প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে সারা ভারতের বিভিন্ন প্রতিবাদ আন্দোলনের মূল কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরিচিত দিল্লির যন্তর-মন্তর এখন আর বিক্ষোভ-প্রদর্শনের জন্য নির্ধারিত স্থান থাকবে না বলে ঘোষণা করেছে নরেন্দ্র মোদীর সরকারের অধীন দিল্লি পুলিশ। এখন যন্তর মন্তরের পরিবর্তে দিল্লির অন্য তিনটি জায়গাকে বিক্ষোভ দেখানোর জন্য নির্ধারিত করে দিয়েছে তারা। সেগুলো হলো রামলীলা ময়দান, বুরারি ময়দান ও পূর্ব দিল্লির সিবিডি ময়দান। সরকারের এই সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এসেছে, যখন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) যন্তর-মন্তরে অবস্থান-বিক্ষোভের অনুমতি চেয়ে সোমবার পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার দ্বারস্থ হয়।

ঠিক এর আগেই সোমবার, ১২ই অক্টোবর দিল্লির পুলিশ কমিশনারের পক্ষ থেকে জারি করা এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছিল যে যন্তর-মন্তরকে বিক্ষোভের জন্য নির্ধারিত স্থানের তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্তকে 'অগ্রহণযোগ্য' বলে উল্লেখ করে সিজেপি এটিকে "মানুষের প্রতিবাদ করার এবং শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করার মৌলিক অধিকারের ওপর আঘাত" বলে বর্ণনা করেছে। সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস বলেছেন, যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়ার জন্য তারা দিল্লি পুলিশকে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছেন।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার 'বিশেষ নিবিড় সংশোধন' বা এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে গত দোসরা অক্টোবর থেকে যন্তর মন্তর কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। গত ১০ই অক্টোবর সিজেপির বিক্ষোভের পর বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের শুনানিতেও ওঠে। সেখানে আবেদনকারীরা দাবি করেন, নির্ধারিত স্থানে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করার অনুমতি দেওয়া উচিত। এর আগে সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষা বা 'নিট'-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অপসারণের দাবিতে যন্তর-মন্তরে ব্যাপক জনসমাগম হয়েছিল।

২০শে জুলাই সংসদ অভিমুখে মিছিলে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে বড় ধরনের সংঘর্ষ এবং সহিংসতাও ঘটে। এবার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপি আন্দোলনের ঘোষণা দেয় এবং বামপন্থি ছাত্র সংগঠন ও বিরোধী জোট 'ইন্ডিয়া' দোসরা অক্টোবর থেকে ১০ই অক্টোবর পর্যন্ত আন্দোলন চালানোর কথা জানায়। এর পরই যন্তর-মন্তর পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। গত শনিবার, ১০ই অক্টোবর দিল্লি পুলিশ বিক্ষোভকারীদের যন্তর মন্তরের ত্রিসীমানাতেই ঘেঁষতে দেয়নি।

ইনস্টাগ্রামে বিবিসি বাংলা ফলো করতে ক্লিক/ট্যাপ করুন এখানে দিল্লি পুলিশ রাজধানীতে বিক্ষোভ প্রদর্শনের জন্য নতুন একটি নির্দেশিকা জারি করেছে। ১১ই অক্টোবর দিল্লি পুলিশ কমিশনার অনুরাগ কুমারের জারি করা স্ট্যান্ডিং অর্ডার অনুযায়ী, "প্রতিবাদ কর্মসূচির জন্য বিকল্প স্থান পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করেছিল। সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে।" সর্বশেষ ওই আদেশে বলা হয়েছে, কমিটি রামলীলা ময়দান, বুরারি ময়দান এবং পূর্ব দিল্লির সিবিডি ময়দানকে প্রতিবাদ কর্মসূচির নতুন স্থান হিসেবে বিজ্ঞপ্তি-ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে।

এতে আরও বলা হয়েছে, "এই তিনটি স্থানে বিক্ষোভ আয়োজনের জন্য বিস্তারিত ও সংশোধিত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) আলাদাভাবে জারি করা হবে। এটি ২৮শে এপ্রিল ২০২২-এ জারি করা পূর্ববর্তী স্ট্যান্ডিং অর্ডার নং এল অ্যান্ড ও/৪৮/২২-এর আংশিক সংশোধন।" এই নতুন তিনটি স্থানই দিল্লির ভিন্ন ভিন্ন অংশে অবস্থিত। নতুন নির্দেশিকা জারি করার ফলে প্রতিবাদ কর্মসূচিগুলো এখন সংসদ সংলগ্ন কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক এলাকা থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া হবে।

