আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল বা আইএমএফ এর ঋণ কর্মসূচি বাতিল এবং সংস্থাটির কোনো শর্ত মানা হবে না উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যে মন্তব্য করেছেন তা নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রবিবার এক অনুষ্ঠানে তিনি বৈশ্বিক এই সংস্থাটির সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে করা ঋণ চুক্তি বাতিল করে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন এবং বলেছেন, সংস্থাটির শর্ত বাংলাদেশের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

যদিও অর্থবিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য গত জুনেই আইএমএফ এর কাছে আবেদন করেছে বাংলাদেশ এবং এ নিয়ে আলোচনার জন্য চলতি মাসেই সংস্থাটির একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসার কথা রয়েছে। এছাড়া এ মাসেই ওয়াশিংটনে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভাতেও নতুন ঋণ কর্মসূচি কিভাবে পাওয়া যাবে সেই বিষয়ে বাংলাদেশ প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন খবরও পাওয়া যাচ্ছে। ফলে অর্থমন্ত্রী এখন আইএমএফ-র ঋণ কর্মসূচি বাতিলের কথা বললেও এর আওতায় সরকারের দিক থেকে চাওয়া নতুন ঋণ কর্মসূচিও পড়বে কি-না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সরকারের শীর্ষ মহল থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আইএমএফ এর সাথে আগের ঋণ কর্মসূচিও এখনো চলমান রয়েছে এবং এ মাসেই সংস্থাটির যে প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসবে তারা ওই ঋণের ষষ্ঠ কিস্তির টাকা ছাড়ের বিষয়েও আলোচনার কথা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিবিসি বাংলার পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের কাছে জানতে চাইলেও তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

অর্থনীতিবিদ ও নলেজ হাব ইন্সটিটিউট এর প্রেসিডেন্ট ডঃ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, সরকার মুখে আইএমএফ এর শর্তবিরোধী অবস্থান নিলেও এখন যে আর্থিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে তাতে সংস্থাটির ঋণ এড়ানো সরকারের জন্য কঠিন হবে। "আইএমএফ- এর বড় শর্ত হলো সংস্কার। সংস্কার ছাড়া তারা অর্থায়নে যাবে না। কিন্তু সরকারের বাজেট ডকুমেন্টে বলা হয়েছে প্রথম দুই বছরে তারা বড় কোন সংস্কারে যাবে না। বরং জনতুষ্টির জন্য ফ্যামিলি কার্ড, সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বাড়ানো ও বিশাল বড় এডিপি নেওয়া হয়েছে।

এগুলো নিয়েও আইএমএফর আপত্তি আছে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি। রবিবার ঢাকায় 'বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬' এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন যে, আইএমএফের ঋণ চুক্তি বাতিল করে তারা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি বলেন, দাতা সংস্থার সাহায্য ছাড়াই ২০৩৪ সালে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত হবে বাংলাদেশ। "২০৩৪ সালে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির জন্য আমরা আইএমএফ এর ওপর নির্ভর করতে পারি না।

আইএমএফ ওয়ার্ল্ড ব্যাংক পয়সা দিবে এটা ভুলে যান। আমি আইএমএফ এর প্রোগ্রাম ক্যান্সেল করে দিয়েছি। তোমাদের শর্ত আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য না," বলেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, "তোমরা (আইএমএফকে ইঙ্গিত করে) যে টাকা দিবে তা দিয়ে বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে যেতে পারবে না। আমার প্রতি বছর ৫০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। তোমরা সবাই মিলে দশ বিলিয়ন ডলার দিবা ওটার জন্য আমার টাইম নাই। আমরা ভালো রেসপন্স পাচ্ছি। এক বছরের মধ্যে ক্যাপিটাল মার্কেটের চেহারা পাল্টে যাবে"।

সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস এ সংক্রান্ত যে খবর দিয়েছে তাতে বলা হয়েছে যে অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, "বিশ্বমানের অর্থনীতির সঙ্গে তাল মেলাতে হলে আমাদের এখন 'হাই স্ট্রিট থেকে ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট'-এর দিকে যাত্রা করতে হবে। আমাদের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য বন্ড মার্কেট, সিকিউরিটাইজেশন এবং ইকুইটি মার্কেটের ওপর জোর দিতে হবে"। "বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। আমরা আইএমএফ কর্মসূচি বাতিল করেছি। কারণ তাদের শর্তগুলো আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না," অর্থমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে বাসস জানিয়েছে।

মন্ত্রী জানান, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক বাজারের ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গিয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে ওয়াল স্ট্রিটে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশের রূপান্তর ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপে প্রখ্যাত বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা গভীর আস্থা প্রকাশ করেছেন। বাসস এর খবর অনুযায়ী মন্ত্রী আরও বলেছেন, "নিউইয়র্কে আমরা ডলার বন্ড এবং হংকংয়ে বাংলাদেশ ডেডিকেটেড ফান্ড প্রবর্তনের উদ্যোগ নিচ্ছি। পাশাপাশি সামুরাই বন্ড ও প্যান্ডা বন্ডের মতো বৈশ্বিক ফাইন্যান্সিয়াল প্রোডাক্টের মাধ্যমে বাংলাদেশের পাবলিক ও প্রাইভেট সেক্টরের ফাইন্যান্সিং স্ট্রাকচার বদলে দেওয়া হবে।

