নোট: লেখাটি বিবিসি উর্দু প্রথম প্রকাশ করেছিল ২০২৪ সালের সাতই ফেব্রুয়ারি। পাঁচই অক্টোবর ইমরান খানের জন্মদিন উপলক্ষে এটি আবার উপস্থাপন করা হয়েছে। ঘটনাটি ইসলামাবাদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে ঘটেছিল। সেদিন শেরওয়ানি পরিহিত দেশের প্রধানমন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন ব্যক্তিকে নিয়ে এক বিদেশি সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, 'এই তরুণ ছেলেটিকে নিয়ে কি আপনি গর্বিত?' সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বললেন, 'অবশ্যই, তিনি অসাধারণ কাজ করেছেন।' সাংবাদিক আবার প্রশ্ন করেন, 'যদি তিনি রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে কি তাকে আপনার সঙ্গে রাখা ভালো হবে?' এ প্রশ্নে হাসির রোল ওঠে, তবে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত গম্ভীরভাবে পাশে দাঁড়ানো ব্যক্তিটির কাঁধে হাত রেখে বলেন, 'আমি অনেক আগেই তাকে এ প্রস্তাব দিয়েছিলাম, কিন্তু সে তা প্রত্যাখ্যান করেছিল।

কেন, আমি জানি না।' ঘটনাটি ১৯৯২ সালের। তখন নওয়াজ শরীফ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তিনি ওইদিন ক্রিকেট বিশ্বকাপজয়ী দলের সম্মানে এক অনুষ্ঠানে ইমরান খান সম্পর্কে এ কথা বলছিলেন 'সিক্সটি মিনিটস অস্ট্রেলিয়া' অনুষ্ঠানের উপস্থাপকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে, যিনি 'ইমরান খান: এ লিভিং গড' শীর্ষক একটি বিশেষ অনুষ্ঠান নির্মাণের জন্য পাকিস্তানে এসেছিলেন। সেটি ছিল এমন এক সময়, যখন ৪০ বছর বয়সী ইমরান খান তার ক্রিকেট ক্যারিয়ার এবং ৪৩ বছর বয়সী নওয়াজ শরীফ তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিলেন। সম্ভবত তখন তাদের দু'জনসহ কারও ধারণাতেও ছিল না যে, একদিন এই দুই ব্যক্তি পাকিস্তানের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হবেন এবং তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবেন।

মজার বিষয় হলো, রাজনীতির এই প্রতিদ্বন্দ্বীরা একসময় বন্ধু ছিলেন এবং তাদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনেও অনেক মিল ছিল। নওয়াজ শরীফ এবং ইমরান খান, দুইজনই লাহোরের সচ্ছল কিন্তু অরাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং শুরুতে তারা কেউই রাজনীতিতে আগ্রহী ছিলেন না। তবে দু'জনই দেশটির প্রধানমন্ত্রী হন, কিন্তু কেউই তাদের সাংবিধানিক মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। নওয়াজ শরীফ ও ইমরান খানের রাজনৈতিক জীবনে সামরিক প্রধানদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এবং এক পর্যায়ে তারা দু'জনই এক জেনারেলের বিরুদ্ধে একসঙ্গে অবস্থান নেন। দু'জনের বিরুদ্ধেই প্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার অভিযোগ ওঠে। তবে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার জন্যও তারা দু'জনই একই প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করেন।

তাদের দু'জনকেই বিতর্কিত মামলায় সাজা ও কারাবরণ করতে হয়েছিল। এটিও একটি কাকতালীয় বিষয় যে, দু'জনকেই দুই ভিন্ন নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে সাজা দেওয়া হয়েছিল এবং অন্তত একটি মামলায় রায়দানকারী বিচারকও ছিলেন একই ব্যক্তি। এই সব মিল থাকা সত্ত্বেও নওয়াজ শরীফ ও ইমরান খানের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন এমন এক গভীর বিভাজনে পরিণত হয়েছে, যা গত কয়েক বছর ধরে দেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করে এসেছে। পাকিস্তানের ক্ষমতার রাজনীতির অংশ হয়ে ওঠা নওয়াজ শরীফ ও ইমরান খান বন্ধুত্ব থেকে রাজনৈতিক বৈরিতার পথে কীভাবে এগিয়েছেন, সে নিয়ে বিবিসি কথা বলেছে তাদের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহযোগীর সঙ্গে।

