্রু সদস্যরা আবার বিমানের ভেতরে চলে যান। সেই সময়ে গুলির শব্দ থেমে গিয়েছিল এবং তারা জানতেন না সশস্ত্র ব্যক্তিরা ঠিক কোথায়। এত কিছুর মাঝেও নিজেদের কর্তব্যে অনড় ছিলেন বিমান কর্মীরা। নীরজা ভানোত তখনও বিমানের মধ্যেই ছিলেন। যাত্রীদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য নিজের জীবনের তোয়াক্কা করেননি মিজ ভানোত এবং তার অন্যান্য সহকর্মীরা।

বিমানের ভিতরে আবার প্রবেশ করার পর মিজ ভেসুভালা এবং দিলীপ বেদি চন্দানি লক্ষ্য করেন মিজ ভানোতকে। তার শরীরের পেছনদিকে গুলি করা হয়েছিল এবং বিপুল পরিমাণে রক্তক্ষরণ হয়েছিল, তবে তার তখনও জ্ঞান ছিল। দুই সহকর্মীর কাছে সাহায্য চান মিজ ভানোত। তারা দুজনেই তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় জরুরি স্লাইডের মাধ্যমে বাইরে আনেন এবং তারপরই নিজেরা বাইরে আসেন। তার পিছনে বেরিয়ে এসেছিলেন শিরিন পবন এবং তার সহকর্মী রানী ভাসওয়ানি, যারা বিমান থেকে বেরিয়ে যাওয়া শেষ দুই জিম্মি ছিলেন।

তিনজন ছিনতাইকারী পালানোর চেষ্টা করতে গেলে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী যখন বিমানের ভিতরে পৌঁছায় তখনো মি. সাফারিনি সেখানে ছিলেন। নীরজা ভানোতের সহকর্মীরা জানান, করাচির জিন্নাহ হাসপাতালে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত তিনি বেঁচে ছিলেন। সানশাইন ভেসুভালার কথায় "নীরজাকে যদি সঠিক সময় নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হতো তাহলে সে আজও আমাদের মাঝেই থাকত।" তিনি বলেন, "বিমানবন্দরে অতি সামান্যই চিকিৎসা সুবিধা দেখেছি। ওই হাসপাতাল বিমানবন্দর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে ছিল।

নীরজাকে স্ট্রেচার ছাড়াই অ্যাম্বুলেন্সে রাখা হয়েছিল।" নীরজা ভানোত সম্পর্কে অনেক গল্প করেছিলেন তার ভাই অখিল। মিজ ভানোতের জন্ম ১৯৬৩ সালের সাতই সেপ্টেম্বর। পাঞ্জাবি পরিবারে জন্মগ্রহণ করা নীরজাকে অন্যান্যরা ভালোবেসে 'লাডো' বলে ডাকতেন। তাদের পরিবার থাকত চণ্ডীগড়ে। পরিবারে ছিলেন বাবা হরিশ ভানোত, মা রমা ভানোত এবং দুই বড় ভাই অনীশ ও অখিল। হরিশ ভানোত 'হিন্দুস্তান টাইমস'-এর সাংবাদিক ছিলেন। নীরজা ভানোত যখন ক্লাস সিক্সে পড়তেন, তখন তার বাবা মুম্বইয়ে বদলি হয়ে যান।

'বোম্বে স্কটিশ স্কুলে' পড়াশোনা করেন এবং তারপরে জেভিয়ার্স কলেজ থেকে স্নাতক হন। অখিল ভানোত জানিয়েছেন, ছেলেবেলা থেকেই তার বোন অকুতোভয় এবং একরোখা ছিলেন। বাবার মতোই নির্ভীক ছিলেন তিনি। একবার নীরজা ভানোত তার ভাই অখিলের সঙ্গে স্কুটারে চেপে কলেজে যাচ্ছিলেন। পথে এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে মারধর করছিলেন। মিজ ভানোত স্কুটার থামিয়ে গিয়ে ওই ব্যক্তিকে বাধা দিতে তার হাত চেপে ধরেন। তাকে নিরস্ত করতে চাইলে এক সময়ে ওই নারীই বিষয়টাকে স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার বলে আখ্যা দেন।

অখিল ভানোত জানিয়েছেন তা সত্ত্বেও তার বোন সেখান থেকে চলে আসতে চাননি। অখিল ভানোত অনেক কষ্টে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। নীরজা ভানোত সে সময়ে বলেছিলেন, "এই জীবন কেটে যাবে আর তুমি বুঝতেও পারবে না। আমি আমার নীতির সঙ্গে কখনো আপস করব না। সেখানে যা ঘটছিল তা আমি সহ্য করতে পারছিলাম না।" ছাত্রী থাকার সময়েই মডেলিং শুরু করেন মিজ ভানোত। তখন তার বয়স মাত্র ১৯ বছর। তিনি তার বন্ধুদের সঙ্গে কলেজের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

