সিনেমা চর্চার বাইরে কেন ব্যবহার করা হচ্ছে প্রেক্ষাগৃহ, প্রশ্ন তুলেছেন বিশিষ্টজনেরা৷ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ ( এবিভিপি )-র সঙ্গে বাম ছাত্র সংগঠনগুলির বচসা এবং হাতাহাতির সবে এক মাস কেটেছে। এর মধ্যেই ফের অশান্ত কলকাতার আরো এক ক্যাম্পাস। রোববার রণক্ষেত্রের চেহারা নিল বাঘাযতীনের সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউটের ক্যাম্পাস। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে প্রথমে বচসা এবং পরে তীব্র হাতাহাতি হয় অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েতের (এবিজিপি) সদস্যদের। এদিন ক্যাম্পাসের মূল প্রেক্ষাগৃহে অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েতের (এবিজিপি) একটি সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। ওই প্রেক্ষাগৃহে এই সভার অনুমতি থাকলেও ছাত্র ইউনিয়নের দাবি, তাদের অন্ধকারে রেখেই এই সভা চলছিল। ইউনিয়নের সদস্য এবং এডিটিং-এর ছাত্রী পূর্ভি বোন্দ্রে ডয়চে ভেলেকে বলেন, "এই সভা যে হবে তার কোনো খবর আমরা জানতাম না।

আমরা উদ্যোক্তাদের কাছে এই সভার বিষয় জানতে চাই। আমরা দেখি ওই সভার মাধ্যমে আরএসএস-এর (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ) প্রচার চলছে। আমরা প্রতীকী প্রতিবাদ জানাই। এর পরেই আমাদের উপর আক্রমণ নেমে আসে। আমাদের ছুরি দিয়ে মারা হয়। আমাদের 'অ্যান্টিন্যাশানাল' এবং 'নকশাল' বলা শুরু হয়। আমাদের ছাত্রছাত্রীদের উপর নির্মম আক্রমণ চলে।" এসআরএফটিআই-এর স্ক্রিন রাইটিং-এর শিক্ষক রোহিতাশ্ব মুখোপাধ্যায় এই ঘটনার প্রত্যক্ষ্যদর্শী ছিলেন। তিনি আমাদের জানান, "অশান্তি শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি ওখানে পৌঁছই। ওরা ছাত্রছাত্রীদেরকেই কেবলমাত্র মেরেছে এমনটা নয়। ছাত্রছাত্রীদের রক্ষা করতে যে শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মীরা এগিয়ে এসেছিলেন, তাদেরকেও বেধড়ক মেরেছে। আমার চোখের সামনে এই ঘটনা ঘটেছে। আমরা এখনো আতঙ্কিত। বাইরে যখন প্রচুর মব জড়ো হচ্ছে তখন আমরা নিরাপত্তারক্ষীদের বলি বাইরের গেট বন্ধ করে দিতে।"

অন্যদিকে, সভা চলাকালীন তাদের উপর ছাত্ররা চড়াও হয় বলে অভিযোগ করেন অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েতের সদস্যরা। এদিন ক্যাম্পাসের বাইরে উপস্থির ছিলেন বিজেপির পঙ্কজ রায়। তিনি বলেন, "সভায় যে ব্যানারে মণীষীদের ছবি, ভারতমাতার ছবি ছিল তা ছিঁড়ে তাকে পা দিয়ে মাড়িয়ে চলে যায় ছাত্ররা। এই সভা আগাম অনুমতি নিয়েই অনুষ্ঠিত হচ্ছিল।" তার দাবি, তার পরেও অশান্তি শুরু করে ক্যাম্পাসের ছাত্ররা। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, দেশের অপমান করেছেন ছাত্ররা। ছাত্ররা অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। রোববারের ঘটনায় অন্তত আট জন ছাত্র আহত হয়েছেন। তাদের স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ক্যাম্পাস যখন রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে তখন ওখানে উপস্থিত হন প্রাক্তনী এবং পরিচালক অভিজিৎ সেন। তিনি ডিডাব্লিউকে বলেন, "যখন অ্যাম্বুলেন্সে করে ছাত্রদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখনো গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দুষ্কৃতিরা আক্রমণ করে।

একজন ছাত্রের মাথা ফেটেছে। তার অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। একজনের পিঠে ছুরির গভীর ক্ষত। আমি তাদের সঙ্গে হাসপাতাল পর্যন্ত যাই। আমি এই ঘটনার প্রবল বিরোধিতা করি।" এসআরএফটিআই -এর অতিথি অধ্যাপক হিসেবে ক্লাস নেন পরিচালক ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরি। তিনি ডয়চে ভেলেকে জানান, এই ঘটনায় তিনি ক্ষুব্ধ এবং মর্মাহত। তিনি বলেন, "সারা দেশে যে ছাত্র ছাত্রীদের উপর আক্রমণ নেমে আসছে এটা তারই অংশ। ক্ষমতায় যারা আছেন তারা হয়তো এই প্রজন্মকেই সব থেকে বেশি ভয় পাচ্ছেন। এদিনের ঘটনায় ছাত্র ছাত্রীরা যদি উলটে মারতেন এবং সভার উদ্যোক্তাদের কেউ আহত হতেন তার ছবিও সামনে আসত। আমি অন্তত এরকম ছবি দেখিনি। বরং রক্তাক্ত ছাত্রদের দেখে কষ্ট পেয়েছি।" এই ঘটনার এফআইআর করা হয়েছে। এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