লাহোরের জামান পার্ক এবং রেলওয়ে স্টেশনের কাছে অবস্থিত সারায়ে সুলতান চকের মধ্যে দূরত্ব প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। পুরনো লাহোরে বসবাসকারী নওয়াজ শরীফ ছিলেন এক ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান। অন্যদিকে, জামান পার্কে বেড়ে ওঠা ইমরান খানের বাবা ছিলেন একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। দু'জনেরই ক্রিকেট খেলার শখ ছিল। ক্রিকেটই তাদের পরিচয়ের কারণ হয়েছিল এবং ইমরান খান তার রাজনৈতিক বক্তৃতায় প্রায়ই সে সময়ের কথা উল্লেখ করতেন। ইমরান খান ১৯৭১ সালেই পাকিস্তান টেস্ট দলের সদস্য হয়েছিলেন। তবে নওয়াজ শরীফের ক্রিকেট যাত্রা সীমিত পর্যায়েই ছিল। জামিল রানা লাহোর জিমখানা ক্রিকেট ক্লাবের সাবেক সম্পাদক এবং একজন ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটার।

অতীতে তিনি নওয়াজ শরীফের ব্যাটিং সঙ্গীও ছিলেন। শরীফ পরিবার এবং জামান পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক অনেক পুরোনো। বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, 'একবার আমি কোনো কাজে মিয়াঁ মুহাম্মদ শরীফের (নওয়াজ শরীফের বাবা) কাছে গিয়েছিলাম। তার কার্যালয় ছিল রেলওয়ে সদর দপ্তরের সামনে। সেখানে শাহবাজ শরীফ ছিলেন। তিনি আমাকে দেখে বললেন, আপনাকে খুব পরিচিত লাগছে, কোথাও দেখেছি মনে হয়। আমি বললাম, হয়তো সংবাদপত্রে ছবি দেখেছেন। আমি একজন ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটার এবং জিমখানা দলের হয়ে খেলি।' 'শাহবাজ শরীফ মিয়াঁ মুহাম্মদ শরীফকে বললেন, তাকে বলুন যেন আমাদেরও জিমখানার সদস্য বানিয়ে দেয়।

"তখন জিমখানার সম্পাদক ছিলেন মেজর শবির শরীফের বাবা মেজর শরীফ। আমি তার কাছে গিয়ে বললাম, এক ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তানরা সদস্য হতে চায়। তিনি জিজ্ঞেস করলেন তারা ক্রিকেট খেলে কী-না। আমি বললাম, তা জানি না, তবে তাদের ব্যবসা ভালো। তখন তিনি আমাকে দুটি ফর্ম দিলেন, বললেন এটা তাদের দিয়ে দাও।" এভাবেই শরীফ ভ্রাতৃদ্বয় লাহোর জিমখানা ক্রিকেট ক্লাবের সদস্য হন। জামিল রানা বলেন, এর আগেও নওয়াজ শরীফ ক্রিকেট খেলতেন। পারভেজ মীর বর্তমানে পরিচিত সাংবাদিক। তবে সে সময় তিনি লাহোরের ক্লাব ক্রিকেটের অংশ ছিলেন এবং পরে ১৯৭৫ সালের বিশ্বকাপেও পাকিস্তান দলে খেলেন।

তিনি বলেন, "নওয়াজ শরীফ একটি ক্রিকেট ক্লাব গড়েছিলেন, যার নাম ছিল ইত্তেফাক ক্রিকেট ক্লাব। এ দলে মাসে ২৫০ রুপি দেওয়া হতো। সে সময়ের হিসাবে এটি অনেক টাকা ছিল। এই ক্লাবে অনেক বড় বড় খেলোয়াড় খেলতেন। এটি ১৯৭০-৭১ সালের কথা। আমার মনে আছে নওয়াজ শরীফের কাছে সবচেয়ে ভালো ক্রিকেট কিট থাকত। তিনি বিদেশ থেকে আমদানি করা কিট ব্যবহার করতেন। যখন আমার ফার্স্ট ক্লাস অভিষেক হয়, তখন আমি নওয়াজ শরীফের কাছ থেকে জুতা ধার নিয়ে পরেছিলাম।" মুদাস্সির নাজার, পাকিস্তানের সাবেক টেস্ট ক্রিকেটার ও কোচ, বিবিসিকে বলেন যে ১৯৭০-এর দশকে একবার গভর্নমেন্ট কলেজ লাহোরের দলের সঙ্গে ইত্তেফাক ক্লাবের ম্যাচ নির্ধারিত হয়।

