আফগানিস্তানে তালেবানকে দীর্ঘদিন সমর্থন দিয়ে এসেছে পাকিস্তান৷ কিন্তু এখন তালেবান-শাসিত প্রতিবেশী দেশেই বোমা হামলা চালাচ্ছে তারা৷ একসময়ের পরম মিত্ররা কেমন করে চরম ‘শত্রু' হলো? দুই দশের মধ্যে শান্তি ফেরানোর আলোচনা কেন ব্যর্থ হচ্ছে বারবার? গত বৃহস্পতিবার রাতে আফগানিস্তানের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান৷ হামলার ক্ষয়-ক্ষতি নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া যাচ্ছে৷ তালেবানের দাবি, হামলায় নারী ও শিশুসহ ৯ থেকে ১০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন৷ অন্যদিকে পাকিস্তান বলছে, হামলায় ২২ জন জঙ্গি নিহত হওয়ার পাশাপাখি অস্ত্র ও গোলাবারুদের গুদাম ধ্বংসও হয়েছে৷
মাঝে কয়েক মাস শান্ত থাকলেও সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে দু দেশের মধ্য উত্তেজনা আবার বাড়ছে৷ প্রায় নিয়মিতই চলছে হামলা-পাল্টা হামলা৷ এই দফায় শুরুটা করেছিল আফগানিস্তান৷ সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় হামলাটি হয় গত ১৮ সেপ্টেম্বর৷ পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কোহাট শহরের একটি পুলিশ কম্পাউন্ডে চালানো সেই হামলায় ৩১ জন নিহত ও শতাধিক মানুষ আহত হন৷ হামলার দায় স্বীকার করেছিল তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-র একটি গোষ্ঠী৷ তবে পাকিস্তান সরকার মনে করে, টিটিপি-কে নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছে আফগানিস্তান৷ আফগানিস্তান এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে৷
সীমান্তে সংঘর্ষ চলতে থাকার এক পর্যায়ে আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালায় পাকিস্তান৷ পাকিস্তানের টিটিপি এবং আফগানিস্তানের তালেবান ভিন্ন দুটি সংগঠন৷ তবে আফগান তালেবানের সঙ্গে টিটিপির আদর্শিক ও সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্কটা ঘনিষ্ঠ৷ আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ওআন্তর্জাতিক বাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সময় টিটিপি-র অনেক যোদ্ধা তালেবানের পক্ষে অস্ত্র হাতে নিয়েছিল৷ ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর তাই টিটিপি আরো বেশি সুযোগ-সুবিধা এবং প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায়৷ এর ফলে পাকিস্তানের একসময়ের মিত্র আফগানিস্তান দ্রুতই বড় ধরনের হুমকি হয়ে ওঠে৷ তালেবান সরকারকে টিটিপি র বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছিল পাকিস্তান ৷
কিন্তু তাকে কোনো কাজ হয়নি৷ বন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর কনফ্লিক্ট স্টাডিজ (বিআইসিসি)-এর পরিচালক কনরাড শেটার মনে করেন, ‘‘ব্যক্তিগত পর্যায়ের যোগাযোগ ও নেটওয়ার্কের কারণে আফগান তালেবানের পক্ষে তাদের (টিটিপি-র) সঙ্গ ত্যাগ করা খুব কঠিন৷'' তার মতে, টিটিপি-র ওপর তালেবানের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই৷ কাবুল ও বার্লিনভিত্তিক থিংক-ট্যাঙ্ক আফগানিস্তান অ্যানালিস্টস নেটওয়ার্ক-এর ডেপুটি ডিরেক্টর টমাস রুটিগ বলেন, ‘‘তালেবান কোনোভাবেই ইসলামাবাদের নির্দেশ মানতে প্রস্তুত নয়৷ তারা বাইরের কাউকে কোনো হস্তক্ষেপ করতে দেবে না৷'' পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের চলমান সংঘাতে পুরোনো একটি সংঘাতেরও প্রভাব রয়েছে৷
