বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার কাছে টঙ্গীর একটি মাদ্রাসায় প্রথম শ্রেণীর শিশুকে 'চুমু' দেওয়ার অভিযোগে এক শিক্ষককে ওই শিশুর বাবার চড় দেওয়ার ঘটনায় ব্যাপক আলোচনা চলছে। শিশুটির বাবার অভিযোগ, তার সন্তানকে যৌন হয়রানি করেছেন ওই শিক্ষক; পাশপাশি, এই হয়রানির কথা বাবা-মাকে বললে শিশুটিকে হত্যার হুমকিও দেন তিনি। চড় মারার ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ফেসবুকে অনেকেই ওই অভিভাবকের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করছেন এবং ওই শিক্ষকের বিচার দাবি করছেন।
বাংলাদেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিশুদের যৌন হয়রানির যেসব অভিযোগ ওঠে, সেকথা উল্লেখ করে ফেসবুকে সমালোচনাও করছেন অনেকে এবং আলেমদের এ বিষয়ে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। অন্যদিকে, মাদ্রাসা শিক্ষকদের একাংশসহ আরেকটি পক্ষ ওই শিক্ষকের পক্ষে অবস্থান নিয়ে তাকে মারধরের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। এ ঘটনায় ওই শিশুর বাবার দায়ের করা মামলায় ওই শিক্ষককে আটকের পর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে মাদ্রাসাটির অধ্যক্ষও শিশুটির বাবাকে আসামি করে পাল্টা একটি মামলা করেছেন। "উভয় পক্ষে দুটি মামলা হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষককে আমরা আগেই আটক করেছি। পরে মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল আরেকটি মামলা করেছেন।
সেই মামলায় এজাহার নামীয় আসামিকে গ্রেফতারের জন্য কাজ করছি," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান। এজাহার নামীয় আসামি কি শিশুটির বাবা - এই প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তরে বলেন, "হ্যাঁ"। পুলিশ জানিয়েছে, মাদ্রাসার অধ্যক্ষের দায়ের করা মামলায় মাদ্রাসায় ভাংচুর ও শিক্ষকদের মারধর করার অভিযোগ আনা হয়েছে। শিশুটির বাবার বিরুদ্ধে ১৭ লাখ লুট করার অভিযোগ তোলা হয়েছে। ওদিকে শিশুটির বাবা শুক্রবার রাতে প্রেস ব্রিফিং করে নিজের ও তার পরিবারের নিরাপত্তা চেয়েছেন।
একই সঙ্গে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যা ঘটেছে তার বিচার এবং নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। মাদ্রাসাটির অধ্যক্ষ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তার মাদ্রাসার অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ঘটনাটি তার মাদ্রাসার বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র। টঙ্গীর ওই মাদ্রাসার শিক্ষককে সজোরে চড় মারার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয় বৃহস্পতিবার থেকে। এতে দেখা যায়, এক ব্যক্তি 'কিসের চুমুরে' বলে আরেক ব্যক্তিকে থাপ্পড় মারছেন। এরপর আরও কয়েকজন ওই ব্যক্তিকে মারধর করে।
পরে স্থানীয়রা জড়ো হলে খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে ওই শিক্ষককে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেয়। পরে জানা যায়, যিনি চড় মেরেছেন তিনি ওই মাদ্রাসার প্রথম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীর বাবা। আর যাকে চড় মারা হয়েছে তিনি ওই মাদ্রাসার শিক্ষক ও ভাইস প্রিন্সিপাল। ভিডিওতে দেখা যায়, চড় মারার আগে ওই শিক্ষক বলছেন, "স্টুডেন্টদের সাথে অন্য রকম সম্পর্ক। সবার সাথে, বিশেষ করে ক্লাস ওয়ানের। তার এক পর্যায়ে আমি বললাম, চুমু'।" এই পর্যায়ে 'কীসের চুমুরে' একথা বলে তাকে থাপ্পড় দিয়ে ফেলে দেন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি।
ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হলে শুক্রবার রাতে একটি প্রেস ব্রিফিং করে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন শিশুটির বাবা। তিনি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টেও এই ব্রিফিংয়ের ভিডিও শেয়ার করেছেন। তিনি দাবি করেন, ওই শিক্ষকের কাছে জানতে চান যে কী ঘটেছিল। "সবার সামনে সে বলতেসে আমি তার সাথে (শিশুটির সঙ্গে) জোরাজোরি করেছি, চুমু দিয়েছি। 'জোরাজুরি' পর্যন্ত শোনার পর আমি কিন্তু কিছু করিনি। কিন্তু 'চুমু' এটা শোনার পর ওই মোমেন্টে অ্যাজ অ্যা গার্ডিয়ান আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনি।
এরপর যা ঘটেছে আপনারা দেখেছেন," বলেন তিনি। প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেছেন, কোনো মব নয়, তিনি তার মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার চাইতেই মাদ্রাসায় গিয়েছিলেন। ফেসবুকে অন্য একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, তিনি সাংবাদিকদের সামনে বলছেন, চুমুর কথা বাবা-মাকে বললে শিশুটিকে মেরে ফেলবে- ওই শিক্ষক এরকম হুমকি দিয়েছিলেন। শিশুটির বাবা তার বিরুদ্ধে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের আনা লুটপাটের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।তার সেখানে যাওয়ার ভিডিও ফুটেজ আছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। যে মাদ্রাসায় শিশুটি পড়ে, তার অধ্যক্ষ ভিন্ন দাবি করছেন।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, ঘটনার সময় ওই শিক্ষক বলছিলেন "সকল বাচ্চাদের তিনি বলেছেন যে 'রেজাল্ট ভালো করলে পাপ্পি দিবো'। তিনি দিয়েছেন - এমনটি বলেননি"। তার দাবি, শিশুটির মা কলেজ কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন যে বাচ্চাটি বাসায় গিয়ে বলেছে 'রেজাল্ট ভালো হলে চুমু দিবো' বলেছে শিক্ষক। এরপর ওই শিক্ষকের কাছে বিষয়টি জানতে চাওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। "ওই শিক্ষক তখন বলেছেন যে তিনি সবার উদ্দেশে বলেছেন, কাউকে নির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি। আর এমন ঘটনাও ঘটেনি।
শিক্ষক বলেছেন যে (চুমু) দিবেন, তিনি দেননি," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি। এই অধ্যক্ষের আরো দাবি, "এরপরেও শিশুটি ক্লাসে এসেছে। অভিযোগ সত্যি হলে লম্পট শিক্ষকের ক্লাসে তারা (শিশুর অভিভাবক) আবার পাঠাবেন কেন?" অভিযুক্ত শিক্ষক ওই মাদ্রাসায় খণ্ডকালিন শিক্ষক হিসেবে পড়ান বলেও জানান তিনি। বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন শিশুটির বাবা থানায় মে মামলা করেছেন সেখানে বলা হয়েছে, মাদ্রাসার নিচতলার সিঁড়িতে শিশুটিকে যৌন নিপীড়ন করা হয়েছে।
এর আগে বুধবার শিশুটির পরিবারের দুই সদস্য মাদ্রাসায় গিয়ে ওই শিক্ষকের কাছে ঘটনা সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। শিশুর বাবা ঘটনাস্থলেই সাংবাদিকদের বলেছেন, অভিযুক্ত শিক্ষক তার মেয়ের সঙ্গে অশালীন আচরণ করেছেন এবং সে কারণেই তিনি মামলা করেছেন। এছাড়া সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও বার্তায় তিনি বলেছেন, "থাপ্পড় দিয়ে আমি কোনো আলেম বা শিক্ষকে অপমান করিনি। আমি একজন দুশ্চরিত্র লম্পটকে আমি থাপ্পড় দিয়েছি"। বাংলাদেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতনের অভিযোগ ক্রমশ বাড়তে থাকার প্রসঙ্গ তুলে শিশুটির বাবার প্রতি সংহতি প্রকাশ করছেন অনেকে। ফেসবুকে 'থাপ্পড় দেওয়ার' মিম ছড়িয়ে পড়েছে।
'চড় দেওয়ার ঘটনাটিকে সমর্থন করেন কি না'- এ ধরনের পোল শেয়ার করতেও দেখা গেছে। ফেসবুকে কেউ কেউ লিখেছেন, "সন্তানের জন্য প্রতি বাবাকে এভাবেই দাঁড়াতে হবে"। আরেকজন লিখেছেন, "উনি সকল বাবাদের শিখিয়ে দিলেন কীভাবে প্রতিবাদ করতে হয়, উনি যদি হেরে যায় হেরে যাবে বাংলাদেশ"। আবার মাদ্রাসা শিক্ষক ও ধর্মভিত্তিক সংগঠনের সাথে জড়িতদের অনেকে ওই শিক্ষককে মারধরের সমালোচনা করছেন। মাওলানা দিদার আহমেদ নামে একজন ফেসবুকে লিখেছেন, "মিথ্যা অপবাদ দিয়ে প্রকাশ্যে প্লিম স্টাইলে মাদ্রাসার শিক্ষককে মারধর করে সন্ত্রাসীরা।