"আমরা ম্যাচ খেলতে পৌঁছে দেখি মিয়াঁ নওয়াজ শরীফ প্যাড বেঁধে প্রস্তুত। তখন আমরা তাকে চিনতাম না। আমরা বললাম, আগে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত তো টসে হবে। আমরা টসে জিতে আগে ব্যাট করে ৩৫০ রান করি। এরপর মধ্যাহ্ন বিরতি হয়, যা তখন এক ঘণ্টারও বেশি দীর্ঘ ছিল। বিরতির পর আমরা ফিরে এলাম, কিন্তু ইত্তেফাক ক্লাবের দল আর মাঠে ফিরল না।'' লাহোর জিমখানা ক্রিকেট ক্লাবের এক সাবেক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নওয়াজ শরীফ ফিল্ডিং করতে খুব একটা পছন্দ করতেন না।

ইমরান খান তার আত্মজীবনী পাকিস্তান: আ পার্সোনাল হিস্ট্রি বইয়ে লিখেছেন, "১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে যখন স্থানীয় একটি ক্রিকেট ক্লাবে প্রথম নওয়াজ শরীফের সঙ্গে দেখা হয়, তখন তাকে আমার কাছে একজন সাধারণ মানুষ বলে মনে হয়েছিলেন, যিনি রাজনীতির চেয়ে ক্রিকেটে বেশি আগ্রহী ছিলেন। আমার মনে হয়, তখন তার আসল স্বপ্ন ছিল পাকিস্তানের জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হওয়া। খেলাধুলার চাকচিক্য তাকে খুব আকৃষ্ট করত।" সেই স্থানীয় ক্রিকেট ক্লাব ছিল জিমখানা ক্লাব। জামিল রানা বলেন, ''ইংল্যান্ড থেকে যখন ইমরান খান আসতেন, তখন তিনি রবিবার জিমখানায় ম্যাচ খেলতেন। সেখানেই ইমরান খান ও নওয়াজ শরীফের পরিচয় হয়।' তবে, শুরুতে তাদের সাক্ষাৎ খুব সুখকর ছিল না।

তখন একদিকে ইমরান খান বিশ্বের দ্রুততম বোলারদের একজন হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছিলেন, আর নওয়াজ শরীফ রাজনীতিতে তার শুরুর দিককার দিনগুলো পার করছিলেন। পি জে মীর বলেন, "ইমরান খান তখন নওয়াজ শরীফকে প্রচুর বাউন্সার দিতেন। ইমরান ১৬ পা দৌড়ে এসে বল করতেন এবং বল নওয়াজ শরীফের বুকে আঘাত করত। কিন্তু তিনি সেগুলো সহ্য করতেন। আমরা ইমরানকে বলতাম, আরে মানুষ হও, কী করছ?" পি জে মীরের মতে, একই সময়ে একদিন তিনি নওয়াজ শরীফের গাড়িতে কোথাও যাচ্ছিলেন। পথে থামলে ইমরানের গাড়িও পাশে এসে দাঁড়ায়। "আমি ইমরানকে বললাম, তুমি কি নওয়াজ শরীফকে চেনো? তিনি বললেন, হ্যাঁ, দেখেছি।

নওয়াজ শরীফ সামনের দিকে ঝুঁকে বললেন, কেমন আছেন? কোথায় যাচ্ছেন? ইমরান বললেন, আমি লিবার্টি যাচ্ছি। আমরা বললাম, আমরাও সেদিকেই যাচ্ছি। পরে আমরা ভ্যারাইটি বুক স্টলের সামনে গাড়ি থামাই। তখন সেখাবেই তাদের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হয় এবং পরে তাদের মধ্যে যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।' আশির দশকে ধীরে ধীরে নওয়াজ শরীফ এবং ইমরান খান নিজেদের নিজ নিজ পেশাগত জীবনের শীর্ষে পৌঁছাতে থাকেন। ১৯৮২ সালে ইমরান খান পাকিস্তান ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হন। অন্যদিকে, তার এক বছর আগে পাঞ্জাবের অর্থমন্ত্রী হওয়া নওয়াজ শরীফ ১৯৮৫ সালে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হন। সে সময় দু'জনেরই তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল জিয়া-উল-হকের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল।