সেই সময়ে একটা ম্যাগাজিনের জন্য তার ছবি তোলা হয়। 'বোম্বে' নামে ওই ম্যাগাজিন 'গার্লস নেক্সট ডোর' নামে একটা নিবন্ধের উপর কাজ করছিল। ছবি প্রকাশিত হওয়ার পর বহু নামী কোম্পানির বিজ্ঞাপনের প্রস্তাব পেতে শুরু করেন তিনি। ১৯৮০-র দশকে তিনি বিভিন্ন সংস্থার জন্য প্রায় ৭০-৮০টা বিজ্ঞাপনে কাজ করেছিলেন। অখিল ভানোত জানিয়েছেন তার বোন খুব প্রাণবন্ত মানুষ ছিলেন। গান পছন্দ করতেন এবং সবসময়ে অন্যদের হাসাতেন। একবার হাসতে শুরু করলে থামানো যেত না তাকে।

পরিবারের কেউ কাঁদলে বা দুঃখ পেলে, রাজেশ খান্নার সিনেমার বিখ্যাত সংলাপ আওড়ে বলতেন, "পুষ্পা আই হেট টিয়ারস।" অর্থাৎ, পুষ্পা আমি চোখের জলকে ঘৃণা করি। তিনি রাজেশ খান্নার বড় ভক্ত ছিলেন এবং প্রায়শই তার আরেক বিখ্যাত সংলাপ আওড়ে বলতেন, "বাবুমশাই, জিন্দগি বড়ি হোনি চাহিয়ে... লম্বি নহি!" বাবার খুব কাছের ছিলেন তিনি। বাবার কথা মেনে ১৯৮৫ সালে বিয়ে করেন। বাবাকে খুশি করতেই এই সিদ্ধান্ত ছিল। বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে শারজায় যান।

অখিল ভানোতের মতে, সেখানে মাত্র দুই মাস ছিলেন। তার স্বামী যৌতুকের জন্য তাকে হেনস্থা করতেন। বিষয়টা তার জীবনে যথারীতি খুব বিরূপ প্রভাব ফেলেছিল। পরে মুম্বাইতে ফিরে এসে আবার মডেলিং শুরু করেন। নীরজা ভানোতের এক বন্ধু প্যান অ্যামে এয়ার হোস্টেসের চাকরির জন্য আবেদন করেছিলেন। ইন্টারভিউয়ের দিন তাকে সাজিয়ে দিতে এবং সঙ্গে যেতে অনুরোধ করেন ওই বন্ধু। সেদিন ওই বিমান সংস্থার সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তি মিজ ভানোতকে লক্ষ্য করেন এবং তাকেও প্যান অ্যামে চাকরির জন্য আবেদন করার পরামর্শ দেন।

নীরজাকে নির্বাচন করা হয় এবং প্রশিক্ষণ চলে। মিয়ামিতে তার প্রশিক্ষণের সময়ে তার পদোন্নতি হয়। তিনি ১৯৮৬ সালে প্যান অ্যামে যোগ দেন। যেদিন ওই বিমান ছিনতাই করা হয় সেদিন তার ওই বিমানে সপ্তম সফর ছিল। ঘটনাক্রমে সেদিন তার ছুটি ছিল। কিন্তু ডিউটিতে থাকা অন্য ক্রু সদস্য অসুস্থ হয়ে পড়েন। এর পর, নীরজাকে ডিউটিতে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল এবং তিনি রাজি হয়েছিলেন।

প্রসঙ্গত এর কিছু আগেই তিনি এমন বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রশিক্ষণ নিয়ে লন্ডন থেকে ফিরেছিলেন। সেই প্রশিক্ষণ ব্যবহারিক জীবনে কাজে লাগান তিনি। ঘটনার ঠিক আগের দিন একটা বিজ্ঞাপনের শ্যুটিং করেছিলেন। রাত আটটার দিকে বাড়িতে পৌঁছান এবং সেদিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ির সকলের সঙ্গে গল্প করেন। সেই সময়ে তার জন্মদিন নিয়ে আলোচনা হয়। নীরজা ভানোত জানিয়েছিলেন, এবার তিনি বন্ধুদের সঙ্গে নয়, পরিবারের সঙ্গে জন্মদিন কাটাবেন। "কিন্তু জন্মদিনের দিন তার মরদেহ বাড়ি এসেছিল," বিবিসিকে বলেছেন অখিল ভানোত।

১৯৮৭ সালে, ভারত সরকার নীরজা ভানোতকে তার বীরত্বের জন্য অশোক চক্র দিয়ে সম্মানিত করে। পাকিস্তান সরকার তাকে 'তামগাহ-ই-পাকিস্তান' এবং মার্কিন সরকার তাকে সাহসিকতার পুরস্কার প্রদান করে। ২০১৬ সালে, তার জীবন নিয়ে 'নীরজা' নামে চলচ্চিত্র হয়। তার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বলিউড অভিনেত্রী সোনম কাপুর। নীরজার মা রমা ভানোত অশোক চক্র গ্রহণ করতে গিয়েছিলেন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জ্ঞানী জৈল সিং তার মাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন "আপনার চোখে জল কেন?" সে সময়ে তিনি বলেছিলেন, এমন সন্তান পেয়ে তার গর্ব হচ্ছে।