চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি সই হয়েছে৷ সরকারের দাবি, এতে বন্দরের সক্ষমতা ও রাজস্ব বাড়বে৷ বিরোধীরা বলছেন, লাভের চেয়ে ঝুঁকিই বেশি৷ বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে করা চুক্তিটি নিয়ে বন্দরের শ্রমিক সংগঠন, বাম দলগুলো শুরু থেকেই বিরোধিতা করে এসেছে৷ চুক্তির প্রক্রিয়া, শর্ত এবং বিশেষ করে যে প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেই ডিপি ওয়ার্ল্ড নিয়েই আপত্তি ও সমালোচনা ছিল নানা মহলে৷ তবে ৮ অক্টোবর ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয়ে চুক্তিটি সই হয়েছে৷ এর আর্থিক ও পরিচালনাগত সুবিধার নানা দিক তুলে ধরছে সরকার৷ অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন, বন্দরের ভবিষ্যৎ, শ্রমিকদের স্বার্থ এবং জাতীয় নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন এখনও রয়ে গেছে৷
সরকারের হিসাব: বিনিয়োগ, রাজস্ব ও দক্ষতা বাড়বে সরকার বলছে, ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রথম ১০ বছরে এক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে৷ পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ চুক্তিটি বাংলাদেশের ঝিমিয়ে পড়া বন্দর ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের গতি আনবে৷ রাজস্ব বৃদ্ধি, বাণিজ্যে গতি ও সময় সাশ্রয়ের মতো বিষয়গুলোকেও সরকার এর পক্ষে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরছে৷ বাংলাদেশের শীর্ষ বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী সরাসরি কথা না বললেও তার দপ্তর থেকে ডয়চে ভেলেকে লিখিত বার্তা দেয়া হয়েছে৷ বলা হয়েছে, চুক্তির শুরুতেই প্রায় ৬০০ কোটি টাকা অগ্রিম ফি পরিশোধ করবে অপারেটর৷ এর ২৫ শতাংশ চুক্তি স্বাক্ষরের সময় এবং বাকি ৭৫ শতাংশ অপারেশন শুরু হওয়ার আগে পরিশোধ করতে হবে৷
এছাড়া প্রথম ১০ বছরের মধ্যে আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে এক হাজার কোটি টাকার বেশি মূলধন বিনিয়োগ করবে৷ এর পাশাপাশি টার্মিনালের গড় আয়ের ভিত্তিতে প্রতি টিইইউতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রায় ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত রাজস্ব বা রয়্যালটি পাবে৷ পাশাপাশি বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকা নির্ধারিত ফিও থাকবে৷ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে নৌপরিবহণমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমও একে ‘‘ বৃহত্তর স্বার্থে নেওয়া সিদ্ধান্ত '' বলে উল্লেখ করেন৷ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও সরকারের যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন চুক্তির সবচেয়ে বড় সমালোচনাগুলোর একটি এসেছে এর প্রক্রিয়া নিয়ে৷ অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের অভিযোগ, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি৷
ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘ডিপি ওয়ার্ল্ড কে দরপত্র এবং ছাড়পত্র ছাড়া চুক্তি করার জন্যে শেখ হাসিনা ই প্রথম উদ্যোগ নিয়েছিল৷ পরে অন্তর্বর্তী সরকার খুবই জোরজবরদস্তি করে এটা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিল৷ এখন এ সরকার এটা করছে৷'' তিনি আরো বলেন, ‘‘যে প্রক্রিয়ায় এত গুরুত্বপূর্ণ একটা চুক্তি করা হয়েছে তাতে সমস্যা আছে৷ মানে এত গোপনীয় এবং অস্বচ্ছভাবে এতবড় একটা চুক্তি হয়েছে, কেউ কিছু জানে না৷ কোনো দরপত্র আহ্বান করা হয় নাই৷'' এই বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুনও পরোক্ষভাবে প্রতিযোগিতার গুরুত্বের কথা তুলে ধরেছেন৷ তার মতে, বিশ্বের বহু বন্দরে কাজের অভিজ্ঞতা থাকলেও ডিপি ওয়ার্ল্ডকে নিয়ে সমালোচনাও কম নয়৷ কিন্তু এই কোম্পানিকেই বেছে নেবার কারণ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানেন না, এমনটাই ডয়চে ভেলেকে বললেন ড. ফাহমিদা৷ চুক্তির অর্থনৈতিক প্রয়োজন কতটা ছিল?