তবে, রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও নওয়াজ শরীফের ক্রিকেটপ্রেম অটুট ছিল। এই শখই তখন নওয়াজ শরীফ ও ইমরান খানের যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ছিল। জামিল রানার মতে, "মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরও নওয়াজ শরীফ নিয়মিত প্রতি সপ্তাহে জিমখানায় ম্যাচ খেলতে আসতেন। এ সময় তিনি তার ক্যারিয়ারের দুটি ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচও খেলেন। দুটি ম্যাচই ছিল আন্তর্জাতিক দলের বিপক্ষে ওয়ার্ম-আপ ম্যাচ।" জামিল রানা বলেন, "ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাগ-ই-জিন্নাহে একটি ম্যাচ হয়েছিল। সেখানে আমি ও মিয়াঁ নওয়াজ শরীফ ওপেনিং করেছিলাম। ইংল্যান্ডের হয়ে ফাস্ট বোলার স্মল ও ইয়ান বোথাম বোলিং শুরু করেছিলেন। আমি মিয়াঁ সাহেবকে বলেছিলাম, আপনি স্ট্রাইক নেবেন না, আমাকে নিতে দিন, আপনি অন্য প্রান্তে চলে যান।

তখন তিনি বললেন, কেন? আমি কি ক্রিকেটার নই?" ওপেনিং করার এই আগ্রহের কারণেই ১৯৮৭ সালে একটি মজার ঘটনা ঘটে। বিশ্বকাপের আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল একটি ওয়ার্ম-আপ ম্যাচ খেলছিল। ইমরান খান তার বইয়ে লিখেছেন, 'ম্যাচ শুরু হওয়ার কয়েক মুহূর্ত আগে ক্রিকেট বোর্ডের সচিব শাহিদ রফি আমাকে জানালেন যে ওই দিন মুখ্যমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ দলের অধিনায়ক হবেন।' 'আমি বিস্মিত হলাম, তবে ভাবলাম হয়তো তিনি ড্রেসিংরুম থেকে ম্যাচটি দেখবেন। এরপর আরেকটি ধাক্কা খেলাম, যখন দেখলাম নওয়াজ শরীফ ক্রিকেট কিট পরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক ভিভ রিচার্ডসের সঙ্গে টস করতে মাঠে চলে এসেছেন।' কিন্তু এর চেয়েও বড় 'ধাক্কা' তখনও বাকি ছিল।

ইমরান খান লিখেছেন, 'নওয়াজ শরীফ টসে জয়ী হয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরে এসে প্যাড পরা শুরু করলেন। কারণ তিনি মুদাস্সির নজরের সঙ্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভয়ঙ্কর ফাস্ট বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে ওপেন করতে নামবেন।' 'একদিকে মুদাস্সির নাজার প্যাড, থাই-প্যাড, বুকে সুরক্ষার জন্য চেস্ট গার্ড, হাতে আর্ম গার্ড, গ্লাভস এবং মাথায় হেলমেট পরে প্রস্তুত হলেন। অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ শুধু প্যাড পরলেন, মাথায় একটি টুপি দিলেন এবং মুখে হাসি নিয়ে মাঠে নেমে গেলেন।' ইমরান খান লিখেছেন, 'সবাই জানত এটা বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক বোলিং আক্রমণগুলোর একটি, যা বহু নামকরা ব্যাটসম্যান ও পেশাদার খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ার শেষ করে দিয়েছে।

আর সেখানে নওয়াজ শরীফ, যার এত বড় পর্যায়ে খেলার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না, কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই মাঠে নেমেছিলেন।' তিনি আরও লিখেছেন, 'নওয়াজ শরীফ যদি শর্ট বলের মুখোমুখি হতেন, তাহলে গুরুতর কিছু ঘটার আশঙ্কা ছিল। তাই আমি সঙ্গে সঙ্গে খোঁজ নিলাম সেখানে কোনো অ্যাম্বুলেন্স আছে কীনা।' এরই মধ্যে প্রথম বল হয়ে যায়, যা ইমরান খানের ভাষায় নওয়াজ শরীফ ব্যাট তোলার আগেই উইকেটকিপারের হাতে পৌঁছে যায়। 'সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল যে বলটি সোজা আসেনি।' পরের বলেই নওয়াজ শরীফ বোল্ড হয়ে যান।

