বাংলাদেশে ৩১টি বেসরকারি ব্যাংকের গ্রাহকেরা গত রোববার রাত থেকে মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলতে পারেননি৷ রাশিয়ার একটি আইটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্থানীয় এক প্রতিষ্ঠানের চুক্তি থেকে সরে আসার প্রক্রিয়ায় এই জটিলতা তৈরি হয়৷ পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যস্থতায় এই সমস্যার সমাধান হয়েছে৷ রুশ প্রতিষ্ঠান ‘কম্পাস প্লাস' এর সঙ্গে বাংলাদেশে কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারী স্থানীয় পেমেন্ট প্রসেসর ‘ইনফরমেশন টেকনোলজি কনসালট্যান্টস লিমিটেড' বা আইটিসিএল এর একটি চুক্তি রয়েছে৷
সম্প্রতি এই চুক্তি থেকে সরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে আইটিসিএল৷ কী ঘটেছিল? আইটিসিএল-এর হেড অব বিজনেস মাহমুদুল হাসান শিশির ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমরা রাশিয়ান প্রতিষ্ঠান কম্পাস প্লাসের সঙ্গে ২৫ বছর ধরে কাজ করি৷ এটা ইউকেতে রেজিস্টার্ড৷ সেখান থেকে আমরা ব্রাসেলসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওপেনওয়ের পেমেন্ট প্ল্র্যাটফর্ম ‘ওয়ে-৪'তে প্রতিষ্ঠাপন করার কাজ শুরু করেছিলাম৷ কম্পাস প্লাস-এর সঙ্গে আমাদের কিছু পেমেন্ট ইস্যু ছিল৷
আমরা সফওয়্যার পরিবর্তনের এই কাজটি ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে পরবর্তী দুই দিনে করতে চেয়েছিলাম৷'' তার দাবি, ‘‘এই খবর পাওয়ার পর কম্পাস প্লাস তাদের পাওনা আদায়ের জন্য কোনো নোটিশ ছাড়াই তাদের সিস্টেম শাটডাউন করে দেয়৷ ফলে যে ব্যাংকগুলো আমাদের গ্রাহক তাদের ডিজিটাল লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়৷ গ্রাহকদের মধ্যে প্যানিক সৃষ্টি হয়৷'' মাহমুদুল হাসান শিশির বলেন, ‘‘এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করে৷ তারাই কম্পাস প্লাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে৷
ব্যাংকগুলো সাত দিনের নোটিফিকেশন দিয়েছিল পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে৷ দুই দিনেই ঠিক করা গেছে৷ আমরা এখন ধাপে ধাপে পুরনো প্ল্যাটফরম থেকে বের হয়ে নতুন প্ল্যাটফরমে যাব৷ তাদের পেমেন্ট ইস্যুও সমাধান হয়েছে৷'' তিনি বলেন, ‘‘এখানে ভয়ের কিছু নেই৷ গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট হ্যাকড হওয়া বা অন্য কিছু হওয়ার আশঙ্কা নেই৷ তবে গ্রাহকদের ভোগান্তি হয়েছে ৷ এজন্য আমরা দুঃখিত৷'' জানা গেছে, আইটিসিএল-এর কাছে কম্পাস প্লাসের পাওনা ছিল ৫ লাখ ডলার৷ আর তারা ১৫ লাখ ডলার মাইগ্রেশন ফিও দাবি করছে৷
বাংলাদেশ ব্যাংক মধ্যস্থতা করে ওই পেমেন্ট দিতে বাধ্য করার পরই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়৷ কম্পাস প্লাস শাটডাউন করার পরপরই ৪ অক্টোবর রাতে ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের এসএমএসের মাধ্যমে কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই ওই সময় থেকে পরবর্তী ১০দিন এটিএম বুথ ও ডিজিটাল ব্যাংকিং বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়৷ ফলে ৩১টি ব্যাংক ছাড়াও অন্য ব্যাংকের গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়৷ এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক সেবা প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠকে বসে ৷