শিক্ষক নাকি ছাত্রী কে চুমা দিছে! যদি দিয়ে থাকে তাহলে মাদ্রাসা কমিটি আছে, দেশে আইন আছে, প্রমাণ ছাড়া সে কেনো এভাবে মারবে?" মো. মাহাদী হাসান নামে আরেকজন লিখেছেন, "মাদ্রাসার ভেতরে ঢুকে হামলা, ভাঙচুর ও শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলা—এ কেমন বিচার?" এ ঘটনা নিয়ে আলোচনার মধ্যেই কিছু কিছু মাদ্রাসা থেকে শিশুদের সঙ্গে তাদের শিক্ষকের আচরণ সম্পর্কে দেওয়া ভিডিও বার্তাও শেয়ার করছেন অনেকে। মাদরাসাতুত তাকী আল ইসলামিয়াহ তাদের ফেসবুক পাতায় ভিডিও বার্তায় বলেছে, "শিশু ইতস্তত বোধ করে এমন কিছু করা যাবে না।
আমাদের কোনো টিচার যদি কোনো শিক্ষার্থীর সাথে অপকর্ম করার কথা চিন্তাও করে সে যেন চলে যায়। কারণ এমন দুর্ঘটনা আমাদের মাদ্রাসায় ঘটলে অভিভাবকের চেয়ে বেশি শাস্তি আমরাই দিবো"। মাদরাসাতুজ জয়তুনা তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মোখতার আহমদকে উদ্ধৃত করে লিখেছে, "কোনো শিক্ষকই কোনো শিক্ষার্থীকে চুমু দেওয়া, ব্যাড টাচ করার সামান্যতম বৈধতা নেই। এটি কওমে লুতের পাপা। এমন পাপিষ্ঠরা কঠিনতম শাস্তি পেতেই হবে। আমার পরিবারের কারও বিষয়ে এমন কিছু ঘটলে ঘটনা ভিন্ন কিছু হতো না"।
ইসলাম বিষয়ক লেখক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলছেন, সাম্প্রতিককালে প্রায়শই বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে শিশুদের ঘিরে নেতিবাচক খবর আসছিল, যা মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করছিল। "এর মধ্যেই টঙ্গীর ঘটনা ঘটলো। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষগুলোকে শিশুদের শতভাগ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। আধুনিক শিশু ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে শ্রদ্ধাশীল হতেই হবে। আর অভিভাবকদেরও সচেতন হয়ে দেখতে হবে যে তারা সন্তানকে যেখানে দিচ্ছেন সেটি ঠিক আছে কি-না," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি। বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষার্থী নিপীড়নের ঘটনা প্রায়ই আলোচনার জন্ম দেয়।
প্রহারসহ শারীরিক শাস্তির পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে যৌন নিপীড়নের বেশ কিছু ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে উঠে এসেছে। যদিও অভিযোগ রয়েছে, এমন অনেক ঘটনা দীর্ঘকাল ধরেই বিভিন্ন মাদ্রাসায় কমবেশি ঘটে আসছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের ছয়টি মাদ্রাসা বোর্ডের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি'আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের মারধর করে শাস্তি দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে একটি দিকনির্দেশনা জারি করেছে । একই সাথে শিক্ষার্থীদের প্রতি যথাযথ আচরণ নিশ্চিত করতে প্রতিটি মাদ্রাসায় একটি সুরক্ষা কমিটি গঠন বা পুনর্গঠন করে সেটিকে সক্রিয় রাখার পরামর্শ দিয়েছে তারা।
গত ১২ই সেপ্টেম্বর আল-হাইআতুল উলয়ার স্থায়ী কমিটির সভায় নির্দেশনাটি চূড়ান্ত হয়েছে। এ নির্দেশনায় শাসনের শরয়ী সীমা নির্ধারণ অংশে বলা হয়েছে, "লাঠি, বেত বা কোনো যন্ত্র দিয়ে আঘাত করা, মুখমণ্ডল-মাথা বা স্পর্শকাতর অঙ্গে আঘাত করা এবং হাড় ভাঙা, রক্তপাত বা দাগ সৃষ্টিকারী যেকোনো শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রকাশ্যে অপমান, গালমন্দ, তিরস্কার, কটু ভাষা বা ঘৃণাসূচক সম্বোধন এবং অন্য যেকোনো মানসিক নির্যাতনমূলক আচরণও পরিহারযোগ্য"। নির্দেশনায় জানানো হয় যে, এ সীমা লঙ্ঘনকারী শিক্ষক বা শিক্ষিকা শরীয়ত ও বিধি উভয় দৃষ্টিতে জবাবদিহিতার আওতাভুক্ত থাকবেন।


পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য সরাসরি প্রকাশিত হবে। অনুপযুক্ত মন্তব্য প্রশাসক সরিয়ে দিতে পারেন। ব্যক্তিগত বা গোপন তথ্য লিখবেন না।
এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মন্তব্যটি লিখুন।
মন্তব্য লিখুন