আর তাতেই ইমরান খানের উদ্বেগের অবসান হয়। তবে, মুদাস্সির নাজারের মনে নেই, কোন ম্যাচে তিনি নওয়াজ শরীফের সঙ্গে ওপেন করেছিলেন। তিনি আরেকটি ঘটনার কথা স্মরণ করেন। ১৯৮৭ সালেরই ঘটনা। 'একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে আমরা অনুশীলন করছিলাম। হঠাৎ মিয়াঁ নওয়াজ শরীফ বড় বহর নিয়ে এসে হাজির হন এবং নেটে ঢুকে পড়েন, যেখানে সাধারণ বোলাররা দলকে অনুশীলন করাচ্ছিলেন। ইমরান প্যাড পরে প্রস্তুত ছিল এবং ব্যাটিং অনুশীলনে নামার কথা ছিল। কিন্তু নওয়াজ শরীফের আগমনে ইমরান খুব বিরক্ত হয়, কারণ দলের এত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ সামনে ছিল এবং সময় নষ্ট হচ্ছিল।' নওয়াজ শরীফ ১৯৮৮ সালে আবারও পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হন এবং ১৯৯০ সালে প্রথমবারের মত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।

কাকতালীয়ভাবে, ইমরান খানের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্যও এই সময়েই আসে, অর্থাৎ ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয়। একজন সাংবাদিকের মতে, এই জয়ে নওয়াজ শরীফেরও ভূমিকা ছিল। কামার আহমেদ একজন জ্যেষ্ঠ ক্রীড়া সাংবাদিক। তার দাবি, ১৯৯২ বিশ্বকাপের আগে ফিটনেস সমস্যার কারণে জাভেদ মিয়াঁদাদকে দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল এবং দল তাকে ছাড়াই অস্ট্রেলিয়া চলে গিয়েছিল। পরে নওয়াজ শরীফ বিষয়টি জানতে পারেন। 'কোনো এক জায়গায় নওয়াজ শরীফের সঙ্গে জাভেদ মিয়াঁদাদের দেখা হয়। তিনি জিজ্ঞেস করেন, তুমি এখানে কী করছ?

জাভেদ জানান, আমাকে ছাড়াই তারা চলে গেছে।' কামার আহমেদের মতে, 'প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নওয়াজ শরীফ ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং জাভেদ মিয়াঁদাদকে বিশ্বকাপ দলে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেন।' জাভেদ মিয়াঁদাদ অবশ্য নিশ্চিত করেছেন যে ফিটনেস সমস্যার কারণে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। বিবিসিকে তিনি বলেন, 'তারপর মানুষ চাপ দিতে শুরু করল, তুমি যাও। কিন্তু আমি বলেছিলাম, আগে আমি ফিটনেস পরীক্ষা পাস করব, তারপর দলে যোগ দেব।' তবে জাভেদ মিয়াঁদাদের মতে, এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নওয়াজ শরীফের কোনো ভূমিকা ছিল কী-না, তা তিনি জানেন না।

বিশ্বকাপ দলে জাভেদ মিয়াঁদাদের অন্তর্ভুক্তিতে নওয়াজ শরীফের কোনো ভূমিকা ছিল কী-না, তা নিশ্চিত নয়। তবে, ইমরান খানের পরবর্তী বড় প্রকল্প, অর্থাৎ নিজের মায়ের নামে শওকত খানম হাসপাতাল নির্মাণে নওয়াজ শরীফের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ১৯৯২ বিশ্বকাপের আগেই পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নওয়াজ শরীফ শওকত খানম হাসপাতালের জন্য জমি পাওয়ার ব্যাপারে ইমরান খানকে সহায়তা করেন। এরপর ১৯৯১ সালের এপ্রিলে ক্যান্সার হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে নওয়াজ শরীফকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেদিনের অনুষ্ঠানে ভারতীয় অভিনেতা দিলীপ কুমারও উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের পর রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ হাসপাতালের জন্য এক কোটি রুপি তহবিল দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

