
৭১-এর বিষবৃক্ষ: কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের পুত্র, আবদুল্লাহিল আমান আযমীর মিথ্যাচারের আড়ালে কী লুকিয়ে আছে?
একাত্তরের পরাজিত শক্তি, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে কখনোই মেনে নিতে পারেনি, তারা এখন এক নতুন মোড়কে জাতির সামনে হাজির হয়েছে। এই নতুন চালের প্রধান চরিত্র হলেন কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের পুত্র, বরখাস্তকৃত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আট বছরের 'গুম' নাটক শেষে তাঁর প্রত্যাবর্তনের পরই বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ভয়ংকর এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা শুরু হয়েছে। কিন্তু তাঁর এই 'নির্যাতিত' সাজার আড়ালে লুকিয়ে আছে জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার গভীর ষড়যন্ত্র এবং চূড়ান্ত মিথ্যাচার.
# 'গুম'-এর আড়ালে আইএসআই ও সেফ হাউসের রহস্যঃ
আমান আযমী এবং তাঁর সমর্থকেরা দাবি করেন, ২০১৬ সালের ২৩ আগস্ট তাঁকে শেখ হাসিনার সরকারের 'গুম' বাহিনী তুলে নিয়ে গিয়েছিল। আট বছর পর তিনি নাটকীয়ভাবে মুক্তি পান।
কিন্তু আসল সত্য কী?
আমান আযমীর তথাকথিত 'গুম' ছিল মূলত দেশ থেকে পলায়ন। তাঁকে দেশীয় কোনো নিরাপত্তা বাহিনী নয়, বরং পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI) একটি 'সেফ হাউস'-এ আশ্রয় দিয়েছিল। এই সেফ হাউসগুলো কখনো পাকিস্তান, আবার কখনো যুক্তরাজ্যে অবস্থিত ছিল, যেখানে তাঁকে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক খেলার ঘুঁটি হিসেবে প্রস্তুত করা হচ্ছিল। 'আয়নঘর'-এর এই কাল্পনিক গল্পটি আসলে আইএসআই নিয়ন্ত্রিত একটি রাজনৈতিক আশ্রয় আড়াল করার কৌশল।
# রাষ্ট্রের ভিত্তিমূলে সরাসরি আঘাত:
জাতীয় সঙ্গীত ও শহীদ সংখ্যা নিয়ে ঔদ্ধত্য দেশে ফিরে আমান আযমী প্রথমেই বাংলাদেশের মূল ভিত্তি ও চেতনার ওপর আঘাত হেনেছেন। তাঁর বক্তব্যগুলো ছিল বাংলাদেশের স্বাধীন রাষ্ট্রসত্তাকে অস্বীকার করার সুদূরপ্রসারী এজেন্ডার প্রতিচ্ছবি:
জাতীয় সঙ্গীত বাতিলের দাবি: তিনি ঔদ্ধত্যের সঙ্গে দাবি করেছেন যে, আমাদের জাতীয় সঙ্গীত 'আমার সোনার বাংলা' পরিবর্তন করতে হবে। তাঁর যুক্তি, এই গান নাকি 'স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বের পরিপন্থি' এবং এটি দুই বাংলাকে এক করার জন্য লেখা হয়েছিল। এই বক্তব্যটি সরাসরি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ভাষা আন্দোলনের গৌরবকে অপমান করে। 'আমার সোনার বাংলা' গানটি একাত্তরে লক্ষ শহীদের প্রেরণা ছিল এবং মুজিবনগর সরকার এই গানকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করে এর ঐতিহাসিক ভিত্তি দিয়েছে। এই গান পরিবর্তনের দাবি মানে, আমাদের আত্মপরিচয়ের প্রতীককেই অস্বীকার করা।
৩০ লাখ শহীদকে নিয়ে জঘন্য মিথ্যাচার: তাঁর মুখে শোনা গেছে সেই পুরনো, ঘৃণ্য মিথ্যাচার—মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদের সংখ্যাকে 'কাল্পনিক' আখ্যা দেওয়া। এই বক্তব্যটি প্রথম প্রচার করেছিল তাঁর পিতা গোলাম আযমের দল জামায়াতে ইসলামী। ৩০ লাখ শহীদ একটি আবেগ বা সংখ্যা মাত্র নয়; এটি আমাদের জাতির অস্তিত্বের দলিল, আমাদের স্বাধীনতার মূল্য। এই সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানে একাত্তরের গণহত্যাকে অস্বীকার করা এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চক্রান্ত করা।
# ক্যান্টনমেন্টের ষড়যন্ত্রকারী:
প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার চেষ্টা ও অভ্যুত্থান ষড়যন্ত্র (২০০৯) আমান আযমী কেবল রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে মিথ্যাচার করেই ক্ষান্ত হননি; তাঁর অতীত রেকর্ড আরও ভয়াবহ। তিনি একজন বরখাস্তকৃত সেনা কর্মকর্তা, যাঁর বিরুদ্ধে দেশের নিরাপত্তা কাঠামোকে ধ্বংস করার গুরুতর অভিযোগ ছিল।
