রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিয়ের জন্য ইউরেনিয়াম নির্ধারিত সময়ে রাশিয়া থেকে বাংলাদেশ আসেনি। অভিযোগ উঠেছে, পাকিস্তান তাদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই ঘটনা বাংলাদেশে নানা আলোচনা-সমালোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সামজিক মাধ্যমে এ নিয়ে পোস্ট দিতেও দেখা গেছে অনেককে। প্রশ্ন উঠেছে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের ইতিবাচক সম্পর্কের পরও দেশটির কেন এমন সিদ্ধান্ত? নানা আলোচনার প্রেক্ষিতে বিবিসির সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাদের দাবি, সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক নয় বরং বিমান চলাচল সংক্রান্ত কারিগরি ও পদ্ধতিগত বিষয়। তবে, নির্ধারিত সময়ে ইউরেনিয়াম এর সরবরাহ না পাওয়ায় রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প থেকে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া আরও পিছিয়ে গেলো কিনা, এমন প্রশ্ন সামনে আসছে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি এই ঘটনা নিয়ে বাড়তি আলোচনা তৈরি করেছে বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ এমন একটি সময়ে এই ঘটনা ঘটলো যখন জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে বিদ্যুতের যোগান নিয়ে বেশ জটিলতায় পড়েছে বাংলাদেশ। দেশজুড়ে বাড়তি লোডশেডিং এর ফলে বেশ চাপে রয়েছে সরকার। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ এর সংকট মেটাতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কম সময়ের মধ্যেই জাতীয় গ্রিডে যোগ করতে চাইছে বাংলাদেশ। তবে কারিগরী সমস্যা এবং নির্ধারিত সময়ে ইউরেনিয়ামের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায়, এর উৎপাদন প্রক্রিয়া আরও পিছিয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদিও ইউরেনিয়াম সরবরাহের পরবর্তী সময়সূচি নিয়ে এরই মধ্যে একটি বিবৃতি দিয়েছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি কমিশন বা রোসাটম। বিশ্বব্যাপি পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহন অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং বিশেষ প্রটোকলের বিষয়।
আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, পারমাণবিক পদার্থ বহনকারী ফ্লাইটের জন্য প্রতিটি দেশের কাছ থেকে আলাদা করে ডিপ্লোম্যাটিক ওভারফ্লাইট ক্লিয়ারেন্স নিতে হয়। রোসাটম সূত্রে জানা গেছে, আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি সময়মতো না পাওয়ায় রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের জন্য ইউরেনিয়াম সরবরাহের ফ্লাইটসূচি বাতিল করতে হয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের নাম উল্লেখ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। এর ফলে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের যে ইতিবাচক ধারা তৈরি হয়েছে, সেটি নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। প্রশ্ন উঠেছে - কেন পাকিস্তান এমন সিদ্ধান্ত নিল? বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশে আলোচনা-সমালোচনা ও বিতর্কের প্রেক্ষাপটে, পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে এবিষয়ে জানতে চেয়েছিল বিবিসি উর্দু। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিয়ম এবং বেসামরিক বিমান চলাচল প্রটোকলের সাথে সংগতি রাখার বিষয়টিকে, দেশটির আকাশসীমা ব্যবহারের ক্লিয়ারেন্স না দেওয়ার কারণ হিসেবে সামনে এনেছেন মি. হায়দার।
বিবিসিকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার জানিয়েছেন, "পাকিস্তান আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নিয়মের প্রতি প্রতিশ্রুতি বজায় রাখে এবং আমাদের প্রতিষ্ঠিত নির্দেশিকা ও বেসামরিক বিমান চলাচল প্রটোকলের সাথে সম্পূর্ণ সংগতি রেখে, একটি মানসম্মত সময়ের মধ্যে কূটনৈতিক ফ্লাইট এবং ওভারফ্লাইট ক্লিয়ারেন্সের সমস্ত আবেদন প্রক্রিয়া করে থাকে।" বিমান চলাচলের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং কারিগরি কারণে ফ্লাইটসূচি পরিবর্তন হতে পারে বলেও জানান তিনি।
"বিষয়টি ফ্লাইট রুট এবং আকাশসীমা অনুমোদনের সাথে সম্পর্কিত কারিগরি ও পদ্ধতিগত ব্যবস্থার সাথে জড়িত। যার জন্য মাঝেমধ্যে সংশ্লিষ্ট বিমান চলাচল ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে এবং এর ফলে ফ্লাইটসূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে," বলেও লিখিন বিবৃতিতে জানান মি. হায়দার। বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে, বিষয়টিকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে বরং কারিগরি ও পদ্ধতিগত জটিলতা হিসেবেই উল্লেখ করেছেন তিনি।