সুহাইল ওয়ারাইচ বলেন, 'সেই সময় নওয়াজ শরীফের ছেলেরাও ইমরান খানের ভক্ত ছিল এবং তারাও হাসপাতালের জন্য যথেষ্ট অনুদান দিয়েছিল।' ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যখন নওয়াজ শরীফ প্রকাশ করেন যে তিনি অতীতে ইমরান খানকে একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তখন অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ইমরান খানের কাছে জানতে চান যে তিনি কেন রাজনীতিতে আসেননি। ইমরান খানের জবাব ছিল, 'আমাকে দু'বার রাজনীতিতে আসার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমি জানি যে আমি রাজনীতিবিদ হতে পারব না।' তবে, এর মাত্র কয়েক বছর পর, ১৯৯৬ সালে, ইমরান খান তেহরিক-ই-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ করেন। নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের আগে ইমরান খান পাঞ্জাবজুড়ে সফর করেছিলেন।

সে সময় একদিকে নওয়াজ শরীফ বেনজির ভুট্টোর সরকারের বিরুদ্ধে পাঞ্জাবজুড়ে রাজনৈতিক প্রচারণা চালাচ্ছিলেন, অন্যদিকে ইমরান খান স্কুল-কলেজে শওকত খানম হাসপাতালের জন্য অনুদান সংগ্রহের অভিযান পরিচালনা করছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে ইমরান খান যখন রাজনীতিতে নামেন, তখন নওয়াজ শরীফ আবারও তাকে একটি প্রস্তাব দেন। ইমরান খানের ভাষ্য অনুযায়ী, 'নওয়াজ শরীফ প্রথমে আমাকে তার দলে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ দেওয়ার প্রস্তাব দেন এবং পরে জাতীয় পরিষদে ২০টি আসন নিয়ে জোট করার প্রস্তাব করেন।' পি জে মীরের মতে, তিনি নওয়াজ শরীফের ওই প্রস্তাবের সাক্ষী ছিলেন। বিবিসির সঙ্গে আলাপে পি জে মীর দাবি করেন, 'নওয়াজ শরীফ আমাকে বলেছিলেন যে তিনি ইমরান খানকে আসনও দেবেন এবং তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীও করবেন।

আমি হাসপাতালে গিয়ে ইমরানকে বললাম, নওয়াজ শরীফ দেখা করতে চান। আমি তাকে নওয়াজের প্রস্তাবের কথা জানালাম। ইমরান বলল, ঠিক আছে। কিন্তু পরদিন সকালে ইমরানের ফোন এলো যে বৈঠক বাতিল করে দিতে, কারণ জেমাইমার কিছু কাজ আছে। আমি বললাম, এটি খুব বড় একটি সুযোগ। কিন্তু সে তখন সেটি নেয়নি।' নিজের বইয়ে ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার কারণ ব্যাখ্যা করে ইমরান খান লিখেছেন, 'আমি নওয়াজ শরীফকে বেনজিরের মতোই দুর্নীতিগ্রস্ত মনে করতাম। রাজনীতিতে আসার আগে তারা দু'জনই আমার বন্ধু ছিলেন, কিন্তু তাদের বিরোধিতা করার একমাত্র কারণ ছিল তাদের দুর্নীতি।' তবে এ ঘটনার ১০ বছরের মধ্যে ইমরান খান নওয়াজ শরীফের সঙ্গে রাজনৈতিক জোট করতে রাজি হন।

১৯৯৭ সালের নির্বাচন ছিল ইমরান খান ও তেহরিক-ই-ইনসাফের প্রথম নির্বাচনী অভিজ্ঞতা, যেখানে ইমরান ও তার দলের ভরাডুবি হয়েছিল। অন্যদিকে, নওয়াজ শরীফ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন, কিন্তু এবারও তিনি তার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। ১৯৯৯ সালের ১২ই অক্টোবরে সামরিক অভ্যুত্থানে যখন জেনারেল পারভেজ মুশাররফ গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাত করেন, তখন তার প্রাথমিক সমর্থকদের মধ্যে ইমরান খানও ছিলেন। এভাবে পারভেজ মুশাররফ দ্বিতীয় সেই সামরিক শাসকে পরিণত হন, যিনি নওয়াজ শরীফ ও ইমরান খানের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। নওয়াজ শরীফ প্রথমবার কারাবাসের পর সৌদি আরবে নির্বাসিত হন।