বন্দরের সক্ষমতা আর আয় বাড়ানোর পক্ষে সরকার যে যুক্তি দিচ্ছে তা-ও খণ্ডন করেন আনু মুহাম্মদ৷ তার হিসাবে চট্টগ্রাম বন্দর ইতোমধ্যেই লাভজনকভাবে পরিচালিত হচ্ছিল এবং সেখানে যথেষ্ট বিনিয়োগও করা হয়েছিল৷ সুতরাং, এই চুক্তির কোনো প্রয়োজন দেখন না এই অর্থনীতিবিদ৷ চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটির সদস্য ও শ্রমিক নেতা তপন দত্তও একই ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন৷ তিনি বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বছরে ১২ লক্ষ ৩৫ হাজার টিইইউ পরিমাণ মাল খালাস করার টার্গেট দেওয়া হয়েছে৷ অথচ বন্দর গত অর্থবছরেই ১৩ লক্ষ ৮৫ হাজার টিইইউ পরিমাণ মাল খালাস করেছে৷ গেল বছরের প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন বাধাবিঘ্ন থাকার পরেও এই পরিমাণ কাজ হয়েছে৷
সুতরাং, ডিপি ওয়ার্ল্ডকে কিন্তু টার্গেট কম দেওয়া হলো দেড় লাখ টিইইউ এর মতো৷ ‘‘বিষয়টা তো কই এর তেলে কই ভাজার মতো হয়ে গেল!,'' বলেন এই শ্রমিক নেতা৷ এসবের বাইরে তপন দত্ত শ্রমিকদের চাকরি র সুরক্ষা উদ্বেগ প্রকাশ করেন৷ এবিষয়ে জোর দিচ্ছেন ড. ফাহমিদা খাতুনও৷ তার মতে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কোম্পানিকে কাজ দেওয়া ইতিবাচক হলেও সেটি করতে গিয়ে স্থানীয় শ্রমিকদের স্বার্থ যেন ক্ষুণ্ন না হয়৷ সার্বভৌমত্বের ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন, সরকারের ব্যাখ্যা চুক্তির বিরোধীদের আরেকটি বড় যুক্তি জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে ঘিরে৷ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের বলেন, ‘‘বঙ্গোপসাগর ঘিরে নানা রকম আন্তর্জাতিক তৎপরতা আছে৷
সেই পরিপ্রেক্ষিতে এই বন্দরের উপর জাতীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাটা আমাদের কাছে মনে হয়েছে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ৷'' সমালোচনা উপেক্ষা করে সরকারের চুক্তি এবং বিরোধীদলের নিশ্চুপ থাকা নিয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমাদের মনে হচ্ছে যে এই সরকার এবং তার সহযোগী বিরোধী দলগুলো এই ক্ষমতায় আসার আগে জনগণের প্রতি তাদের যে দায়বদ্ধতা, তার চাইতে অনেক বেশি দায় তাদের বেশি বিদেশি কিছু মাফিয়া গোষ্ঠীর কাছে৷'' তবে ইনভেস্ট বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর দপ্তরের দেওয়া ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘‘চুক্তির প্রাথমিক মেয়াদ ১৫ বছর৷
পরবর্তী মেয়াদ বৃদ্ধি নির্ধারিত শর্ত পূরণ ও উভয় পক্ষের সম্মতির ওপর নির্ভরশীল৷ নিরাপত্তা, কাস্টমস, ইমিগ্রেশন ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের হাতেই থাকবে; চুক্তির আওতায় কোনো সার্বভৌম ক্ষমতা হস্তান্তর হবে না৷'' একইসাথে নিরাপত্তার নিয়ে শঙ্কা বা শ্রীলঙ্কার বন্দরের মতো ঋণের ফাঁদে পড়ার শঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তার বক্তব্যে৷
এই চুক্তিতে দেশের ব্যবসা খাতের ওপর কী প্রভাব তা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ফাহমিদা খাতুন জানালেন, দক্ষতা বাড়লেও দক্ষতার সাথে কত খরচে কি সেবা পাওয়া যাবে তার হিসাব খুব গুরুত্বপূর্ণ৷ তিনি বলেন, ‘‘অনেক সময় দেখা যায় যে, যদি প্রতিযোগিতা ঠিকমতো না হয়, তখন যদি একচেটিয়া ভাবে কোন কোম্পানি কাজ করে- তখন কিন্তু আর দরকষাকষির সুযোগ থাকে না৷'' ইনভেস্ট বাংলাদেশ কার্যালয়ে যখন এই চুক্তি সই হচ্ছিল, তখন বাইরের সড়কে চুক্তির প্রতিবাদে বিক্ষোভ করে সিপিবি, বাসদসহ বাংলাদেশের কয়েকটি বামপন্থি সংগঠন৷ একপর্যায়ে পুলিশ লাঠিপেটা করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়৷ চুক্তি সইয়ের পর চট্টগ্রামে বিক্ষোভ করেছে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদসহ আরো কিছু শ্রমিক সংগঠন৷ চুক্তি বাতিলের প্রতিবাদে চট্টগ্রাম বন্দরে অবস্থান ধর্মঘটসহ নানা ধরনের প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের পরিকল্পনা রয়েছে শ্রমিকদের, এমনটাই জানিয়েছেন শ্রমিক নেতা তপন দত্ত৷


পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য সরাসরি প্রকাশিত হবে। অনুপযুক্ত মন্তব্য প্রশাসক সরিয়ে দিতে পারেন। ব্যক্তিগত বা গোপন তথ্য লিখবেন না।
এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মন্তব্যটি লিখুন।
মন্তব্য লিখুন