রাশিয়ার তেল কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প৷ এর ফলে ভারতসহ রাশিয়ার জ্বালানি তেলের ক্রেতা দেশগুলোর ওপর শতভাগ মার্কিন শুল্ক আরোপের যে হুমকি ছিল তা দূর হলো৷ জাতীয় স্বার্থের কথা উল্লেখ করে শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এই সংক্রান্ত একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন৷ এটিকে ‘ঐতিহাসিক' বলে অভিহিতি করেছে রাশিয়া৷

নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছে, ‘‘এই আদেশের চার নম্বর ধারায় বর্ণিত বিধান অনুযায়ী, গ্রাহাম অ্যাক্টের আওতায় আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, বিধিনিষেধ ও শুল্কের প্রয়োগ আমি এর মাধ্যমে মওকুফ করছি৷'' হোয়াইট হাউস প্রকাশিত ওই আদেশে ট্রাম্প আরও বলেন, ‘‘আমি কংগ্রেসে একটি প্রত্যয়নপত্র জমা দিয়েছি, যেখানে উল্লেখ করেছি যে এই মুহূর্তে এমন ছাড় যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ৷'' ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবে, সে বিষয়ে হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিক কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি৷

নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী, পরিস্থিতি বিবেচনায় ট্রাম্প বা তার শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় ‘পরবর্তী পদক্ষেপ' নেয়ার আগে পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে৷ কেন ট্রাম্পের এমন সিদ্ধান্ত মার্কিন কংগ্রেসে ব্যাপক দ্বিদলীয় সমর্থন নিয়ে গত মাসে লিন্ডসে গ্রাহাম অ্যাক্ট অনুমোদিত হয়৷ এই আইনের নামকরণ করা হয়েছে বিলটির পৃষ্ঠপোষক প্রয়াত মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে৷ আইনে রুশ জ্বালানি তেলের বড় ক্রেতা দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত মার্কিন শুল্ক আরোপের বিধান রাখা হয়েছিল৷

ইউক্রেনে যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা ছিল এর উদ্দেশ্য৷ রাশিয়ার জ্বালানি তেলের আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে চীন, ভারত, তুরস্ক অন্যতম৷ এছাড়া বিলটিতে রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত সরকারি কর্মকর্তা, ব্যাংক এবং ‘শ্যাডো ফ্লিট' বা গোপন ট্যাঙ্কার বহরের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা বিলটিতে উল্লেখ ছিল, স্বাক্ষরের ৩০ দিনের মধ্যে শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে, যদি না এর মধ্যে প্রেসিডেন্ট ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত নেন৷

সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই ট্রাম্প তা স্থগিত করলেন৷ এর আগে গত সপ্তাহে রাশিয়া থেকে ডিজেল কেনার ব্যাপারে সম্মত হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট৷ সমালোচকদের মতে, এই ধরনের পদক্ষেপ রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনের অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে৷ ইরান যুদ্ধের পরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়েছে৷ মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম কমিয়ে আনতে নানা চেষ্টা চালাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন৷

রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা-সংবলিত বিলের সহ-প্রণেতা ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল সমালোচনা করে বলেন, ‘‘এই অব্যাহতির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার কোনো সম্পর্ক নেই, বরং এটি ভ্লাদিমির পুটিনকে সন্তুষ্ট করারই প্রচেষ্টা৷'' খুশি রাশিয়া, হতাশ ইউক্রেন নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত আইনটি স্থগিত করাকে ‘গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক মুহূর্ত' হিসেবে অভিহিত করেছে রাশিয়া৷ ক্রেমলিনের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ক প্রতিনিধি কিরিল দিমিত্রিয়েভ শনিবার টেলিগ্রামে এক পোস্টে বলেন, এই পদক্ষেপ সংলাপ এবং পারস্পরিকভাবে সহযোগিতার পথকে আরও সুগম করবে৷

দিমিত্রিয়েভের মতে, ওই আইন কার্যকর হলে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্ক কার্যত স্থবির হয়ে পড়তো৷'' মার্কিন অর্থনীতি ও বৈশ্বিক বাজারের জন্যও এটি গুরুতর ক্ষতির কারণ হতে পারতো বলেও উল্লেখ করেন তিনি৷ তিনি আরও দাবি করেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা পারস্পরিক আস্থা জোরদার এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করতে পারে৷ এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের মার্কিন সিদ্ধান্তে হতাশা ব্যক্ত করেছেন৷ একে ‘দুর্ভাগ্যজনক' বলে উল্লেখ করলেও সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্টের তিনি সমালোচনা করেননি৷

জেলেনস্কি বলেছেন, ‘‘দুর্ভাগ্যবশত যুক্তরাষ্ট্রে এমন একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা লিন্ডসি গ্রাহাম আইনকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছে৷ অথচ এই আইন রাশিয়ার ওপর সত্যিকারের কার্যকর চাপ সৃষ্টি করে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারতো৷'' তবে নিষেধাজ্ঞাগুলো আবার কার্যকর করা হতে পারে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন৷ বলেন, ‘‘এই আইন বিশাল ভূমিকা রাখতে পারতো এবং এখনও রাখতে পারে৷'' রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পক্ষে সোচ্চার হতে তিনি ইউক্রেনের সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানান৷