২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, তার জন্য প্রতি বছর প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা কেবল গতানুগতিক বৈদেশিক ঋণ দিয়ে সম্ভব নয়"। এর আগে গত ১২ই জুলাই সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী আইএমএফ-এর সঙ্গে আগের সরকারের নেওয়া ঋণ কর্মসূচিকে 'সম্পূর্ণ জনস্বার্থ বিরোধী' বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। তিনি তখন আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি করা হবে বলে জানিয়েছিলেন।

তার আগেই আইএমএফ এর মুদ্রা ও পুঁজিবাজার বিভাগের ডেপুটি ডিভিশনের প্রধান ইভো ক্রজনার এর নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি মিশন নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করতে ঢাকায় এসেছিল। অর্থমন্ত্রী ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ বিভাগসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে বৈঠক করে তারা। তবে অর্থমন্ত্রী গত জুনেই নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য আইএমএফকে চিঠি দিয়েছিলেন। গত ৩রা জুন সংস্থাটির বাংলাদেশ বিষয়ক মিশন প্রধান আইভো ক্রিজনার এক বিবৃতিতে এটি জানিয়েছিলেন। বিবৃতিতে তখন বলা হয়েছিল, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, নিম্ন রাজস্ব আহরণ এবং নতুন ও ধারাবাহিক সংস্কার উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন সরকার সত্যিকার অর্থেই আইএমএফ এর সাথে থাকা ঋণ চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেছে কি-না কিংবা নতুন করে ঋণ কর্মসূচির প্রস্তাব দিয়েছে তা প্রত্যাহার করেছে কি-না তার কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। পদস্থ একজন কর্মকর্তা শুধু বলেছেন, "যতটুকু জানি আইএমএফ এর কর্মসূচি এখনো চলমান আছে। তবে মন্ত্রী কোন প্রেক্ষাপটে কী বলতে চেয়েছেন সেটি তিনিই ভালো বলতে পারবেন"।

ঢাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য বাংলাদেশের দিক থেকে গত জুনে যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে সেটি পেতে হলে আইএমএফ- এর চারটি শর্ত বাংলাদেশকে বাস্তবায়নের মাধ্যমে সংস্কারে দৃঢ়তা দেখাতে হবে। এর কয়েকটি সরকারের পক্ষে এই মুহূর্তে বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলেই মনে করা হচ্ছে। এমন দুটি শর্ত হলো ভর্তুকি ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনা ও রাজস্ব আদায় বাড়ানো। আরও অন্তত দুটি শর্ত নিয়ে সংস্থাটি বাংলাদেশের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

এগুলো হলো ব্যাংক খাতের সংস্কার ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে এই ধারণা পাওয়া গেছে, দেশের কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্যসহ বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে ভর্তুকি ব্যাপকহারে কমিয়ে আনার ঝুঁকি এখন সরকার নিতে চাইছে না। যদিও এর মধ্যেই জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমাতে দাম অনেকটা বাড়িয়েছে সরকার। পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও সরকার ধীরে ধীরে এগুনোর পক্ষপাতী। এসব কিছু নিয়ে আলোচনার জন্য চলতি মাসের শেষে ঢাকায় আসবে আইএমএফ এর প্রতিনিধি দল।

সেখানে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে করা ঋণ চুক্তির শর্তগুলো কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে তা পর্যালোচনা হবে। জানা গেছে, এর ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের জন্য ওই কর্মসূচির ষষ্ঠ কিস্তি ছাড় করা হবে কি-না। পাশাপাশি নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য বাংলাদেশ যে আবেদন করেছে তার ক্ষেত্রে এসব শর্তগুলোর বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান জানাতে হতে পারে। প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২৩ সালে বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি অনুমোদন করেছিল আইএমএফ।

পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়। বাংলাদেশ এ কর্মসূচির আওতায় এ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড় নিয়ে কয়েক দফা আলোচনা হলেও আইএমএফ এখনো তা ছাড় করেনি। অর্থনীতিবিদ ডঃ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, সরকার আগের ঋণ কর্মসূচি চালিয়ে যেতে রাজি নয়,তবে তারা আবার সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের মতো নতুন ঋণ কর্মসূচি চায়। "সরকার ঋণ নিতে চায় কিন্তু শর্ত মানতে চাইছে না।

আইএমএফ নতুন প্রস্তাবনা নিয়ে প্রাথমিক পর্যালোচনা করেও গেছে। আমার ধারণা আগের ঋণ চুক্তিতে যেসব কর্মসূচি ছিল এখনও তাই থাকবে। তবে দুই পক্ষ নেগোসিয়েশন শুরু করলেও তা শেষ করতে অন্তত দু বছর লাগবে। এবং এটি আগের চেয়ে জটিল হবে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি। তিনি বলেন, সরকার বাজেটেই বলেছে যে সরকারের প্রথম দুই বছরে বড় কোনো সংস্কারে তারা যাবে না এবং অর্থমন্ত্রী হয়তো তার ভিত্তিতেই মন্তব্যগুলো করে থাকতে পারেন।