রামলীলা ময়দান দিল্লির মাঝামাঝি জায়গায়। বুরারি ময়দান উত্তর-পশ্চিম দিল্লিতে এবং সিবিডি ময়দান পূর্ব দিল্লিতে অবস্থিত। রামলীলা ময়দান যন্তর-মন্তর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে। ফলে অন্য দুটি স্থানের তুলনায় এটি যন্তর-মন্তরের সবচেয়ে কাছে। বুরারি ময়দান যন্তর-মন্তর থেকে প্রায় ২১ কিলোমিটার দূরে, আর সিবিডি ময়দান প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে। রাজনৈতিক সমাবেশ ও গণআন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে রামলীলা ময়দানের। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৭৫ সালে জয়প্রকাশ নারায়ণের ঐতিহাসিক সমাবেশ আর ২০১১ সালে আন্না হাজারের নেতৃত্বে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন।

অন্যদিকে, ২০২০ সালের কৃষক আন্দোলনের সময়ে আন্দোলনকারীদের সেখানে যেতে বলার পর বুরারি ময়দান আলোচনায় আসে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তে ককরোচ জনতা পার্টি প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে একে 'স্বৈরাচারী পদক্ষেপ' বলে উল্লেখ করে বলেছেন, "আজ মোদী যন্তর-মন্তরকে বিক্ষোভের জন্য নির্ধারিত স্থানের তালিকা থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। কাল তিনি গণতন্ত্রকেই তালিকা থেকে সরিয়ে দেবেন।" তিনি আরো বলেন, "স্বৈরশাসকের সমস্যা কখনও বিক্ষোভের স্থান কোনটি, তা নিয়ে ছিল না।

সমস্যা ছিল মানুষের প্রতিবাদ করার ধারণাটিই।" গত কয়েক দিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া বামপন্থি ছাত্র সংগঠন আইসা-র নেত্রী নেহা বোরার টিম এক্সে লিখেছেন, "আমরা আমাদের যন্তর-মন্তরের জন্য লড়ব। এটি শুধু একটি জায়গা নয়, এটি মানুষের কণ্ঠস্বর। আর আমাদের কণ্ঠস্বরকে দমন করা যাবে না।" সিজেপি-র সহ-সমন্বয়ক সৌরভ দাস এক্সে লিখেছেন, "নরেন্দ্র মোদী যন্তর-মন্তরকে কেন ভয় পাচ্ছেন? যন্তর-মন্তর ভারতের মানুষের। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কি ভারতের মানুষের সঙ্গে আলোচনা করেছে?

কোনো অংশীজনের সঙ্গে কি কথা হয়েছে? কোনো সংগঠনের পরামর্শ কি নেওয়া হয়েছে?" তিনি আরও লেখেন, "লিখে রাখুন, যেভাবে তারা মানুষের যন্তর-মন্তরকে নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলের তালিকা থেকে সরিয়ে দিচ্ছে, একইভাবে শিগগিরই গণতন্ত্রকেও ভারত থেকে সরিয়ে দেবে। এই পদক্ষেপ সেই দিকেই আরেকটি অগ্রগতি।" সৌরভ দাস বলেন, "আমরা এই খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত মেনে নেব না। এটি মানুষের প্রতিবাদ করার ও শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার মৌলিক অধিকারের ওপর আঘাত। এখন পুরো দেশই যন্তর-মন্তরে পরিণত হচ্ছে।"

সিজেপি-র আইনি শাখার প্রধান রত্না সিং এক্সে লিখেছেন, "সর্বত্রই যন্তর মন্তর গড়ে তোলার এখন পরিকল্পনা। মানুষ যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ করতে দিল্লি আসে, কিন্তু সরকার এর প্রতিক্রিয়ায় সেই স্থানটিকেই বিক্ষোভস্থলের তালিকা থেকে বাদ দিল। আগে অনুমতি নেওয়ার দোহাই দিয়ে মানুষকে ঠেকানোর খেলা চলত। এখন মানুষ যখন কণ্ঠস্বর উঁচু করার জায়গা চাইছে, তখন তাদের কাছ থেকে প্রতিবাদের জায়গাটাই কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।" সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ এক্সে লিখেছেন, "সরকার যে প্রতিবাদ কর্মসূচিগুলোকে দিল্লির প্রান্তিক এলাকায় ঠেলে দিতে চায়, তা স্পষ্ট।