সেখানে কিছু অভিজ্ঞ ব্যাংকারদেরও ডাকা হয়৷ ওই বৈঠকে উপস্থিত একজন ব্যাংকার জানান, ‘‘আইটিসিএল এবং ব্যাংকগুলোর দায়িত্বহীনতায় বাংলাদেশ ব্যাংক অসন্তোষ প্রকাশ করে৷ এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই রাশিয়ান প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করে পেমেন্ট সমস্যার সমাধান করে৷ আর সব ইস্যু শেষ করে তারপর ধাপে ধাপে প্ল্যাটফরম পরিবর্তন করবে আইটিসিল৷ তারপর রুশ প্রতিষ্ঠান তাদের সিস্টেম ওপেন করে দিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়৷ কিন্তু তাতে তিন দিন সময় লাগে৷
এই সময়ে গ্রাহকরা চরম ভোগান্তি আর আতঙ্কে ছিলেন৷'' বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘‘এটা স্পষ্ট একটা কারিগরি সমস্যা, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে এটা সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়ায় কার্ডধারীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়৷'' তিনি বলেন, ‘‘হঠাৎ সেবা বন্ধ করে দেয়ার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সদস্য ব্যাংকগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেবে৷'' কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, যে-কোনো পূর্বনির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ কাজের আগে জাতীয় গণমাধ্যম, টেলিভিশন ও সরাসরি টেক্সট মেসেজের মাধ্যমে জনসাধারণকে পর্যাপ্ত সময় আগে অবহিত করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক৷
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্টের তথ্যমতে, আইটিসিএলের সিস্টেম মাইগ্রেশনের কাজ প্রথমে অক্টোবরের শেষের দিকে হওয়ার কথা ছিল৷ রবিবার সন্ধ্যায় আইটিসিএল হঠাৎ করে কেন্দ্রীয় ব্যংককে জানায়, তাদের জরুরি ভিত্তিতে সেবাটি অফলাইনে নিয়ে যেতে হবে৷ কিন্তু পূর্বঘোষণা ছাড়া এমন গুরুত্বপূর্ণ পেমেন্ট অবকাঠামো বন্ধ করে দেওয়া রেগুলেটরি কাঠামোর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন৷
বিশ্লেষকদের কথা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির অধ্যাপক ড. এবিএম মইনুল হোসেন বলেন, ‘‘এটা লজ্জাজনক যে হঠাৎ করে ব্যাংকগুলো তাদের ডিজিটাল সেবা এক নাগাড়ে ৭-৮ দিন বন্ধের ঘোষণা দিল৷ সব সময়ই একটা ব্যাকআপ সিস্টেম রাখতে হয়৷ কোনো জরুরি প্রয়োজনে সেখান থেকে সেবা দেয়া হয়৷ কিন্তু আমাদের ব্যাংকগুলোর তা নেই৷'' ‘‘আমাদের এখানে যারা সার্ভিস দেয় তারা থার্ড পার্টি৷ তারা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে ৩০-৪০টা ব্যাংককে একসঙ্গে সার্ভিস দেয়৷
ফলে ব্যাংকগুলো কম খরচে পায়৷ একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে৷ ফলে ওই প্রতিষ্ঠান শাটডাউন করে দিলে সব ব্যাংক একসঙ্গে বিপর্যয়ের মুখে পড়ে৷ এটা একটা ভয়াবহ পরিস্থিতি৷ এর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে৷ একক কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করা যাবে না৷ আর ব্যাকআপ সিস্টেম থাকতে হবে,'' বলেন তিনি৷ ড. হোসেন বলেন, ‘‘ব্যাংকগুলো চাইলে ডিজিটাল লেনদেনের নিজস্ব সিস্টেম গড়ে তুলতে পারে৷ বাংলাদেশ ব্যাংকেরও এই সার্ভিস আছে৷
কিন্তু এতে খরচ বেশি পড়ে৷ আর এই খরচ বাঁচাতে গিয়ে গ্রাহকদের চরম দুর্ভোগে ফেলে ব্যাংকগুলো৷'' তথ্যপ্রযুক্তিবিদ তানভীর হাসান জোহা বলেন, ‘‘আসলে রুশ প্রতিষ্ঠান তাদের সিস্টেম বন্ধ করে দিয়ে পাওনা আদায়ের চেষ্টা করেছে৷ এখানে ম্যালওয়্যার বা সিস্টেমে কারুর ঢুকে যাওয়ার আশঙ্কা নেই৷ কিন্তু গ্রাহকদের তো ভোগান্তি হয়েছে৷ তাদের মধ্যে তো আতঙ্ক তৈরি হয়েছে৷'' ‘‘এইসব ক্ষেত্রে যদি সব লেনদেন এনক্রিপ্টেড থাকে তাহলে অর্থ লোপাট বা অন্য কোনো ধরনের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই৷
