বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দফায় দফায় পিটুনিতে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৩৮) নামের এক যুবক নিহত হয়েছেন৷ প্রথম দফায় পিটুনির পর তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে পুলিশ৷ রাতে সেখান থেকে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে দ্বিতীয় দফায় মারধর করা হয়৷ অবস্থার অবনতি হলে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান৷ ডয়চে ভেলের কন্টেন্ট পার্টনার প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে শামীমকে মারধরের খবর পেয়ে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায় পুলিশ৷

রাত ৮টা ৪০ মিনিটে একদল লোক হাসপাতালে ঢুকে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে আবার মারধর করেন৷ পরে সাতক্ষীরায় নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়৷ নিহত শামীম দেবহাটা উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের বাসিন্দা৷ ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে ভালুকার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের ডুবালিয়াপাড়া এলাকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পাইওনিয়ার নিটওয়্যার্স (বিডি) লিমিটেড কারখানার কর্মী দীপু চন্দ্র দাস কে ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়৷

পরে কারখানা থেকে এক কিলোমিটার দূরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভাজকের একটি গাছে ঝুলিয়ে মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়৷ এরপর গত ১১ এপ্রিল মাসে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীমকে পবিত্র কোরআন সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়৷ জানা গেছে, ঘটনার সূত্রপাত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি অডিও কথোপকথনকে কেন্দ্র করে৷ স্থানীয় বাসিন্দা খায়রুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, শামীমের কয়েকটি অডিও কথোপকথন ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে৷ সেসব কথোপকথনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে—এমন মন্তব্য শোনা যায় বলে তিনি অভিযোগ করেন৷ এ নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে৷ তবে শামীমের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, কয়েক দিন ধরে শামীম অস্বাভাবিক আচরণ করছিলেন৷ তাদের ভাষ্য, শামীম মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন না৷ কয়েক দিন আগে তিনি বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন৷

দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল বিকেল সাড়ে চারটার দিকে স্থানীয় লোকজন এক ব্যক্তিকে আটকে রেখে মারধর করছেন—এমন খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ৷ পরে তাঁকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়৷ স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ ছিল, শামীম ধর্ম অবমাননা করেছেন৷ ওসি আরো বলেন, রাত ৮টা ৪০ মিনিটে দুই থেকে আড়াই শ লোক হাসপাতালে গিয়ে শামীমকে চিকিৎসা দিতে বাধা দেন৷

পুলিশ, আনসার সদস্য ও চিকিৎসকেরা বাধা দিলেও তাঁরা শোনেননি৷ একপর্যায়ে পেছনের দরজা ভেঙে ওয়ার্ডে ঢুকে তাঁকে ছিনিয়ে নিয়ে মারধর করা হয়৷ পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে৷ আজ বুধবার সকালে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রথম দফায় মারধরের পর শামীমকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল৷ রাতে শতাধিক ব্যক্তি হাসপাতালে এসে অন্য রোগীদের সামনে ওয়ার্ডের ভেতরে তাকে মারধর করেন৷

একপর্যায়ে তাকে টেনে-হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে আবার মারধর করা হয়৷ এতে অবস্থার অবনতি হলে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়৷ সেখানে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়৷ এ ঘটনার কয়েকটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে৷ একটি ভিডিওতে দেখা যায়, শামীম মাটিতে পড়ে আছেন৷ তাকে ঘিরে অনেক মানুষ ভিড় করেছেন৷ কয়েকজন মুঠোফোনে ভিডিও করছেন৷ আরেকটি ভিডিওতে রাতে দেবহাটা উপজেলা সদরে একদল মানুষকে মিছিল করে শামীমের শাস্তির দাবিতে স্লোগান দিতে দেখা যায়৷ মিছিল থেকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়৷ ভিডিওতে লোকজনকে শামীম যে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, সেখানে যাওয়ার আহ্বান জানাতেও শোনা যায়৷ এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি এইচ এম শাহীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘‘অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে৷'' এসিবি/ জেডএইচ (প্রথম আলো, ডয়চে ভেলে)