বড় সমাবেশের জন্য তারা রামলীলা ময়দানেও অনুমতি দেবে না। এটি বিদ্বেষপ্রসূত এবং বেআইনি।" তিনি আরো বলেন, "বিক্ষোভের জন্য স্থান নির্ধারণ করে দেওয়ার অধিকার সরকারের নেই। শান্তিপূর্ণভাবে একত্র হওয়া এবং প্রতিবাদ করা মানুষের মৌলিক অধিকার। সরকার মানুষকে শুধু 'নির্ধারিত স্থান'-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারে না।" দিল্লির যন্তর মন্তর মূলত একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মানমন্দির। দিল্লিতে সিনিয়র সাংবাদিক ত্রিভুবন, যিনি একটি নামই ব্যবহার করেন, তিনি যন্তর মন্তরের ইতিহাস নিয়ে বিবিসির জন্য একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন।

তার মতে, ষাটের দশকের শেষ ভাগ থেকে আশির দশক পর্যন্ত 'বোট ক্লাব' ছিল ভারতের গণতান্ত্রিক বিক্ষোভ প্রদর্শনের প্রধান কেন্দ্রস্থল। ১৯৯৩ সালের পর রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে প্রতিবাদ কর্মসূচিগুলোকে তৎকালীন রাজপথ, বর্তমানের কর্তব্য পথ, থেকে সরিয়ে অন্যত্র নেওয়া শুরু হয়। সেই সময়ই যন্তর মন্তর একটি 'মধ্যপন্থি' সমাধান হিসেবে সামনে আসে। এটা সংসদ ভবনের বেশ কাছে অবস্থিত,আবার খুব কাছেও নয়। এটা সবার চোখের সামনে, আবার এখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেও রাখা সম্ভব।

২০০৩ সালের ৩১শে জানুয়ারি দিল্লি পুলিশের স্ট্যান্ডিং অর্ডার নম্বর ৩০৯-এর উল্লেখ করে কেন্দ্র সরকার ২০১৫ সালে লোকসভায় জানিয়েছিল, যন্তর মন্তরে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষের সমাবেশ হওয়া উচিত নয় এবং সেখানে বিক্ষোভকারীদের যানবাহন আনার অনুমতি নেই। পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার নথির ভিত্তিতে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০০৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১০ সালের অগাস্ট পর্যন্ত যন্তর মন্তরে অন্তত ১৩ হাজার ১১৮টি অবস্থান কর্মসূচি এবং পাঁচ হাজার ৪৯১টি বিক্ষোভ, সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

শুধু ২০১০ সালের প্রথম আট মাসেই সেখানে প্রায় দেড় লাখ মানুষ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন এবং আইন ভঙ্গের অভিযোগে ১২ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছিল। যন্তর-মন্তর বিশেষভাবে স্মরণীয় কয়েকটি আন্দোলনের জন্য। এর মধ্যে রয়েছে নব্বইয়ের দশকের নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন, ২০১১ সালের আন্না হাজারে আন্দোলন, ২০১২ সালের নির্ভয়া আন্দোলন, ২০১৫ সালের অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তাদের 'ওয়ান র‍্যাঙ্ক, ওয়ান পেনশন' আন্দোলন এবং ২০১৭ সালের তামিলনাড়ুর কৃষক আন্দোলন।

এরপর ২০১৭ সালের অক্টোবরেই ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ বন্ধ করে সেগুলো রামলীলা ময়দানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। মামলাটা সুপ্রিম কোর্টে যায়। ২৩শে জুলাই ২০১৮-এ 'মজদুর কিষাণ শক্তি সংগঠন বনাম ভারত ইউনিয়ন' মামলায় আদালত শান্তিপূর্ণ সমাবেশের সাংবিধানিক অধিকার এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়। আদালত বলেছিল, একটা গণতান্ত্রিক রাজধানীকে 'স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার দুর্গে' পরিণত করা যায় না; তবে "প্রতিবাদের স্বাধীনতা ও অন্য নাগরিকদের জীবনকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ব্যাহত করার লাইসেন্স হতে পারে না"।