ব্রাজিলের আমাজন জঙ্গলের গভীরে লুকানো শত শত মাটির কাঠামো আবিষ্কার করেছেন গবেষকরা, যা সম্ভবত লক্ষ লক্ষ মানুষের এক প্রাচীন সভ্যতা তৈরি করেছিল। ঘন জঙ্গলে মাটির নিচে খনন করা এই বিশাল কাঠামোগুলোকে - যা জিওগ্লিফ নামে পরিচিত - হাজার হাজার বছর আগে প্রধান নদীগুলো থেকে অনেক দূরে একটি এলাকায় নির্মিত হয়েছিল। "গ্রিসে যখন পিথাগোরাস তার উপপাদ্যটি বিকশিত করছিলেন, ঠিক সেই সময়েই এই লোকেরা আমাজনে বিশাল জ্যামিতিক শিল্পকর্ম তৈরি করছিল," বলেন জীবাশ্মবিজ্ঞানী আলসেউ রানজি, যিনি আমাজন জিওগ্লিফস ইনস্টিটিউটের সভাপতি এবং দলের অন্যতম সদস্য। ‘নেচার’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাটি স্পেন, ফিনল্যান্ড, ব্রাজিল ও ডেনমার্কের বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন ইনস্টিটিউটের একদল বিজ্ঞানী দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল।

তারা লাইডার (লাইট ডিটেকশন অ্যান্ড রেঞ্জিং) নামে একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘন জঙ্গলের উপরিভাগ স্ক্যান করেছিল, যা লেজার পালস ব্যবহার করে দূরত্ব পরিমাপ করে এবং জটিল ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করে। এর ফলে গাছপালা না কেটে বা প্রতিটি স্থানে সশরীরে না গিয়েই বিশাল এলাকা বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়। বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন "আমাজনে এটিই ছিল প্রথম সত্যিকারের উচ্চাভিলাষী লাইডার জরিপ," বলেন হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক, নৃবিজ্ঞানী এবং গবেষণাপত্রের সহ-লেখক মার্টি পার্সিনেন। দলটি চার হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে জরিপ চালিয়েছে। তারা ৪৩২টি ভূ-লিপি (মাটিতে তৈরি করা বিশাল কোনো নকশা বা চিত্র) শনাক্ত করেছে, যেগুলোর অধিকাংশই আগে কখনো নথিভুক্ত করা হয়নি এবং যেগুলো ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৮৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত হয়েছিল।

গবেষকদের অনুমান, তথাকথিত অ্যাকুইরি সভ্যতা, যারা এগুলো নির্মাণ করেছিল, তারা প্রায় এক লাখ ৮৩ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল - যা আয়তনে মোটামুটি কম্বোডিয়া বা সিরিয়ার সমান। ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দে এর সর্বোচ্চ সমৃদ্ধির সময়ে এখানে প্রায় ৩০ লাখ বাসিন্দা থেকে থাকতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। রঞ্জি বলেন, দলটি ১৫ মিটার পর্যন্ত চওড়া এবং পাঁচ মিটার গভীর নালা খুঁজে পেয়েছে। এই ধরনের বিশাল কাঠামো বড় বড় সম্প্রদায়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়। “এই অঞ্চলে কোনো পাথর নেই। সম্ভবত তারা মাটি বহন করার জন্য কাঠের সরঞ্জাম ও ঝুড়ি ব্যবহার করত,” তিনি ধারণা করেন। কিন্তু আমাজনের আর্দ্র জলবায়ুর কারণে জৈব পদার্থ দ্রুত পচে যায়, ফলে এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে জানা কঠিন হয়ে পড়ে।

গবেষকদের মতে, বিপুল সংখ্যক কর্মী ও শ্রম বিভাজনের পাশাপাশি এই নির্মাণকাজগুলোর জন্য গণিত ও জ্যামিতি বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞানের প্রয়োজন ছিল। একসময় মনে করা হতো যে, এই ভূ-লিপিগুলো দুর্গ বা প্রতিরক্ষামূলক কাঠামো হিসেবে কাজ করত, যা জনগোষ্ঠীকে আক্রমণ থেকে রক্ষা করত। কিন্তু বর্তমানে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এগুলি স্থায়ীভাবে বসবাসের স্থান না হয়ে বরং আনুষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন করত, মানুষের সমাবেশস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হত।

"যদি এটি নিশ্চিত হয়… তাহলে এই লোকেরা নিশ্চয়ই শান্তিতে বসবাস করত। (ভূ-লিপিগুলোর) পেছনে এত প্রচেষ্টা ও শ্রম উৎসর্গ করা থেকে বোঝা যায় যে, দুশ্চিন্তার মতো তাদের কোনো বড় শত্রু ছিল না," র‍ানজি অনুমান করেন। পার্সিনেন এ বিষয়ে আরেকটি উপসংহার তুলে ধরেছেন, যা হলো- প্রকৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তিনি বলেন, “তারা কখনো এই রেইন ফরেস্টকে বৃক্ষহীন প্রান্তরে রূপান্তরিত করেনি।

