ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক তাসনিম সিরাজ মাহবুব দাবি করেছেন, তিনি প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন৷ তিনি তার ছাত্রীকে ‘জঙ্গি' বা ‘মৌলবাদী' বলেননি৷ প্রতিহিংসার জন্য তিনি দায়ী করেছেন তার বিভাগের চেয়ারম্যানকে৷ কিন্তু ওই বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. তাজিন আজিজ চৌধুরী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ‘‘প্রায় ৮০ জন শিক্ষার্থী তার বিরুদ্ধে একযোগে অভিযোগ করেছেন, পরিস্থিতি খারাপ হতে পারতো৷ সব শিক্ষককে নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি বৈঠক করে তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে৷'' তিনি জানান, তাসনিম সিরাজ মাহবুবের ‘‘কোর্স রিডিস্ট্রিবিউশন করা হয়েছে, অব্যাহতি দেওয়া হয়নি৷’’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ‘‘তার বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, তা ইংরেজি বিভাগের অ্যাকাডেমিক কমিটি নিয়েছে৷ আমাদের কাছে এখনও কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি৷ অভিযোগ আসলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অবশ্যই তদন্ত করে দেখবে৷

এই সম্মানিত শিক্ষক-যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তার কথাও শুনবে৷'' ‘‘তার কোর্স রিডিস্ট্রিবিউট করা হয়েছে বলে আমাদের জানানো হয়েছে,'' বলেন তিনি৷ বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানিয়েছে, তাসনিম সিরাজ মাহবুবকে ইংরেজি বিভাগের কোনো কোর্সেই রাখা হয়নি৷ ডাকসুর কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে ছালমাও ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমাদের জানানো হয়েছে যে, ম্যাডামকে ইংরেজি বিভাগের সব ধরনের কোর্স থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে৷’’ কী ঘটেছে?

বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বুধবার (৭ অক্টোবর) ইংরেজি বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ক্লাস চলাকালে সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুব এক ছাত্রীর নিকাব পরা নিয়ে কথা বলেন৷ নিকাব পরার কারণে অস্বস্তি বোধ করছেন জানিয়ে তাকে ক্লাসের পেছনের দিকে গিয়ে বসতে বলেন৷ এর প্রতিবাদে নিকাব পরা ওই ছাত্রী ক্লাস থেকে বের হয়ে যান৷ একপর্যায়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থীও ক্লাস থেকে বের হয়ে যান৷ তারা নিকাব পরা নিয়ে শ্রেণিকক্ষে কথা বলার ঘটনায় শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চেয়ে সহ-উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি দেয়৷

ডাকসুর কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে ছালমা তাতে নেতৃত্ব দেন৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘ওই ছাত্রী প্রথম বর্ষ থেকেই নিকাব পরেন৷ এত দিন সমস্যা হয়নি৷ তাহলে মাস্টার্সের ক্লাসে এসে সমস্যা হলো কেন? ওই ছাত্রী ম্যাডামকে এটাও বলেছেন যে, আমি আমার রুমে গিয়ে আমার নিকাব খুলে আমার মুখ দেখাব৷'' তিনি আরও বলেন, ‘‘আমি ঘটনার সময় ক্লাসে ছিলাম না৷ কিন্তু আমরা সহপাঠীরা পুরো ঘটনা আমাকে বলেছে৷

ম্যাডামের আচরণ নিয়ে সবাই বিক্ষুব্ধ এবং অপমানিত৷ তিনি এর আগেও আরও কয়েকজনের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছেন৷'' শিক্ষার্থীকে জঙ্গি বা মৌলবাদী বলা হয়েছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘তার (ওই শিক্ষার্থীর) উপস্থিতিতে বলেননি৷ তবে সে বের হওয়ার যাওয়ার পর অন্য শিক্ষার্থীরা যখন প্রতিবাদ করছিলেন তখন ম্যাডাম বলেন, সে তো ফান্ডামেন্টালিস্ট, টেররিস্টও হতে পারে৷ ম্যাডাম ইংরেজিতে বলেছেন৷ তার বাংলা তো জঙ্গি, মৌলবাদীই হয়৷

তখন সবাই ক্লাস থেকে বের হয়ে প্রতিবাদ জানায়৷'' যা বলছেন বিভাগের চেয়ারম্যান ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. তাজিন আজিজ চৌধুরী ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘ওই ঘটনার পর মাস্টার্সের শিক্ষার্থীরা আমার সঙ্গে বসেছেন৷ অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে বসেছেন৷ তাদের কথা একটাই যে, তারা ওই শিক্ষকের ক্লাস একদমই চায় না৷ এরমধ্যে কিন্তু ফেসবুকে প্রচার হয়ে গেছে৷ শিক্ষার্থীদের কাছে অডিও রেকর্ড আছে৷ একটা গ্রুপ প্রেস কনফারেন্সের প্রস্তুতি নিচ্ছিল৷

এই পরিস্থিতিতে সন্ধ্যায় আমি জরুরি ভিত্তিতে ডিপার্টমেন্টের অ্যাকাডেমিক কমিটির মিটিং ডেকে ক্লাস রিডিস্ট্রিবিউট করে দিই৷'' তাকে কোনো শোকজ করা হয়েছিল কিনা এবং এর লিখিত জবাব পাওয়া গেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘ওই পরিস্থিতিতে তার কোনো সুযোগ ছিলো না৷ শিক্ষার্থীরা যথেষ্ট সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছে৷ অন্যকিছু হতে পারতো৷ কিন্তু হয়নি৷'' ‘‘তবে তাকে ই-মেইল করা হয়েছে, ফোনে এসএমএস করা হয়েছে৷ তাতে বলা হয়েছে, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে মিটিং,'' বলেন ড. তাজিন৷