কিন্তু সেটা না হলেও আমাদের ভয়াবহ ক্ষতি হতে পারে,'' বলেন তিনি৷ তানভীর হাসান জোহা বলেন, ‘‘আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো যদি দায়িত্বশীলতার পরিচয় না দেয় তাহলে এরকম আরো সিস্টেম শাটডাউনের ঘটনা ঘটতে পারে৷'' তিনি বলেন, ‘‘সমস্যা হলো আমরা আমাদের পেমেন্ট গেটওয়ের জন্য ভারতসহ আরো কয়েকটি দেশের প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল৷ তাদের সঙ্গে চুক্তি করে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকসহ আর্থিক খাতে এই সেবা দেয়৷
ফলে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো কারণে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে চাপ দিতে চাইলে সার্ভিস শাটডাউন করে দিতে পারে৷ তখন আমাদের কিছু করার থাকে না৷ তাই এই ধরনের গেটওয়ে আমরাই তৈরি করতে পারি কীনা সেই উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন৷'' সাইবার সিকিউরিটি অ্যানালিস্ট এবং ‘অ্যামনেসিস প্রাইভেট লিমিটেডের' সিইও জেনিফার আলম বলেন, ‘‘এখানে সমস্যাটি হয়েছে চুক্তি নিয়ে৷ বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান চুক্তির শর্ত না মানায় এই জটিলতা হয়েছে৷
রাশিয়ান যে প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হচ্ছে তারা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে তাদের সেবা দিচ্ছে বিশ্বের অন্যদেশেও৷ এখন তাদের সঙ্গে লেনদেন শেষ না করে আইটিসিএল আরেকটি প্ল্যাটফরমে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করায় তারা শাটডাউন করে দেয়৷ এখানে কার কী দায়-দায়িত্ব তা চুক্তির শর্ত দেখলে বোঝা যাবে৷ কিন্তু গ্রাহকদের ভোগান্তিতে ফেলা খুবই অন্যায়৷ এটা আস্থার সংকট তৈরি করে৷'' ব্যাংকার মামুন রশীদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘পেমেন্ট সুইচ খুবই সেনসেটিভ ও গুরুত্বপূর্ণ৷
এটার জন্য দেশের বাইরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের চুক্তি হয়৷ এই চুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি বিস্তারিত গাইডলাইন থাকা দরকার৷ এটা বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের সঙ্গে যৌথভাবে করা যায়৷'' তার মতে, ‘‘ওই ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি হস্তক্ষেপ না করলে পরিস্থিতি আরো জটিল হতো৷ আইনি প্রক্রিয়ায় গেলে অনেক সময় লাগত৷ গ্রাহকদের ভোগান্তি বাড়ত৷
আর এখন এব্যাপারে গাইডলাইন না করলে ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা আবারো ঘটতে পারে৷'' এশিয়া প্যাসিফিক নেটওয়ার্ক ইনফরমেশন সেন্টারের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য সুমন আহমেদ সাবির বলেন, ‘‘চুক্তির মাধ্যমেই সারা দুনিয়ায় পেমেন্ট গেটওয়েগুলো কাজ করে৷ এখন চুক্তি যাই হোক গ্রাহকদের ভোগান্তির মধ্যে ফেলা যাবে না৷ যদি কোনো প্রতিষ্ঠান তার পাওনা আদায়ে সিস্টেমে ম্যালওয়ার ঢুকিয়ে দেয় বা সিস্টেমকে শাটডাউন করে দেয় তাতো গ্রাহকদের প্রতি অন্যায়৷ কিন্তু দেখতে হবে এর জন্য দায় কার৷ চুক্তির কোনো শর্ত ভঙ্গ হয়েছে কী না৷''


পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য সরাসরি প্রকাশিত হবে। অনুপযুক্ত মন্তব্য প্রশাসক সরিয়ে দিতে পারেন। ব্যক্তিগত বা গোপন তথ্য লিখবেন না।
এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মন্তব্যটি লিখুন।
মন্তব্য লিখুন