সতর্কবার্তা: এই প্রতিবেদনের কিছু বর্ণনা কারো কারো কাছে অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। ছোট্ট বেলার এই তিন বান্ধবী আইরীন জাহান মীম, ইসরাত জাহান ইমা আর নাসরিন আক্তার মুক্তা। গত বৃহস্পতিবার একসাথে ঘুরতে গিয়েছিলেন কক্সবাজারে। উঠেছিলেন উখিয়ার ইনানী এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে। সকালের সূর্য দেখতে ঘুম থেকে ওঠার পর তিনজন একসাথেই বের হতে চেয়েছিলেন। মীম আর ইমা বাইরে বের হলেও, ঘুম থেকে উঠতে না পেরে রিসোর্টের রুমেই ছিলেন মুক্তা।
শনিবার বিকেলে আইরীন জাহান মীম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমি আর ইমা ফজরের নামাজের পর বের হওয়ার সময় মুক্তাকে ডাকলাম। ও (মুক্তা) বললো তোরা যা আমি একটু ঘুমাই। ও আর যেতে পারলো না। কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করে ফিরে আমি আর ইমা যখন রিসোর্টের সামনে পৌঁছাই তখন দেখলাম রিসোর্টটিতে আগুন জ্বলছে"। "আমরা চিৎকার দিয়ে বলছিলাম আগুন লাগছে। তখন কেয়ারটেকার দৌড়ে এসে ফায়ার এক্সটিংগুইশার দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলো। ওনাদের বললাম, আমাদের ফ্রেন্ড উপরে আছে। ভেতরে আরো অনেক লোক আছে বের করেন দ্রুত", বলছিলেন মিজ মীম।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত মুক্তাকে আর রিসোর্ট থেকে জীবিত ফেরানো যায় নি। মুক্তাসহ এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অন্তত ১০জন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসন। ওই রিসোর্টের অতিথি তালিকা দেখে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেলেও আগুনে পোড়ার কারণে মরদেহগুলোর অবস্থা এমন হয়েছে যে অনেকের পরিচয়ই শনাক্ত করা যায় নি। শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মুক্তার মরদেহ শনাক্ত করা যায়নি বলে বিবিসি বাংলাকে জানান মুক্তার স্বামী দেওয়ান ফয়সাল। সন্ধ্যায় মি. ফয়সাল বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমি বিমানে করে ঢাকা থেকে কক্সবাজার পৌঁছে এখন আমার স্ত্রী'র মরদেহ শনাক্ত করতে যাচ্ছি।
আমার বিশ্বাস অন্য কেউ না পারলেও আমি আমার স্ত্রী'কে দেখলে ঠিকই চিনতে পারবো"। এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আহত অবস্থায় সাতজনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও, এরই মধ্যে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে একজন ও উন্নত চিকিৎসার জন্য চারজন হাসপাতাল ছেড়েছে বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল। এদিকে, আগুনে পুড়ে যাওয়া ওই টুপটুপ রিসোর্টটি ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছিল বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রি.
জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ। এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসন। অগ্নিকাণ্ডের শিকার এই রিসোর্টটি কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে পাটুয়ারটেক এলাকায় কক্সবাজার টেকনাফ মেরিন-ড্রাইভ সড়কের ওপর অবস্থিত। দুই তলা কাঠামোটির একপাশে ইটের পাকা দেয়াল এবং বাকিটা কাঁঠ, বাঁশ ও টিন দিয়ে তৈরি। আইরীন জাহান মীম বিবিসি বাংলাকে জানান তিনি যখন সকাল ছয়টার পরে রিসোর্ট থেকে হাঁটতে বের হয়েছিলেন তখনও সবকিছু স্বাভাবিক ছিল।
তারা যখন ফিরে এসেছেন রিসোর্টের সামনে তখন দেখেছেন আগুন একটু একটু করে ছড়াচ্ছে। মিজ মীম বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "আগুন কখন লেগেছে সেটি আমরা নিশ্চিত নই। তবে এসে আগুন দেখে যখন ফায়ার সার্ভিসকে আমার ফোন থেকে ফোন দিয়েছি তখন সকাল ৭ টা ১৮ বাজে। ফায়ার সার্ভিসকে ফোন দেওয়ার পর রিসোর্টের কেয়ারটেকার ফায়ার এক্সটিংগুইশার দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করছিল"। তার ভাষ্যমতে, এই আগুন নিয়ন্ত্রণের জন্য যখন চেষ্টা করছিলেন কেয়ারটেকার তখনই প্রথমে একটি বড় বিস্ফোরণ এবং আরো কয়েকটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। তখন আগুন চারদিকে আরো ছড়িয়ে পড়ে।
"হঠাৎ যখন বিস্ফোরণ ঘটলো আমরা (ইমা ও মীম) দৌড়ে সরে গেলাম। আমরা তখন মুক্তাকে ডাকছিলাম। কিন্তু ওপরের অংশ পুরোপুরি গ্লাস ও কাঠে আটকানোর কারণে ভেতরে শব্দ যাচ্ছিল না। ইমা তখন বার বার মুক্তাকে ফোন দিচ্ছিল কিন্তু মুক্তা তখন ফোন ধরছিলো না। আমরা তখন চিৎকার করছিলাম"। "হঠাৎ দেখলাম আমাদের পাশের রুম থেকে একটা আপু লাফ দিছে গ্লাস ভেঙে। গ্লাসের আশপাশে কাউকে দেখতে পাই নাই। সাউন্ডপ্রুফ ছিল এজন্য বাইরে থেকে ভেতরে কোন শব্দ যাচ্ছিল না"।
এই সময় কিসের বিস্ফোরণ ঘটেছে সেটি সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত নয় মীম। তিনি বলছিলেন, "ওখানে গ্যাসের কিছু সিলিন্ডার ছিল। কিছু পাত্রে তেল ছিল। অনেক জোরে জোরে ব্লাস্ট হচ্ছিল। আমরা বার বার চিৎকার করে বলছিলাম মানুষগুলোকে বের করেন, মানুষগুলোকে বাঁচান"। ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে সকাল সোয়া আটটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে সেখান থেকে আহত ও নিহতদের উদ্ধারের কাজ শুরু করে ফায়ার সার্ভিস। বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন টুপটুপ রিসোর্টটিতে মোট নয়টি কক্ষ ছিল বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে।
এই দুর্ঘটনার পর ওই রিসোর্টের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয় বলেও বিবিসি বাংলাকে জানান উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমরা অন্তত ১৮ জন সেখানে ছিল বলে তথ্য পেয়েছি। যার মধ্যে ১০ জন নিহত ও সাতজন আহত হয়েছে বলে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে। নিহতদের পরিবারগুলো আমাদের সাথে যোগাযোগ করেছে। আমরা লাশ শনাক্তের পর পরিবারের কাছে সেগুলো হস্তান্তর করা হবে"। নিহত দশজনের মধ্যে শনিবার রাতে নয়জনের পরিচয় প্রকাশ করে ফায়ার সার্ভিস।
বাকি একজনের পরিচয় এখনো নিশ্চিত করা যায় নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার বিবিসি বাংলাকে জানান, যারা নিহত হয়েছে তাদের বেশিরভাগেই এতটা পুড়েছে যে তাদের মরদেহ শনাক্ত করতে ডিএনএ টেস্টের প্রয়োজন হবে। ফায়ার সার্ভিসের তালিকা অনুযায়ী নিহতরা হলেন, ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী, খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা, নাফিসতা মীম, চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির ও ফায়িজান নূর, গোপালগঞ্জের জিহাদ হাওলাদার, মাদারীপুরের আকিবুল ইসলাম এবং সাভারের নাসরিন আক্তার মুক্তা।