শিক্ষার্থীকে ‘জঙ্গি' বা ‘মৌলবাদী’ বলার অডিও রেকর্ড তিনি শুনেছেন কিনা, জানতে চাইলে বলেন, ‘‘আমি শুনিনি, অন্য শিক্ষকেরা শুনেছেন৷'' অভিযুক্ত শিক্ষকের কথা তবে ইংরেজি বিভাগের অভিযুক্ত শিক্ষক সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুব ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমাকে কোনো শোকজ করা হয়নি৷ আমার কাছ থেকে কোনো লিখিত জবাবও নেওয়া হয়নি৷ আর যে ই-মেইল ও এসএমএসের কথা বলা হচ্ছে, তাতে ওই বৈঠক যে আমাকে নিয়ে তাও বলা হয়নি৷

শরীর খারাপ থাকার কারণে আমার পক্ষে ওই মিটিংয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি৷'' তার দাবি, ‘‘ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান প্রতিহিংসার কারণে আমার বিরুদ্ধে ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন৷ তিনি আমার সরাসরি ছাত্রী৷ ২০২৪-এর ৫ আগেস্টর আগে সে শিক্ষকদের নীল দল করতো৷ আমিই তাকে পরে নানাভাবে সহায়তা করেছি৷ সে তার নীল দলের পরিচয় ঘোচাতে এখন এই কাজ করেছে৷'' তিনি আরো বলেন, ‘‘ওই শিক্ষার্থীকে আমি ‘জঙ্গি' বা ‘মৌলবাদী' বলিনি৷

নিকাব দিয়ে তার মুখ যেহেতু পুরো ঢাকা ছিল , তাই আমার অস্বস্তি হচ্ছিল৷ তাকে আমি আইডেন্টিফাই করতে পারছিলাম না৷ যাকে আমি পড়াব তাকে তো আমার আইডেন্টিফাই করতে হবে৷ আমার অস্বস্তি হওয়ায় আমি তাকে পিছনে গিয়ে বসতে বলেছি৷'' ‘‘ফেসবুকে যে কার্ড ছড়ানো হয়েছে সেখানে আমার কথা এডিট করে দেওয়া হয়েছে,'' বলে দাবি করেন তিনি৷ বিভাগের চেয়ারম্যান বলেন, ‘‘তিনি আমার সরাসরি শিক্ষক৷ আমি কেন তার প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ হবো৷

তার চাকরি আছে আর তিন বছর৷ তিনি তো আমার প্রতিদ্বন্দ্বীও নন৷ তার বিরুদ্ধে আরও অনেক অভিযোগ আছে৷ তিনি তো কারো পোশাক নিয়ে কথা বলতে পারেন না৷'' ‘‘আর জরুরি মিটিং শুরুর আগে শিক্ষার্থীরা একটা লিখিত অভিযোগও দেয়৷ তবে নিরাপত্তার কারণে তাদের নামের তালিকা প্রকাশ করা হয়নি,'' বলেও জানান তিনি৷ লিখিত কোনো অভিযোগ পায়নি কর্তৃপক্ষ ডাকসুর কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে ছালমা বলেন, ‘‘আমরা ওই শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কারের দাবি করেছি৷

দেখি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কী ব্যবস্থা নেয়৷'' তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ‘‘আমাদের কাছে এখনও কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি৷ আসলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অবশ্যই তদন্ত করে দেখবে৷ এই সম্মানিত শিক্ষক, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তার কথাও শুনবে৷ আর তার বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা, তা তার বিভাগ নিয়েছে৷ এটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো সিদ্ধান্ত নয়৷'' এদিকে চেষ্টা করেও যে ছাত্রীর সঙ্গে ঘটনাটি ঘটেছিলো, তার বক্তব্য জানা যায়নি৷

তবে উম্মে ছালমা বলেন, ‘‘আমরা স্যারদের ক্লাস লেকচার রেকর্ড করে নেই, পরে শোনার জন্য৷ সেই কারণে ম্যাডামের কথার পুরো রেকর্ড আমাদের ক্লাসমেটদের কাছে আছে৷ আর সবাই তো তার কথা শুনেছে৷ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইলেই তার ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে পারে৷'' ব্যবস্থা নেয়ার নিয়ম কী? জাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. স্নিগ্ধা রেজওয়ানা ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর গবেষণা ও শিক্ষা কমিটিরও সদস্য৷

ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে যদি কোনো অভিযোগ থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত ও ব্যবস্থা নেয়ার একটি প্রক্রিয়া আছে৷ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে হয়৷ যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তার কথা শুনতে হয়৷ আর কমিটি কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না৷ তারা সুপারিশ করতে পারে৷ ব্যবস্থা নিতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট৷'' আরও এটি উপায়ের কথাও উল্লেখ করেন তিনি৷

বলেন, ‘‘কোনো বিভাগের চেয়ারম্যানসহ সব শিক্ষক যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেন ডিনের উপস্থিতিতে, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত উপাচার্যের কাছে পাঠাবেন৷ উপাচার্য সিদ্ধান্ত নেবেন৷'' এককভাবে লিখিত সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার বিভাগের নেই বলে জানান তিনি৷ বলেন, ‘‘তবে এমন কোনো পরিস্থিতি যদি হয়, যেমন কোনো মব হচ্ছে বা ভাঙচুর হচ্ছে তাহলে ছাত্রদের শান্ত করতে বিভাগের চেয়ারম্যান মৌখিকভাবে কিছু বলতে পারেন৷ সেটা গ্রহণযোগ্য৷ কিন্তু এককভাবে লিখিত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার তার নাই৷এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যেরও নাই৷''