১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ ভারত ও আফগানিস্তানের মধ্যে প্রভাব বলয় নির্ধারণের লক্ষ্যে ‘ডুরান্ড লাইন' টানা হয়েছিল৷ ব্রিটেনের এক কূটনীতিক এবং আফগানিস্তানের এক আমিরের উদ্যোগে এই সীমানা রেখা টানা হয়৷ আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের বর্তমান সীমান্তও ডুরান্ড লাইন অনুসরণ করে নির্ধারিত৷ এই সীমান্তটি পশতুনদের আদি নিবাসকে দ্বিখণ্ডিত করেছে৷ পশতুনরা আফগানিস্তানের বৃহত্তম এবং পাকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী৷ সুতরাং এখানকার সীমান্ত বিরোধ শুধু ভূখণ্ডগত নয়, বরং এর সঙ্গে জাতিগত পরিচয়েরও সম্পর্ক রয়েছে৷
(বিআইসিসি)-এর পরিচালক কনরাড শেটার ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এই সংঘাতে জাতিগত ও জাতীয়তাবাদী উপাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে৷'' অনেক পশতুনই এখনো ডুরান্ড লাইনের মাধ্যমে সৃষ্ট এই সীমান্তকে মেনে নিতে রাজি নয়৷ এছাড়া ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বৈরিতাও চলমান সংকটে পরোক্ষ ভূমিকা রাখছে৷ আফগানিস্তান বন্ধুত্বপূর্ণ হলে পাকিস্তানের জন্য সুবিধাজনক হতো; কিন্তু এখন ভারতও তালেবানের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক জোরদার করেছে৷ ব্রিটিশ থিংক-ট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউস-এর একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ‘‘ভারতের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইসলামাবাদ একসময় আফগানিস্তানকে ‘কৌশলগত গভীরতা'-র উৎস হিসেবে বিবেচনা করলেও এখন তারা তাদের এই উত্তর-পশ্চিমের প্রতিবেশীকে ক্রমশ একটি বোঝা বা দায় হিসেবেই দেখছে৷'' তবে আফগানিস্তানের ওপর এখনো পাকিস্তানের প্রভাব রয়েছে৷
স্থলবেষ্টিত দেশ হওয়ায় আফগানিস্তানকে প্রতিবেশী দেশগুলোর, বিশেষ করে পাকিস্তানের বাণিজ্য পথের ওপর নির্ভর করতে হয়৷ তালেবান সরকার পাকিস্তানের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশীদার খোঁজার চেষ্টা করলেও পাকিস্তান সীমান্ত বন্ধ রাখা ও বাণিজ্য বিধিনিষেধ আরোপের মাধ্যমে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে৷ বাণিজ্য ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো এখন একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত৷ পাকিস্তান টিটিপি-র সঙ্গে আলোচনা করেছে পাকিস্তান৷ সে আলোচনায় মধ্যস্থতা করেছিল তালেবান ৷ যুদ্ধবিরতির বিষয়েও সমঝোতা হয়েছিল৷ এর পাশাপাশি পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যেও আলোচনা হয়েছে৷
কিন্তু কোনো সাময়িক সমঝোতাই কীভাবে আফগান ভূখণ্ড থেকে পাকিস্তানে হামলা চালানো প্রতিরোধ করা যায় – গুরুত্বপূর্ণ এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি৷ তাই কূটনীতির পাশাপাশি পাকিস্তান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ যেমন, সীমান্ত বন্ধ রাখা, বাণিজ্য সীমিত করা এবং আফগান শরণার্থীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর মতো পদক্ষেপের ওপরও নির্ভর করছে৷ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তালেবানরা আশঙ্কা করছে, তারা টিটিপির বিরুদ্ধে কঠোর দমন-পীড়ন চালালে গোষ্ঠীটি ইসলামিক স্টেট ইন খোরাসান প্রভিন্স ( আইএস)-র মতো অন্য কোনো চরিপন্থী এবং তালেবানবিরোধী জঙ্গি সংগনের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে৷ কার্স্টেন ক্নিপ/ এসিবি


পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য সরাসরি প্রকাশিত হবে। অনুপযুক্ত মন্তব্য প্রশাসক সরিয়ে দিতে পারেন। ব্যক্তিগত বা গোপন তথ্য লিখবেন না।
এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মন্তব্যটি লিখুন।
মন্তব্য লিখুন