অন্যদিকে, ২০০২ সালের নির্বাচনের ফলাফলের পর ইমরান খানও ধীরে ধীরে পারভেজ মুশাররফের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন। এমনকি ২০০৭ সালে ইমরান খানও প্রথমবারের মতো পারভেজ মুশাররফের আমলেই কারাগারে যান। ততদিনে নওয়াজ শরীফ সৌদি আরব থেকে লন্ডনে চলে এসেছিলেন। স্বল্পকালীন কারাবাস থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ইমরান খান লন্ডনে নওয়াজ শরীফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং এক সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে তারা একজোট হন। ২০০৭ সালের জুনে লন্ডনে অনুষ্ঠিত বৈঠক সম্পর্কে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি লিখেছিল, 'ইমরান খান ও নওয়াজ শরীফ ঘোষণা করেছেন যে তারা পারভেজ মুশাররফের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে একসঙ্গে কাজ করবেন।' পি জে মীরের মতে, 'ম্যানচেস্টারেও একটি সমাবেশ হয়েছিল তখন, যেখানে দু'জনই অংশ নেন।

ব্যারিস্টার সুলতান সেই সমাবেশের আয়োজন করেছিলেন। সেখানে বিপুলসংখ্যক কাশ্মীরি উপস্থিত ছিলেন। তখন ইমরান খান, নওয়াজ শরীফ এবং শাহবাজ শরীফ একসঙ্গে ছিলেন। সমাবেশে তারা একে অপরের প্রশংসাও করেছিলেন।' ইমরান খান ও নওয়াজ শরীফ সে জোটের অংশ হয়েছিলেন, যার নাম ছিল 'অল পার্টিজ ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট' বা এপিডিএম। তবে এ জোটও বেশি দিন টেকেনি। বেনজির ভুট্টো পাকিস্তানে ফিরে আসার কিছুদিন পর নওয়াজ শরীফও নির্বাসন শেষ করে দেশে ফিরে আসেন। এপিডিএম আসন্ন নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দিয়েছিল। নিজের বইয়ে ইমরান খান লিখেছেন, 'নির্বাচন বয়কট আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার পর নওয়াজ শরীফ আমাদের সবার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন।

আমার মনে আছে, একটি বৈঠক থেকে তিনি হঠাৎ ৪০ মিনিটের জন্য চলে যান। তিনি ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ফোন শুনছিলেন। পরে তিনি বয়কটের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন, অথচ তেহরিক-ই-ইনসাফসহ বাকি দলগুলো নির্বাচনে অংশ নেয়নি।' ২০০৮ সালের নির্বাচন বয়কট করার কারণে ইমরান খান সেই জাতীয় পরিষদে ছিলেন না, যেখানে প্রথমে পিপিপি ও পিএমএল-এনের জোট সরকার গঠিত হয়েছিল, যদিও সে জোট দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তবে, পি জে মীরের মতে, পিএমএল-এন ও পিপিপির জোট এবং বেনজির ভুট্টোর হত্যাকাণ্ডের পর এমন একটি রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, যার সুবিধা ইমরান খান পান। দীর্ঘদিন রাজনৈতিক মূলধারায় প্রতিষ্ঠা পাওয়ার চেষ্টা করা ইমরান খান ২০১১ সালে নতুন রূপে লাহোরে আত্মপ্রকাশ করেন।

তখন তার সঙ্গে অনেক প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যুক্ত হয়েছিলেন। তবে, সোহেল ওয়ারাইচের মতে, 'পিটিআই যখন মিনার-ই-পাকিস্তানে সমাবেশ করেছিল, তখন তাদের মূল সমালোচনার লক্ষ্য ছিল পিপিপি, পিএমএল-এন নয়। মনে হচ্ছিল, তখনও দু'পক্ষের মনেই একে অপরের জন্য কিছুটা সফট কর্নার ছিল।' পি জে মীরও এ মতের সঙ্গে একমত। 'রাজনীতির শুরুতে ইমরান খান মূলত আসিফ আলী জারদারিকেই বেশি সমালোচনা করতেন। সম্ভবত এর কারণ ছিল, তার মনে এই অনুভূতি ছিল যে যে জমিতে তিনি হাসপাতাল গড়েছেন, সেই জমি পেতে নওয়াজ শরীফ তাকে সাহায্য করেছিলেন।' সোহেল ওয়ারাইচ বলেন, 'ইমরান খান যখন বুঝলেন যে নওয়াজ শরীফকে চ্যালেঞ্জ না করলে রাজনীতিতে তার জন্য জায়গা তৈরি হবে না, তখন পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।