বিডিআর বিদ্রোহের আড়ালে নৈরাজ্য: ২০০৯ সালে বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) বিদ্রোহের সময় সেনানিবাসের অভ্যন্তরে যে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছিল, সেখানে তাঁর উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এই বিদ্রোহের মূল লক্ষ্য ছিল দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অস্থিরতা সৃষ্টি করা। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে তাঁর 'গুম'-এর অন্যতম কারণ ছিল তাঁর ভারত-বিরোধী অবস্থান এবং যুদ্ধাপরাধী পিতার পুত্র হওয়া। এই 'ভারত-বিরোধী কার্ড' ব্যবহার করে তিনি বারবার সামরিক বাহিনীতে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার ষড়যন্ত্র: তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ছিল যে তিনি তৎকালীন সরকার উৎখাত এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে হত্যার সামরিক ষড়যন্ত্রে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। আমান আযমীর এই অতীত প্রমাণ করে যে, তিনি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নন, বরং তিনি শুরু থেকেই দেশের সাংবিধানিক সরকার ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তিকে ব্যবহার করে চক্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন।
আট বছর তথাকথিত 'গুম' থাকার পর তাঁর ফিরে এসে এখন সেনাপ্রধানকে উদ্দেশ্য করে 'গোপন তথ্য ফাঁস' করার মতো হুমকি দেওয়া—এ সবই দেশের সামরিক ও জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোকে দুর্বল করার ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের অংশ।
# এবার আসা যাক সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও হাস্যকর বিষয়টিতে।
আমান আযমী যদি ২০১৬ সালের ২৩ আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট পর্যন্ত টানা আট বছর সরকারের গোপন কারাগারে 'গুম' হয়ে থাকেন, তবে তাঁর চার বছর বয়সী শিশুটির জন্ম কীভাবে হলো?
গোপন কারাগার না হানিমুন স্যুট? আমরা কি ধরে নেব যে, শেখ হাসিনার 'গুম' বাহিনী এতই মানবিক ছিল যে তারা প্রতি বছর তাঁকে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে অবকাশ যাপনের সুযোগ করে দিত? নাকি 'আয়নঘর'-এর গোপন কক্ষে বিশেষ 'পারিবারিক ভিজিট'-এর ব্যবস্থা ছিল, যেখানে জন্ম নিয়ন্ত্রণের কোনো বালাই ছিল না? অথবা, আমাদের বিশ্বাস করতে হবে যে, আট বছরের বন্দিত্বের সময় তিনি কোনো এক অলৌকিক উপায়ে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, যা মানব ইতিহাসের সমস্ত যুক্তিকে অস্বীকার করে। গণনা করুন! ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত তাঁর 'গুমের' সময়কাল। এর মধ্যে চার বছরের শিশুর জন্ম কেবল তখনই সম্ভব, যখন তাঁর 'গুম'-এর ঘটনাটি ছিল একটি মিথ্যা অভিনয়!
এই একটি অসঙ্গতিই প্রমাণ করে, আমান আযমীর তথাকথিত 'গুম' ছিল মূলত একটি সাজানো নাটক, যার উদ্দেশ্য ছিল: শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর একজন 'নির্যাতিত' নেতার ভাবমূর্তি নিয়ে আবির্ভূত হওয়া এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের চোখে সহানুভূতি আদায় করা। তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি এই সময়কালে পাকিস্তানে এবং যুক্তরাজ্যে বসে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার ছত্রছায়ায় দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালিয়েছেন।
এই গুরুতর অভিযোগগুলোই প্রমাণ করে যে, আমান আযমী কোনো সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী নন। তিনি শুরু থেকেই দেশের নিরাপত্তা কাঠামো এবং সাংবিধানিক সরকারকে উৎখাতের গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। তাঁর জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সরাসরি সাংগঠনিক সংযোগ জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করলেও, যুদ্ধাপরাধী পিতার উত্তরাধিকার এবং তাঁর চরমপন্থী ভারত-বিরোধী, ধর্মান্ধ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর আসল পরিচয় তুলে ধরে। কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের পুত্র আবদুল্লাহিল আমান আযমী এখন নতুন প্রজন্মের কাছে 'নির্যাতিত' হিসেবে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাঁর অতীত এবং বর্তমানের লক্ষ্য সুস্পষ্ট: বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসকে বিকৃত করা এবং সামরিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাকে বিনষ্ট করা।
বাংলাদেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো—এই মিথ্যাচারকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করা। ৪ বছরের সন্তানের অলৌকিক জন্মকাহিনি দিয়ে যিনি জাতিকে বিভ্রান্ত করতে চান, তাঁর বিপজ্জনক এজেন্ডা নিয়ে প্রতিটি প্রগতিশীল নাগরিককে আজ ঐক্যবদ্ধ ও সতর্ক থাকতে হবে।