নাসরিন আক্তার মুক্তা স্বামী দেওয়ান ফয়সাল বিবিসি বাংলাকে জানান, তিন বান্ধবীর সাথে স্ত্রী ঘুরতে এসেছিলেন। তার দুই বান্ধবী বেঁচে ফিরলেও তার স্ত্রী মুক্তা মারা গেছেন। শনিবার সন্ধ্যায় তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমার স্ত্রী ও দুই বান্ধবী ইমা আর মীমের সাথে ঘুরতে এসেছিল। ওরা ভোরবেলা নাস্তার জন্য ডেকে হাটতে বের হইছিল। আমার স্ত্রী আর তখন আর ওঠে নি। পরে শুনলাম ও মারা গেছে। এখনো আমরা শনাক্ত করতে পারেনি মরদেহ। আমি যদি শনাক্ত করতে না পারি তখন ডিএনএ টেস্ট করতে হবে"।
এই ঘটনায় একই পরিবারের ছয়জন নিহত হয়েছে বলে বিসিসি বাংলাকে জানান উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার। তিনি জানান রিসোর্টটিতে আব্দুল আহাদ নামে এক ব্যক্তির পরিবারের নয়জন সদস্য ছিলেন। তাদের মধ্যে ছয়জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি তিনজন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। ওই পরিবারের ঘনিষ্ঠজন মোহাম্মদ ইউনূস কক্সবাজারেই থাকেন। তিনি বিবিসি বাংলাকে জানান, তার বন্ধুর পরিবারেরই ছয়জন নিহত হয়েছেই এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায়। তাদের মরদেহ গ্রহণের জন্য তিনি অপেক্ষায় ছিলেন পরিবারের সদস্যদের সাথে। তাদের মধ্যে একজন পুরুষ, একজন শিশু ও চারজন নারী রয়েছেন।
তবে সবার লাশ শনাক্ত করা যায়নি। যে কারণে লাশ হস্তান্তরও করেনি স্থানীয় প্রশাসন। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল বিবিসি বাংলাকে বলেন, লাশগুলো শনাক্তের পর সেগুলো স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে তা পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। আর যাদের মরদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হবে না তাদের পরিবারের সদস্যদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পরবর্তীতে তা পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। কক্সবাজারে আগুনে পুড়ে যাওয়া টুপটুপ রিসোর্টটি ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছিল বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ শনিবার ঢাকায় একটি অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানান, অগ্নি নিরাপত্তা বিষয়ক পরিদর্শনে গিয়ে গত জুন মাসে ওই রিসোর্টটিকে সতর্ক করে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারপরও রিসোর্টটির কার্যক্রম চালু ছিল। এসময় তিনি বলেন, "কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় অনেক ইকো রিসোর্ট ও অন্যান্য স্থাপনা ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। এসব স্থাপনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলা হবে"।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে রিসোর্ট পরিচালকদের সতর্ক করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। কক্সবাজারের এই অগ্নিকাণ্ডের কারণ কী কিংবা সূত্রপাত কোথায় এমন এক প্রশ্নের জবাবে মি. জুনাইদ বলেন, "তদন্ত শেষ হওয়ার আগে আগুন লাগার কারণ নিয়ে অনুমাননির্ভর কোনো বক্তব্য দেওয়া ঠিক হবে না। পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে"। তিনি জানান, রিসোর্টটি তিনতলা কাঠের স্থাপনা ছিল। নিচতলায় ছিল রেস্তোরাঁ, আর দোতলা ও তিনতলায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ছিল।
কাঠসহ দাহ্য পদার্থ দিয়ে তৈরি এ ধরনের স্থাপনায় অগ্নি-নিরাপত্তার ঝুঁকি বেশি বলেও জানান তিনি। ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি ছাড়া কিভাবে এমন একটি রিসোর্ট পরিচালিত হচ্ছে সেই প্রশ্ন ছিল কক্সবাজারের উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তারের কাছে। তিনি বিবিসি বাংলাকে জানান, এই ধরনের রিসোর্ট পরিচালনা কিংবা অনুমোদনের বিষয়গুলো কোন নির্দিষ্ট একটি পক্ষের অনুমতি নিয়ে হয় না। এর সাথে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের বেশ কয়েকটি দপ্তর জড়িত থাকে। যে কারণে সব কিছু যাচাই বাছাই ছাড়া এ বিষয়ে সঠিক মন্তব্য করতে পারবেন না বলেও জানান তিনি।


পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য সরাসরি প্রকাশিত হবে। অনুপযুক্ত মন্তব্য প্রশাসক সরিয়ে দিতে পারেন। ব্যক্তিগত বা গোপন তথ্য লিখবেন না।
এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মন্তব্যটি লিখুন।
মন্তব্য লিখুন