এরপর প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও চার্টার অব ডেমোক্রেসির পর এমন একটি রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন অনুভূত হয়, যা প্রতিষ্ঠানপন্থী হবে।' এরপর ২০১৩ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং ইমরান খান ও নওয়াজ শরীফের রাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হয়ে ওঠে। তবে সোহেল ওয়ারাইচের মতে, ২০১৩ সালের নির্বাচনে 'নওয়াজ শরীফ হাসপাতালে গিয়ে ইমরান খানের খোঁজখবর নিয়েছিলেন এবং ক্ষমতায় আসার পর নিজে তার বানিগালার বাড়িতেও গিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের সম্পর্ক আর এগোয়নি এবং ইমরান খানের পক্ষেও তা সুবিধাজনক ছিল না।

যখন দু'জনই বুঝতে পারলেন যে লড়াইটি মূলত একে অপরের বিরুদ্ধে, তখন বিরোধ আরও বাড়তে থাকে।' সোহেল ওয়ারাইচ বলেন, 'যখন ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়, তখন রাজনৈতিক লক্ষ্যই প্রধান হয়ে ওঠে। এরপর প্রতিযোগিতা শুরু হয় এবং ভাষা যত কঠোর হয়েছে, আচরণও তত কঠোর হয়েছে।' পি জে মীর বলেন, 'রাজনীতির বাইরে ইমরান খান ও নওয়াজ শরীফ দু'জনই অত্যন্ত ভালো মানুষ। কিন্তু পাকিস্তানের রাজনীতিই এত নোংরা। দেখুন, ইমরান খান যখন রাজনীতিতে এসেছিলেন, তখন তার ভাষা কেমন ছিল। রাজনীতির খেলাই এমন যে প্রতিপক্ষকে খারাপ মানুষ হিসেবে দেখানো হয়।' এরপর এমন এক সময় আসে, যখন ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে নওয়াজ শরীফ দণ্ডিত হয়ে কারাগারে যান।

আর ঠিক ওই সময়ে ইমরান খান প্রথমবারের মতো সেই প্রধানমন্ত্রী বাসভবনের বাসিন্দা হন, যেখানে একসময় নওয়াজ শরীফ তাকে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই ইমরান খানের প্রধানমন্ত্রিত্বও নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হয়। তিনি এর জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের পাশাপাশি তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়াকে দায়ী করেন, যার বিরুদ্ধে এর আগে নওয়াজ শরীফও একই ধরনের অভিযোগ তুলেছিলেন। পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসের উত্থান-পতন দেখায় যে অতীতের প্রতিদ্বন্দ্বীরাও খুব দ্রুত মিত্রে পরিণত হতে পারেন। ১৯৯০-এর দশকে নওয়াজ শরীফ ও বেনজির ভুট্টোর রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও ২০০৭ সালে তাদের মধ্যে 'চার্টার অব ডেমোক্রেসি' স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

তাহলে কি অতীতের প্রতিদ্বন্দ্বী নওয়াজ শরীফ ও ইমরান খান ভবিষ্যতে সব মতপার্থক্য সত্ত্বেও আবারও মিত্র হতে পারেন? সোহেল ওয়ারাইচের ধারণা, 'এখন ইমরান খান ও নওয়াজ শরীফের মধ্যে কোনো ধরনের জোটের সুযোগ আর অবশিষ্ট নেই।' পি জে মীর বলেন, 'দু'জনই ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকিয়েছিলেন। আর এখন তাদের দ্বন্দ্ব কেবল এ প্রশ্নে যে, ক্ষমতায় কার কত অংশ থাকবে।' তবে তার মতে, 'আমার ধারণা, কোনো না কোনোভাবে তাদের মধ্যে সমঝোতা হবে। আর এবার তারা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একসঙ্গে অবস্থান নেবেন। ইমরান এমন মানুষ নন, যিনি সেনাবাহিনীকে নিজের ঊর্ধ্বে থাকতে দেবেন। নওয়াজ শরীফের চিন্তাভাবনাও একই রকম।'