সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে এক যুবককে কারাগারে পাঠানো হয়েছে৷ একই অভিযোগকে কেন্দ্র করে রংপুরের পীরগঞ্জে হিন্দু সম্প্রদায়ের তিনটি বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে উপজেলার একটি গ্রাম থেকে কৃপেশ রায় নামের এক যুবককে আটক করা হয়৷ রাতে তার বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ। আজ মঙ্গলবার সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। কৃপেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ধর্ম অবমাননামূলক পোস্ট দিয়েছেন৷ তবে যে নাম ও আইডি থেকে পোস্টটি করা হয়, সেটি ভুয়া বলে আগেই থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন কৃপেশ।
সেই জিডিতে তিনি তার ও তার পরিবারের সদস্যদের ছবি দিয়ে আইডি খুলে সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক পোস্ট দেওয়ার কথা জানিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। সোমবার দুপুরে তাকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের একটি গ্রামের বাসিন্দা এই যুবক আগে পুলিশের কনস্টেবল ছিলেন। তাকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ফারুক আহমদ ডয়চে ভেলের কন্টেন্ট পার্টনার প্রথম আলোকে বলেন, ওই যুবক সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কনস্টেবল হিসেবে চাকরি করতেন। দীর্ঘদিন অনুমতি না নিয়ে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র উল্লেখ করে প্রথম আলো জানায়, রোববার (২৫ অক্টোবর) একটি ফেসবুক আইডি থেকে ধর্ম অবমাননামূলক একটি পোস্ট দেওয়া হয়। এটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে গতকাল দুপুরে গ্রামে উত্তেজনা দেখা দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ গ্রামে গিয়ে কৃপেশকে আটক করে। পুলিশ তাকে নিয়ে নৌকায় ওঠার সময়ে পেছন থেকে কিছু কিশোর-তরুণ ঢিল ছোড়েন এবং তাকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এরপর পুলিশ তাকে দ্রুত থানায় নিয়ে যায়। এ ঘটনার পর তাহিরপুর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. জুনাব আলী, মেহেদী হাসানসহ অন্যরা গ্রামে গিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে বৈঠক করেন। তারা এলাকাবাসীকে শান্ত থাকার অনুরোধ করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ধর্ম অবমাননামূলক ভিডিও পোস্ট করার অভিযোগকে কেন্দ্র করে রংপুরের পীরগঞ্জে হিন্দু সম্প্রদায়ের তিনটি বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল সোমবার রাতে উপজেলার একটি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর ধর্ম অবমাননার অভিযোগে একটি এবং হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় আটজনের নাম উল্লেখ করে আরেকটি মামলা করা হয়েছে। পরে অভিযান চালিয়ে পৃথক দুই মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজমুল হক বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রকে উদ্ধৃত করে ডয়চে ভেলের কন্টেন্ট পার্টনার প্রথম আলো জানায়, সম্প্রতি একটি ফেসবুক আইডি থেকে ধর্ম অবমাননামূলক একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়লে পীরগঞ্জে উত্তেজনা দেখা দেয়।
একপর্যায়ে গতকাল রাতে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগ ওঠা ব্যক্তির বাড়িতে যায় একদল লোক। একপর্যায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির বাড়িসহ হিন্দু সম্প্রদায়ের তিনটি পরিবারের বাড়িঘরে ভাঙচুর করা হয়। হামলাকারীরা ঘরের ভেতরে ঢুকে আসবাবসহ বিভিন্ন মালামাল তছনছ করে। এ সময় দুটি টেলিভিশন ভাঙচুরের পাশাপাশি রান্নাঘর ও অন্যান্য স্থাপনার ক্ষতি করা হয়। হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত এক ব্যক্তি প্রথম আলোকে বলেন, সন্ধ্যায় একদল লোক এসে তাদের বাড়ি-ঘরে হামলা চালায়। এ সময় তিনটি ছাগল ও ঘরের আসবাব লুট করে নিয়ে যায়। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ক্ষতিগ্রস্ত আরেক জন বলেন, ‘‘মাগরিবের আজানের পরের ঘটনা। তখন কারেন্ট (বিদ্যুৎ) ছিল না।
অন্ধকারে হঠাৎ একদল লোক হই-হুল্লোড় করে আমাদের বাড়িতে হামলা চালায়। কী ঘটনা, কিছুই বুঝতে পারি নাই। দৌড়ে পালায় গেছি। দেশে তো আইন আছে, হামলা করবে কেন? আমাদের বাড়ি-ঘর ভাঙবে কেন? আমাদের কী অপরাধ?'' এ ঘটনায় গতকাল রাতে থানায় ভুক্তভোগী এক ব্যক্তি মামলা করেছেন। মামলায় আটজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ৬০ থেকে ৭০ জনকে আসামি করা হয়েছে। পরে আজ মঙ্গলবার ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে শফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার বাড়ি উপজেলার গুজিপাড়া এলাকায়। অন্যদিকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে উপজেলার মকিমপুর গ্রামের আমিনুল ইসলাম দফাদার বাদী হয়ে রাতে থানায় আরেকটি মামলা করেন। মামলায় এক যুবককে আসামি করা হয়।
মামলার পর গতকাল সোমবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার একটি গ্রামে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। ঘটনার পর গতকাল রাতে রংপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, জেলা পরিষদের প্রশাসক সাইফুল ইসলাম, পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল্লাহ আল বাকিউল বারীসহ স্থানীয় বিএনপির নেতারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তারা ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন এবং এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। আজ মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে রংপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘‘আইন হাতে নিয়ে বাড়ি-ঘর ভাঙচুর করা বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
যারাই এ ঘটনা ঘটাক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। ইতিমধ্যে আমরা কাজ শুরু করেছি। এ ঘটনায় দুটি পৃথক মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কেউ যাতে অপ্রীতিকর কিছু ঘটাতে না পারে, সে জন্য বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।'' পীরগঞ্জ থানার ওসি নাজমুল হক বলেন, ‘‘খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা ঘটনাস্থলে ছুটে যাই। ধর্ম অবমাননার ঘটনায় একটি মামলা ও এটিকে কেন্দ্র করে বাড়ি-ঘরে হামলার ঘটনায় আরেকটি মামলা হয়েছে। পৃথক দুটি মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।'' এসিবি/ এডিকে (প্রথম আলো, ডয়চে ভেলে)


পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য সরাসরি প্রকাশিত হবে। অনুপযুক্ত মন্তব্য প্রশাসক সরিয়ে দিতে পারেন। ব্যক্তিগত বা গোপন তথ্য লিখবেন না।
এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মন্তব্যটি লিখুন।
মন্তব্য লিখুন