রোববারের প্রবল অশান্তির পর সোমবার আপাত শান্তি বজায় ছিলো ক্যাম্পাসে। উপস্থিত পড়ুয়ারা জানান, নতুন করে অশান্তি না বাঁধলেও, ক্যাম্পাসের আবহাওয়া ছিল থমথমে। শিক্ষক এবং ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের মধ্যে দফায় দফায় আলোচনায় বসেন। অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েতের সভাকে রাজনৈতিক সভা হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে সমালোচনা করেন প্রাক্তন ডিন অশোক বিশ্বনাথন। রোববারের ঘটনার নিন্দা করে তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, "উদ্যোক্তাদের কাছে অনুমতিপত্র ছিল। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, এসআরএফটিআই-এর মতো এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কি এরকম সভা অনুষ্ঠিত হতে পারে? এই সংগঠনটি (এবিজিপি) একটি রাজনৈতিক সংগঠন এবং বর্তমান সরকারের ঘনিষ্ঠ। তারা তাদের স্লোগান দিচ্ছিলেন। সেই স্লোগান হয়তো ছাত্রদের পছন্দ হয়নি। এবং তারা তার প্রতীকী প্রতিবাদ করেছে। তার পরেই অশান্তি শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক সংগঠনকে কেন অরাজনীতির ক্যাম্পাসে জায়গা দেওয়া হবে?"

এসআরএফটিআই-এ ছাত্রদের ইউনিয়নটি স্বাধীন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ছাত্র সংগঠন দ্বারা পরিচালিত নয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সভা চলাকালীন ছাত্ররা একটি পোস্টার নিয়ে প্রতিবাদ জানান। পোস্টারে লেখা ছিল, 'Resist Hindutva fascism (হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদী শক্তিকে প্রতিহত কর)।' এর পরই দুই পক্ষের বচসা শুরু হয়। বিশ্বনাথনের দাবি, "কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন, কোন অধিকারে ছাত্ররা এই সভার কাজের প্রতিবাদ করে। আমি মনে করি, সভা থেকে যদি এমন কোনো বক্তব্য রাখা হয় যা হিংসার জন্ম দেয় বা হিংসার রাজনীতিকে শক্তিশালী করে তাহলে ছাত্রদের অধিকার আছে প্রতিবাদ করার। এটা ওদেরই ক্যাম্পাস।" তবে কীসের ভিত্তিতে এই সভার অনুমতি পাওয়া গেল তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। এই মুহূর্তে ক্যাম্পাসে উপাচার্য পদের পরিবর্তন হচ্ছে। সমীরণ দত্ত এই পদ ছেড়েছেন। সন্তোষ আজমেরা নতুন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন।

এই অবস্থায় অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েতের সভার অনুমতি ক্যাম্পাসের কোন দপ্তর থেকে ইস্যু করা হয়েছে তা এখনো স্পষ্ট করেনি কর্তৃপক্ষ। তবে ক্যাম্পাসের অ্যাডমিন বিভাগ থেকেই এই অনুমতি পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা। তবে শিক্ষক, প্রাক্তনী এবং ছাত্রদের প্রশ্ন, সিনেমা সংক্রান্ত কোনো সভা হচ্ছিল না তাও কেন প্রেক্ষাগৃহ ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হল? এসআরএফটিআই-এর প্রথম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন গীতিকার এবং প্রাবন্ধিক চন্দ্রিল ভট্টাচার্য। তিনি ডিডাব্লিউকে বলেন, "আমি পড়েছি ১৯৯৬ থেকে ২০০০ পর্যন্ত। সেই সময় ফিল্ম ইন্সটিটিউটের অডিটোরিয়াম সিনেমা দেখার বা সিনেমা নিয়ে আলোচনার জন্যই ব্যবহার করা হত। এর বাইরে কাউকে ভাড়া দেওয়া হতো না। এখন কী নিয়ম হয়েছে আমি বলতে পারব না। তবে নিয়ম যদি বদলে থাকে তা বদলাতেই পারে।

বাইরের কাউকে ভাড়া দেওয়ার সমস্যা হলো, এই প্রতিষ্ঠান যে মূল্যবোধে বিশ্বাস রাখে তার সঙ্গে বাইরের সেই প্রতিষ্ঠানের মূল্যবোধের বিরোধ হতে পারে। এবং তাতে প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের খারাপ লাগতেই পারে। সেই কারণে আমার মনে হয়, এই হল সিনেমা দেখানোর বা সেই সংক্রান্ত আলোচনার কাজে ব্যবহার করা উচিৎ।" , সহমত জানান অভিজিৎ। তিনি বলেন, "এর পরে তো বিয়ে বাড়ির জন্যেও এই হল ভাড়া দেওয়া হবে।"

এই প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন অভিজিৎ। তিনি মনে করেন, সিনেমা দেখানো বা সিনেমা সংক্রান্ত আলোচনা বাদে এই হল বাইরের কাউকে ভাড়া দেওয়া অনুচিত। ইন্দ্রনীল মনে করিয়ে দেন, "প্রতিষ্ঠানের এই প্রেক্ষাগৃহ সিনেমা দেখানোর জন্য অত্যন্ত যত্ন করে তৈরি করা হয়েছে। এরকম প্রজেকশন অডিটোরিয়াম শহরে খুব একটা বেশি নেই। সেটাকে এরকম সিনেমার বাইরের সভা পরিচালনার কাজে কেন ব্যবহার করা হবে?"