বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা বরিশালের উজিরপুরে চুরির অভিযোগে স্থানীয়দের হাতে আটক হওয়া এক ব্যক্তিকে তার শিশু কন্যা চা-রুটি খাইয়ে দিচ্ছে - এমন একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে আলোড়ন তুলেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, শিশুটি যখন বাবার মুখে চায়ে ভেজানো রুটি তুলে দিচ্ছিল তখন তার বাবার হাত-পা বাধা ছিল একটি খুঁটির সাথে। ঘটনাটি নিজের মোবাইলে ভিডিও করে 'চোর হিসেবে সে যতটা খারাপ, বাবা হিসেবে ততটাই ভালো' শিরোনাম দিয়ে ফেসবুকে প্রথমে পোস্ট করেছিলেন স্থানীয় ব্যবসায়ী মিরাজ হোসেন ফরাজি। বিবিসি বাংলাকে মি. ফরাজি বলছিলেন, "আমি এসে দেখি লোকজন চুরির অভিযোগে তাকে বেঁধে রেখেছে। আর তার কন্যা তাকে রং চায়ে ভিজিয়ে রুটি খাইয়ে দিচ্ছে। দৃশ্যটি ভিডিও করে আমার ফেসবুকে পোস্ট করেছিলাম"।
তবে অভিযুক্ত ব্যক্তি চুরির অভিযোগ অস্বীকার করে স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন, জমি জমা নিয়ে বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটিয়ে তাকে চুরির অপবাদ দেওয়া হয়েছে। এদিকে, খবরটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর রবিবারই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে স্থানীয়দের সাথে কথা বলেছেন উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আলী সুজা বিবিসিকে বলেছেন, শিশুটির পিতাকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। আর শিশুটির পড়ালেখা ও তার মায়ের জন্য কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে বরিশালের উজিরপুর উপজেলায়। পুলিশ ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, শুক্রবার রাতে স্থানীয় একটি বাজারের কয়েকজন ব্যক্তির হাতে আটক হন ওই ব্যক্তি।
এ সময় তার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ আনা হয়। পরে তাকে মারধর করে একটি খুঁটির সঙ্গে সারারাত বেঁধে রাখা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। শনিবার সকালে খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যায় তার বড় মেয়ে, যে স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। এ ঘটনা নিয়ে শনিবার সকাল আটটা ছয় মিনিটে নিজের ধারণ করা ভিডিও ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন স্থানীয় বাজারের ব্যবসায়ী মিরাজ হোসেন ফরাজি, যা পরে ভাইরাল হয়ে যায়। পোস্টে তিনি লিখেছেন, "আজ সকাল বেলা বাজারে এসে দেখি চোর ধরা পরেছে, চোরকে রাস্তার পাশে পিলারের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। উৎসুক জনতা চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে। বিভিন্ন জনে বিভিন্ন ধরণের কথা বলছে, কেহ চোখ উপড়ে ফেলতে চাচ্ছে, কেহ আরও মারধরের পক্ষে আবার কেহ কেহ পুলিশের কাছে দিতে বলছে"।
তিনি লিখেছেন, "তবে আমি একটি বিষয় লক্ষ্য করলাম চোরের পিছনে একটি ৬-৭ বছরের মেয়ে মলিন মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ওর কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম এই লোক তোমার কি হয়, সে ফুঁপিয়ে কান্না জড়িত কণ্ঠে উত্তর দিল আমার বাবা। আমি এবার নিস্তব্ধ হয়ে গেলাম"। মি. ফরাজি আরও লিখেছেন, "কেহ একজন বনরুটি এবং চা কিনে দিয়েছে। মেয়েটা রুটি টুকরো টুকরো করে চায়ে ভিজিয়ে পরম যত্নে তার বাবাকে খাওয়াচ্ছে। এই দৃশ্যটা আমার কঠিন হৃদয়কে ভীষণভাবে নাড়িয়ে দিল। মনে মনে ভাবছি সে হয়তো মেয়েকে অনেক ভালবাসে। বাবা-মেয়ের সম্পর্ক গুলো বুঝি এমনই হয়"। পরে বিবিসি বাংলার কাছে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মি.