বিবিসিকে তিনি বলেন, "বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে পাকিস্তান অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে। তাই এই বিষয়টিকে এর সঠিক কারিগরি প্রেক্ষাপটে দেখা সঠিক হবে এবং কোনো প্রতিবেদন বা বর্ণনার প্রতি অপ্রয়োজনীয় গুরুত্ব না দেওয়াই সমীচীন হবে না যা কিনা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে খাটো করে দেখতে পারে।" অর্থাৎ পাকিস্তানের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং কারিগরি ও পদ্ধতিগত জটিলতা।
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন রাশিয়ার ঋণ ও কারিগরি সহায়তায় রূপপুরে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে বাংলাদেশ। এই প্রকল্পে প্রতিটি ইউনিটের ক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। রাশিয়ার সঙ্গে প্রাথমিক চুক্তি অনুযায়ী ২০২৩ সালে প্রথম ইউনিট থেকে উৎপাদন শুরু করার কথা ছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ইউনিটের জন্য প্রয়োজনীয় পারমাণবিক জ্বালানি ২০২৩ সালেই বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছিল।
কিন্তু করোনা ভাইরাস মহামারি এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সরবরাহ চেইনে জটিলতা এবং আর্থিক লেনদেনের সমস্যা তৈরি হওয়ায় এর বাস্তবায়ন পিছিয়ে যায়। এছাড়া বাংলাদেশে পাঁচই অগাস্ট গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নে এক ধরনের ধীরগতি ছিল বলেও সমালোচনা আছে। চলতি বছরের এপ্রিলে রূপপুরের প্রথম ইউনিটের চুল্লিপাত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে জ্বালানি বা ফুয়েল লোডিং শুরু হলেও বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন এখনও শুরু করা যায়নি। ঘোষণা ছিল, সেপ্টেম্বর থেকে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেপ্টেম্বরে বিদ্যুৎ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই এবং এ বছরেও পাওয়া যাবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছিলেন যে, পারমাণবিক চুল্লির পাইলট-অপারেটেড রিলিফ ভালভ নামে একটি যন্ত্রে সমস্যা দেখা দেওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।
"রূপপুরে ভালভের এই জটিলতার বিষয়টি ছিল অপ্রত্যাশিত। এটাকে বলা হয় পিওআরভি ভালভ। এইটা আমাদের প্রবলেমটা করছে। আমাদের বিজ্ঞানী ও রাশিয়ান বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন," বিবিসি বাংলাকে জানান তিনি। এবার এই বিদ্যুৎ প্রকল্পের দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানিও নির্ধারিত সময়ে আনা সম্ভব হয়নি। ফলে সব মিলিয়ে বাণিজ্যিক উৎপাদন আরও পেছানোর শঙ্কা তৈরি হলো। যদিও ইউরেনিয়াম সরবরাহ বিলম্বিত হওয়ার পর, এ নিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে রোসাটম। যেখানে বলা হয়েছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে এবং এটি ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। চুক্তির শর্তাবলী এবং প্রকল্পের সময়সূচি অনুযায়ী এই জ্বালানি বেশ কয়েকটি ফ্লাইটের মাধ্যমে পরিবহন করা হবে বলেও জানিয়েছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি কমিশন।
অর্থাৎ সেপ্টেম্বরে যে চালানটি আসার কথা ছিল, তা এখন অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে কয়েক ধাপে আসবে। এই বিলম্বের ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটলো যখন দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এলএনজি আমদানি কমে যাওয়া এবং বকেয়া বিলের কারণে অনেক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় দেশজুড়ে লোডশেডিং বেড়েছে। সরকার আশা করছিল, রূপপুর থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে এই সংকট অনেকটাই কমবে এবং ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমে আসবে। কিন্তু প্রথম ইউনিটের ভালভ জটিলতা এবং দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি আসতে দেরি হওয়ায়, পুরো বিষয়টি নিয়েই উদ্বেগ বাড়লো। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি অক্টোবর-ডিসেম্বরে এলে এবং সব পরীক্ষা সফল হলে ২০২৭ সালের মাঝামাঝির আগে দ্বিতীয় ইউনিট থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন সম্ভব হবে না।


পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য সরাসরি প্রকাশিত হবে। অনুপযুক্ত মন্তব্য প্রশাসক সরিয়ে দিতে পারেন। ব্যক্তিগত বা গোপন তথ্য লিখবেন না।
এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মন্তব্যটি লিখুন।
মন্তব্য লিখুন