মনে হয়, তাদের জীবনযাত্রা টিকিয়ে রাখার জন্য, অর্থাৎ ভুট্টা, স্কোয়াশ ও ম্যানিওক চাষের জন্য যতটুকু প্রয়োজন ছিল, বন পরিষ্কার করা এবং গাছ কাটা কেবল ততটুকুই ছিল, এর বেশি কিছু নয়।” খননকার্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে কাঠামোটি যত্ন সহকারে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছিল। "বিষয়টি কেবল এগুলো নির্মাণ করাই ছিল না, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এগুলোকে সংরক্ষণ করাও ছিল, যার জন্য স্পষ্টতই এক সঞ্চিত জ্ঞানের ভাণ্ডার প্রয়োজন ছিল," বলেন আরেক সহ-লেখক রুয়ান কার্লোস লোপেস, যিনি ব্রাজিলের পারার ফেডারেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ ও নৃবিজ্ঞানী। রানজির মতে, জিওগ্লিফগুলো জঙ্গলে লুকানো বিচ্ছিন্ন কোনো স্থাপনা ছিল না, বরং সেগুলো পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। "আমরা জিওগ্লিফগুলোকে সংযোগকারী ৩৫০ কিলোমিটার রাস্তার মানচিত্র তৈরি করেছি," তিনি ব্যাখ্যা করেন।

"এই পথগুলো ওই সব স্থানগুলোয় নিয়ে যেত, এবং স্থাপনাগুলোর কাছাকাছি আসার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তাগুলো আরও চওড়া হয়ে যেত।" অনুসন্ধান চলাকালে গবেষকরা একটি অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করেন, আনুমানিক ৮৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে জিওগ্লিফ বা ভূলিপি নির্মাণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এর কারণ স্পষ্ট নয়। রানজি মায়া সভ্যতার সঙ্গে একটি সাদৃশ্য টেনেছেন, যার মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার বিভিন্ন অংশে অবস্থিত প্রধান কেন্দ্রগুলো প্রায় একই সময়ে পরিত্যক্ত হয়েছিল। "মায়ারা তাদের প্রাসাদ নির্মাণ ও ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছিল। ইউকাতানের পিরামিডগুলো বনের গ্রাসে চলে গিয়েছিল," তিনি উল্লেখ করেন। আমাজনেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। নবম শতাব্দী হয়তো কোনো বৃহত্তর পরিবেশগত সংকটের সময় ছিল। যাইহোক, এই গবেষণাসহ সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো দীর্ঘদিনের এই বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করছে যে, আমাজন বনাঞ্চল ছিল মানব বসতিহীন এক অরণ্য।

সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বিভিন্ন ক্ষেত্রের গবেষণায় দেখা গেছে যে, ইউরোপীয়দের আগমনের অনেক আগে থেকেই লাখ লাখ মানুষ এখানে বাস করত এবং বিশ্বের বৃহত্তম এই ক্রান্তীয় অরণ্যের গঠন ও বিন্যাসের উপর তারা স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। "আমরা আমাজনে যা দেখি তা কোনো বিশাল প্রাকৃতিক অরণ্য নয়, বরং মানুষের কর্মকাণ্ড দ্বারা গঠিত এক বিশাল ঐতিহাসিক উদ্যান," লোপেস যুক্তি দেন। এই অঞ্চলের ঔপনিবেশিক-পূর্ব জনসংখ্যার অনুমান ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে।

পূর্ববর্তী গবেষণায় ধারণা করা হয়েছিল যে সমগ্র আমাজন এক থেকে আড়াই মিলিয়ন মানুষকে ধারণ করতে পারত, যদিও পরবর্তী অনুমান অনুযায়ী এই সংখ্যা বেড়ে পাঁচ থেকে দশ মিলিয়নের (৫০ লাখ থেকে এক কোটি) মধ্যে হয়েছে। এখন, যদি তুলনামূলকভাবে ছোট একটি এলাকা ৩০ লাখ পর্যন্ত বাসিন্দাকে ধারণ করতে পারত, তাহলে সেই সংখ্যাগুলো আবার ঊর্ধ্বমুখী করে সংশোধন করার প্রয়োজন হতে পারে।

পূর্ববর্তী আরেকটি ধারণা ছিল যে, আমাজনীয় জনগোষ্ঠী প্রধানত বড় নদীগুলোর তীরে বাস করত, যেখানে খাদ্য সম্পদ আরও সহজে পাওয়া যেত। তবে ভূ-লিপিগুলো প্রধানত নদীগুলোর মধ্যবর্তী উঁচু এলাকাতেই অবস্থিত। নতুন গবেষণাটি ইঙ্গিত দেয় যে, এই অঞ্চলগুলোতে এমন বিপুল সংখ্যক মানুষও বাস করত যারা বন পরিবর্তন করতে এবং ফসল চাষ করতে সক্ষম ছিল। "এই লোকেরা কেবল মাছের প্রাচুর্য এবং ডিঙি নৌকায় ভ্রমণের সুবিধার জন্য প্রধান নদীগুলোর তীরেই বসবাস করত না," রঞ্জি বলেন, "তারা ভূপ্রকৃতি বুঝত, নদী থেকে দূরে বসতি স্থাপন করত এবং এই পথ ধরে পায়ে হেঁটে চলাচল করত"। আর তা আমাজন কীভাবে দখল করা হয়েছিল, সে সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দেয়।