ফরাজি বলেন, "ওই ব্যক্তিকে গভীর রাতে কোনো এক বাড়িতে চুরির করার সময় আটক করার কথা বলেছে স্থানীয় লোকজন। তারা সেখান থেকে বাজারে নিয়ে আসে ও পিলারের সাথে বেঁধে রাখে। বাচ্চাটাকে তার বাবাকে খাওয়াতে দেখে মায়া লাগছিল। এরপর আমি ভিডিওটি পোস্ট করি"। বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন ফেসবুকে মি. ফরাজির পোস্ট করা ভিডিওর নিচে অনেকে নানা ধরনের মন্তব্য করেছেন, যাদের অনেকেই ওই এলাকার বাসিন্দা। আসাদ সুমন নামে একজন লিখেছেন, "মেয়েটাকে দেখতে যেতে ইচ্ছে হয়, আর ওর বাবাকে কিছু বলতে মন চায়"। "হৃদয়বিদারক দৃশ্য, মেয়েটার জন্য মায়া লাগছে, ওর কাছে তার পরিচয় শুধু একজন বাবা," লিখেছেন মুহাম্মদ ওয়ালিদ বিন ওয়াদুদ।
এদিকে সামাজিক মাধ্যমে ঘটনাটি বিশেষ করে শিশু কন্যার বাবাকে খাইয়ে দেওয়ার ভিডিও ভাইরাল হয়ে পড়লে বিষয়টি পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের দৃষ্টিতে আসে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আলী সুজা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, তিনি শনিবার বিকেলেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে স্থানীয়দের সাথে এবং শিশুটির পরিবারের সাথে কথা বলেছেন। তিনি বলেন স্থানীয়রা তাদের জানিয়েছেন, ওই শিশুটির পিতাকে স্থানীয়রা চুরির অভিযোগে বেঁধে রেখেছিল। তারা জানিয়েছে যে আগেও এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ ছিল। তার বিরুদ্ধে মাদক সেবনেরও অভিযোগ রয়েছে। তবে যারা তাকে বেঁধে রেখেছিল তারাই পরে তাকে ছেড়ে দিয়েছে। "তবে শিশুটি যেভাবে তার বাবাকে খাইয়ে দিচ্ছিল সত্যিই তা আমিসহ অনেকের হৃদয় স্পর্শ করেছে। আমি তার পড়ালেখার দায়িত্ব নিয়েছি। স্থানীয় বিত্তবানরা ছাড়াও দেশের বাইরে থেকেও কয়েকজন পরিবার ও শিশুটিকে সহায়তা করতে চেয়েছে।
আমরা ব্যাংকে শিশুটির জন্য স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যবস্থা করছি। পাশাপাশি শিশুটির মায়ের জন্যও কাজের ব্যবস্থা করা হচ্ছে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেছেন যে, তারা এখন দেখবেন যে এসব ঘটনার কারণে শিশুটি যেন কোনো নেতিবাচক পরিস্থিতিতে না পড়তে হয় এবং শিশুটি যেন পড়ালেখার সুযোগ পায় ও তা চালিয়ে যেতে পারে। উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয়রা জানিয়েছে, বাবা-মা ছাড়াও ওই শিশুটির আরও এক বোন রয়েছে। তারা ওই একই এলাকাতেই বসবাস করেন। এছাড়া শিশুটির পিতার এক ভাই সৌদি আরব প্রবাসী। আর এক বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। তবে ভাই-বোনের সাথে তার যোগাযোগ নেই বলে তিনি নিজেই স্থানীয় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।
এ সময় তিনি দাবি করেন যে, জমি জমা নিয়ে বিরোধের জেরে এ ঘটনাটি ঘটেছে এবং তার ওপর চুরির অপবাদ চাপানো হয়েছে। উজিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোঃ ফারুক হোসেন বিবিসিকে জানিয়েছেন, আটক করা ব্যক্তিকে স্থানীয়রাই আবার তাকে ছেড়ে দিয়েছে। "বিভিন্ন কারণে তিনি মাদকের সাথে জড়িয়ে পড়েছিলেন বলে স্থানীয়রা বলছেন। তাকে আগেও কয়েকবার আটক করেছিল স্থানীয়রা। তবে কোনো অভিযোগ না থাকায় পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। প্রশাসন থেকে দেখা হচ্ছে শিশুটি ও তার পরিবারকে কিভাবে সহায়তা করা যায়," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি। "মাদক বিভাগের কর্মকর্তাদের এনে আমরা ওই ব্যক্তিকে রিহ্যাবে (পুনর্বাসন) পাঠিয়েছি। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে তাকেও আমরা সহায়তা করবো," বলেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আলী সুজা।


পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য সরাসরি প্রকাশিত হবে। অনুপযুক্ত মন্তব্য প্রশাসক সরিয়ে দিতে পারেন। ব্যক্তিগত বা গোপন তথ্য লিখবেন না।
এখনো কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মন্তব্যটি লিখুন।
মন্তব্য লিখুন